ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৮, অক্টোবর ২০২৬ ৪:৪৭:২০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ `দেনমোহরের জন্য স্ত্রীকে হয়রানি করলে ক্ষতিপূরণ দিবে স্বামী` গোল ও জোড়া অ্যাসিস্টে বিদায়ী ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলেন মেসি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা, গ্রেপ্তার ১ অনলাইনে প্রেমের ফাঁদ, ব্রিটেনে নতুন বাংলাদেশিদের আইনি ঝুঁকি বিশ্ববাজারে বাড়ল সোনার দাম

অবিবাহিত বলে তিন নারীকে ভ্রমণে বাধা: এ কেমন নিয়ম

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৫৪ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কোথায় যাবেন, কখন যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন—এসব সিদ্ধান্ত কি এখন তাঁর বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে? তিনি অবিবাহিত হলে কি তাঁর পাসপোর্টের কার্যকারিতা কমে যায়? তাঁর নাগরিক অধিকার কি বিবাহের কাবিননামা বা স্বামীর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত? নাকি বাংলাদেশের কোনো অদৃশ্য আইনে লেখা আছে—নারী হলে একা বিদেশ যাওয়া যাবে না?

২০২৬ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নগুলো করতে হচ্ছে—এটাই সবচেয়ে লজ্জার।

সম্প্রতি বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিট থাকার পরও তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নেপাল ভ্রমণে যেতে পারেননি। অভিযোগ, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁরা বিবাহিত কি না, পরিবার ভ্রমণের কথা জানে কি না এবং অভিভাবক ছাড়া কেন বিদেশ যাচ্ছেন। এরপর তাঁদের ভ্রমণে বাধা দেওয়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে হাইকোর্ট ইতিমধ্যে জানতে চেয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিদেশযাত্রা ঠেকানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং শুধু অবিবাহিত, অভিভাবক ছাড়া বা নারী হওয়ার কারণে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিদেশযাত্রা সীমিত করার কোনো আইনগত ভিত্তি আছে কি না।

এখানে মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল—কোন আইনে এই বাধা দেওয়া হলো?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ বলছে, প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, বসবাস এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশের অধিকার রয়েছে। অবশ্যই জনস্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ হতে হবে আইনের ভিত্তিতে। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ধারণা, সামাজিক সংস্কার, নৈতিক পাহারাদারি কিংবা ‘মেয়েদের নিরাপত্তা’র নামে বানানো অলিখিত নিয়ম সংবিধানের বিকল্প হতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে—সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদ আরও পরিষ্কার করে বলেছে, কেবল নারী-পুরুষভেদের কারণে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করতে পারবে না; রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যদি বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে একা নেপাল যেতে পারেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কেন পারবেন না? তাঁর অপরাধ কী—তিনি অবিবাহিত?

অবিবাহিত হওয়া কোনো অপরাধ নয়। নারী হওয়াও অপরাধ নয়। একা ভ্রমণ করাও অপরাধ নয়।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট আইনও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এ পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান বা সীমিত করার জন্য নির্দিষ্ট আইনগত কারণ রয়েছে। সেখানে নাগরিকত্ব, নির্দিষ্ট ধরনের দণ্ড, কিছু গুরুতর অপরাধে সংশ্লিষ্টতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা জনস্বার্থের মতো বিষয় বিবেচনার কথা আছে। ‘অবিবাহিত নারী’ হওয়া সেই কারণগুলোর একটি নয়।

আইনের শাসনের সবচেয়ে মৌলিক কথাটিই এখানে মনে রাখা দরকার—কর্তৃপক্ষ যা ইচ্ছা তাই করতে পারে না; কর্তৃপক্ষ কেবল আইন যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতাই প্রয়োগ করতে পারে।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কাজ নাগরিকের বৈবাহিক অবস্থা যাচাই করে তাঁর অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করা নয়। প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী তাঁর বাবা-মায়ের সম্পত্তি নন, স্বামীর সম্পত্তি নন, রাষ্ট্রেরও অভিভাবকত্বপ্রার্থী নন। তিনি একজন পূর্ণ নাগরিক।

কোনো নাগরিকের বিদেশযাত্রায় বাধা দিতে হলে তার পেছনে আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। কোনো মামলা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, জাল কাগজপত্র, নিরাপত্তাজনিত নির্দিষ্ট আইনগত কারণ কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণ থাকলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু ‘আপনি অবিবাহিত’, ‘আপনার পরিবার জানে?’, ‘আপনার সঙ্গে অভিভাবক নেই কেন?’—এসব প্রশ্ন কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞার বিকল্প হতে পারে না।

বরং এমন আচরণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি ভয়ংকর অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করে। কারণ আজ যদি অবিবাহিত নারীকে বলা হয়—‘আপনি একা যেতে পারবেন না’, কাল সেই একই যুক্তিতে বিবাহিত নারীকে বলা হতে পারে—‘স্বামী কোথায়?’ পরশু বলা হতে পারে—‘স্বামীর অনুমতি আছে?’ তারপর বলা হতে পারে—‘পরিবারের অনুমতি আছে?’ এভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নাগরিকত্ব ধীরে ধীরে পারিবারিক অনুমতির অধীন করে ফেলা যায়।

