আখতার হুসেন: কিশোর লেখার এক আপন মানুষ
আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪প্রকাশিত : ১২:১৯ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার
শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়াটা যেন পুরোপুরি চলে যাওয়া নয়। তাঁরা থেকে যান তাঁদের লেখায়, ব্যবহারে, ভালোবাসায়, অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে। শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, সাংবাদিক, গীতিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক আখতার হুসেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। গতকাল, ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮১ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
আখতার হুসেনের সঙ্গে কিশোর লেখা-র সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। পত্রিকাটির একেবারে শুরুর সময় থেকেই তিনি নিয়মিত লিখেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর লেখা ছড়া, গল্প, নানা ধরনের রচনা কিশোর লেখার পাতাকে সমৃদ্ধ করেছে। লেখক হিসেবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের বাইরে, একজন মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন পত্রিকাটির আপনজন। এত বছর ধরে তিনি লিখেছেন, পাশে থেকেছেন—এ কারণে তাঁর চলে যাওয়ার খবর কিশোর লেখার জন্য শুধু একজন লেখকের মৃত্যু নয়, যেন পরিবারের একজন প্রিয় মানুষের বিদায়।
আরও কষ্টের বিষয়, তাঁর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথাও চলছিল। কথা ছিল তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবন, শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দিনগুলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মের লেখকদের নিয়ে তাঁর ভাবনা শোনা হবে। সেই কথোপকথন আর হলো না। অনেক প্রশ্ন রয়ে গেল, অনেক উত্তরও অজানা থেকে গেল। অথচ তাঁর সঙ্গে সেই আলাপটি হয়তো আমাদের শিশু-কিশোর সাহিত্যজগতের একটি মূল্যবান দলিল হয়ে উঠতে পারত।
ছড়ার ভেতর দিয়ে শিশুর কাছে
আখতার হুসেনের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সহজাত স্বাভাবিকতা। শিশুর জন্য লিখতে গিয়ে তিনি শিশুর ওপরে দাঁড়িয়ে কথা বলেননি; বরং শিশুর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ছড়ার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত, কৌতুকময়। শব্দের সঙ্গে খেলা করতে করতে তিনি শিশুদের নিয়ে যেতেন কল্পনার এক আনন্দময় জগতে।
প্রথম আলোর এক স্মৃতিচারণে তাঁর লেখার এই সহজ-সরল স্বভাবের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের সরলতাকেও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তাঁকে আন্তরিক, সুহৃদ, হাস্যোজ্জ্বল ও নির্লোভ মানুষ হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না—শিশু-কিশোরদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক আপন মানুষ। কিশোর আলো তাঁকে ‘ছড়া-দাদু’ বলে স্মরণ করেছে। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখে তিনি কয়েক প্রজন্মের পাঠকের শৈশবের সঙ্গে মিশে গেছেন।
ঘুরে বেড়ানো শৈশব
আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির সূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে দেশের নানা জায়গায়—খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ বিভিন্ন এলাকায়।
এই ঘুরে বেড়ানো শৈশব তাঁর লেখার ভুবনকে নিশ্চয়ই নানা রঙে সমৃদ্ধ করেছিল। প্রকৃতি, মানুষ, পথ, ছোট শহর, নদী, আকাশ, পাখি—সবকিছুর সঙ্গে তৈরি হয়েছিল তাঁর এক গভীর সম্পর্ক। গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু এবং কুলাউড়ায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম মুদ্রিত লেখা বলে কিশোর আলো জানিয়েছে।
এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
শতাধিক বইয়ের লেখক
ছড়া, শিশুতোষ সাহিত্য, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদনা—সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে—‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণকবি মুকুন্দদাস’।
শিশুদের জন্য তাঁর কাজের ব্যাপ্তির আরেকটি বড় প্রমাণ বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’। এই গ্রন্থে সবচেয়ে বেশি ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও আখতার হুসেনের।
লেখার পাশাপাশি মানুষের জন্য
আখতার হুসেনকে শুধু শিশুসাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনকে ছোট করে দেখা হবে। সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর পেশাজীবনের শুরু। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন তিনি। পরে প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমায় পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির শুরুর দিকের বিভিন্ন নাটক রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক সংগঠন খেলাঘরের সংগঠক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধের গানে তাঁর কণ্ঠ
আখতার হুসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা গান—‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা’—মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গানটির সুর করেছিলেন অজিত রায় এবং গেয়েছিলেন তিমির নন্দী।
এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের পরিচিত সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’-এর সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। তাঁর লেখা আরও একটি সংগীত ছিল—‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ়বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবই’।
অর্থাৎ তাঁর সাহিত্য ছিল শুধু আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়; তার ভেতরে ছিল সময়, সমাজ, দেশ এবং মানুষের প্রতি দায়বোধও।
স্বীকৃতি এসেছে, অহংকার আসেনি
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আখতার হুসেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ আরও নানা সম্মাননা। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো।
কিন্তু এত স্বীকৃতির পরও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। খ্যাতির মোহ তাঁকে স্পর্শ করেনি—এমন স্মৃতিচারণই পাওয়া যায় তাঁর সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কথায়।
যে সাক্ষাৎকার আর হলো না
কিশোর লেখার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা ভাবলে এখন বারবার মনে হচ্ছে সেই অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারটির কথা। কত সহজেই হয়তো তিনি বলতেন তাঁর প্রথম লেখার কথা, শিশুদের জন্য লেখার আনন্দের কথা, তাঁর সময়ের সাহিত্যিকদের কথা। হয়তো বলতেন—কেন শিশুদের জন্য লেখা এত জরুরি, কেন একটি ভালো ছড়া একটি শিশুর মনে বহুদিন বেঁচে থাকতে পারে।
কিন্তু জীবন কখনো কখনো কিছু কথোপকথন অসমাপ্ত রেখেই থেমে যায়। প্রথম আলো অফিসে বসে তিনি আমাকে বলেছিলেন সাক্ষাৎকার দেবেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খুব একটা সহায়তা করছিলো না গত প্রায় এক বছর ধরে।
আমরা তাঁর সঙ্গে সেই কথোপকথনটি আর করতে পারলাম না। তবে তাঁর লেখা রয়ে গেল। কিশোর লেখার পুরোনো পাতায় তাঁর লেখা রয়ে গেল। রয়ে গেল তাঁর ছড়া, তাঁর বই, তাঁর গান, তাঁর সাংস্কৃতিক কাজ। রয়ে গেল অসংখ্য শিশুর শৈশবের সঙ্গে মিশে থাকা তাঁর শব্দ।
আখতার হুসেন চলে গেলেন। কিন্তু শিশুরা যখন কোনো সহজ-সরল ছড়া পড়ে হেসে উঠবে, কোনো বইয়ের পাতায় দেশ ও স্বাধীনতার গল্প খুঁজে পাবে, কোনো পুরোনো গান গাইবে—তখন হয়তো কোথাও না কোথাও ফিরে আসবেন এই মানুষটি।
কিশোর লেখার পাতায়, শিশুদের হাসিতে, আমাদের স্মৃতিতে—আখতার হুসেন থেকে যাবেন।
আইরীন নিয়াজী মান্না-সম্পাদক : কিশোর লেখা
- জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে বিক্ষোভ, নারীসহ গ্রেপ্তার অন্তত ৩০
- নারীর বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা ঠেকানোর আহ্বান
- জামালপুর সদর হাসপাতালের বেহাল দশা
- এশিয়ান গেমসে নারী হকিতে বাংলাদেশের প্রথম পয়েন্ট
- রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ: ডা. জুবাইদা
- ঢাকায় আজও বৃষ্টি, বাড়তে পারে তাপমাত্রা
- দূষিত শহরের শীর্ষে লাহোর, ঢাকা ১৯তম
- শর্টবোর্ড সার্ফিংয়ের হিটে ফাতেমা তৃতীয়
- জাতিসংঘ সভাপতির দপ্তরে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান
- ইতালির স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধ, বিদেশি কোটা ৩০ ভাগ
- ৪৬-এও বিয়ের তাড়া নেই রাইমা সেনের
- রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় শিশুসহ আহত ৮
- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
- আখতার হুসেন: কিশোর লেখার এক আপন মানুষ
- আজ ও কাল হজের টাকা জমা নিতে ব্যাংক খোলা
- শিক্ষকতা থেকে নেতৃত্বে সেলিনা পলি খানম
- আলোচিত সেই বিউটি রানী পাল হলেন জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক
- শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আর নেই
- ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
- সাহায্য চাইছিল পড়ে থাকা রক্তাক্ত নারী, ছবি তুলতে ব্যস্ত জনতা
- ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি, লাগবে যেসব যোগ্যতা
- শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ
- ভারতে স্লিপার বাসে ভয়াবহ আগুন, নারীসহ ৯জনের প্রাণহানী
- প্লাটিলেট বাড়াবে যেসব খাবার
- রাজধানীতে আজ সকালে এক পশলা বৃষ্টি
- এশিয়ান গেমসে নারী হকিতে বাংলাদেশের প্রথম পয়েন্ট
- চার দিন ঘরবন্দি থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শোনালেন রাধিকা
- রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ: ডা. জুবাইদা
- নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব নিশ্চিতে জোর বাংলাদেশ