এটি শুধু নারীর ভ্রমণের প্রশ্ন নয়। এটি নারীর নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্ন।

একজন নারী প্রথমে মানুষ, তারপর নাগরিক। তাঁর বৈবাহিক পরিচয় তাঁর নাগরিক অধিকারের শর্ত হতে পারে না।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এ ধরনের আচরণ যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে সংবিধানের মৌলিক অধিকার কাগজে থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তা নির্ভর করবে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধের ওপর। একজন কর্মকর্তা উদার হলে নারী যেতে পারবেন, আর অন্যজন রক্ষণশীল হলে আটকে যাবেন—এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা আইনের শাসন নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার দিয়েছে এবং ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা রয়েছে। ফলে কোনো নাগরিকের স্বাধীনতা খর্ব করতে হলে তার সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকা অপরিহার্য।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপদ রাখা। কিন্তু নিরাপত্তার নামে নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।

আর নারীর নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে নারীকেই আটকে দেওয়া—এটি নিরাপত্তা নয়; এটি পিতৃতান্ত্রিক অভিভাবকত্বের আরেক রূপ।

যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা ও ভ্রমণ নথি নিয়ে আইনসম্মত উদ্দেশ্যে বিদেশ যেতে চান, তাঁর বিবাহিত না অবিবাহিত—এই প্রশ্নের সঙ্গে তাঁর ভ্রমণের বৈধতার সম্পর্ক কোথায়? একজন নারী বিবাহিত হলেই কি তিনি হঠাৎ দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে যান? আর অবিবাহিত থাকলেই কি তিনি রাষ্ট্রের চোখে অক্ষম?

যে রাষ্ট্র নারীকে ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়েছে, শিক্ষার অধিকার দিয়েছে, চাকরি করার অধিকার দিয়েছে, ব্যবসা করার অধিকার দিয়েছে, নিজের নামে সম্পত্তি রাখার অধিকার দিয়েছে—সেই রাষ্ট্র কি বিমানবন্দরের দরজায় এসে বলবে, ‘তুমি অবিবাহিত, তাই একা বিদেশ যেতে পারবে না’?

এটি শুধু সাংঘর্ষিক নয়; এটি রাষ্ট্রের নাগরিক-দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা যদি মনে করেন কোনো নাগরিকের বিদেশযাত্রা বন্ধ করা প্রয়োজন, তাহলে তাঁকে বলতে হবে—কোন আইনের কোন ধারায় সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে। মৌখিক নির্দেশ, সামাজিক ধারণা কিংবা ‘উপরের নির্দেশ’ কোনো আইনের ধারা নয়। নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত তাই জরুরি। কে বাধা দিলেন, কী কারণে দিলেন, কোন আইনের ক্ষমতাবলে দিলেন, লিখিত কোনো আদেশ ছিল কি না—সবকিছুর উত্তর জনগণের জানা দরকার। কারণ বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টার কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নৈতিকতার চৌকি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের একটি জায়গা।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে মেয়ের পাসপোর্ট আছে, ভিসা আছে, টিকিট আছে—তবু তার স্বাধীনতা নেই।

আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য প্রথমে বাবার, পরে স্বামীর, আর স্বামী না থাকলে কোনো অদৃশ্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে।

নারীর নাগরিকত্বের কোনো ‘অভিভাবক’ লাগে না।

আইন যদি কাউকে আটকায়—আইন দেখাতে হবে। আদালত যদি নিষেধ করেন—আদালতের আদেশ দেখাতে হবে। নিরাপত্তার নির্দিষ্ট কারণ থাকলে—তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। কিন্তু অবিবাহিত হওয়ার কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে আটকে দেওয়ার কোনো অলিখিত সামাজিক বিধান রাষ্ট্রের আইন হতে পারে না।

তিন নারীর বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়ার এই ঘটনা তাই নিছক একটি বিমানবন্দরের ঘটনা নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—সংবিধানে অধিকার লেখা থাকলেই অধিকার নিরাপদ থাকে না; অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সংবিধানের সীমার মধ্যে থাকতে হয়।

আজ প্রশ্ন তিন নারীর। কাল প্রশ্নটি আমাদের সবার।

একজন নারী অবিবাহিত বলে যদি তাঁর স্বাধীন চলাচল প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পরের প্রশ্ন হবে—রাষ্ট্রের চোখে নারীর পূর্ণ নাগরিক হতে আর কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুব স্পষ্ট হওয়া দরকার।

বিয়ে নয়, অভিভাবকের অনুমতি নয়—আইনই নাগরিকের অধিকার নির্ধারণ করবে। আর রাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

আইরীন নিয়াজী মান্না, শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক--উইমেননিউজ২৪.কম