ঢাকা, শনিবার ০৩, অক্টোবর ২০২৬ ৪:৪৬:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ঢাকা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক হুমায়ূন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হাম উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, নতুন ভর্তি ১২৪২ কক্সবাজারে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো প্রশাসন চার্চ থেকে চুরি হওয়া ৭০ কেজির পিতলের ঘণ্টা উদ্ধার

ইউএনওর হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহ বন্ধ—প্রশ্নটা থেকেই যায়

আহমেদ জামান | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:২৬ পিএম, ২ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

টাঙ্গাইল সদরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে—আজকের খবরটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির। একটি শিশুর জীবন অন্তত অকালবিবাহের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তির খবরের আড়ালেই থেকে যায় আরও কঠিন, অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন।

একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে কেন ইউএনওকে হস্তক্ষেপ করতে হলো? বিয়ের আয়োজন যখন প্রায় সম্পন্ন, তখন প্রশাসনের নজরে এল কেন? তার আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, পরিবারকল্যাণকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সমাজের অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ কি বিষয়টি জানতেন না?

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। এ নিয়ে আইন আছে, নীতিমালা আছে, প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে, সচেতনতামূলক কর্মসূচি আছে। তারপরও বাল্যবিবাহের আয়োজন থেমে নেই। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা গিয়ে একটি বিয়ে বন্ধ করেন, জরিমানা করেন, মুচলেকা নেন—এরপর আমরা সেটিকে সাফল্যের খবর হিসেবে প্রকাশ করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি বিয়ে বন্ধ করাই কি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সাফল্য?

বরং প্রতিটি এমন ঘটনা আমাদের ব্যর্থতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

একজন কিশোরীর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার আগেই যদি স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় থাকত, তাহলে ইউএনওর শেষ মুহূর্তের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ত না। বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব কেবল ইউএনও কিংবা প্রশাসনের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিয়ের আয়োজন শুরু হওয়ার পর খবর আসে; অর্থাৎ প্রতিরোধ নয়, ব্যবস্থা নেওয়া হয় ঘটনার দ্বারপ্রান্তে এসে।

আরও বড় প্রশ্ন পরিবারকে নিয়ে। মেয়েটি তো একা বিয়ে ঠিক করেনি। প্রাপ্তবয়স্কদের সিদ্ধান্তেই তার জীবনের এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বপ্নের কথা ভাবার কথা, সেই পরিবারই যখন অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিতে চায়, তখন শুধু আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দরকার সামাজিক ও মানসিকতার পরিবর্তন।

বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের শুধু শৈশব কেড়ে নেয় না; তার শিক্ষা থামিয়ে দেয়, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সংকুচিত করে। অথচ এখনো অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। এই মানসিকতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যতটা প্রয়োজন, সামাজিক প্রতিরোধও ততটাই জরুরি।

তাই টাঙ্গাইল সদরের ঘটনাকে শুধু ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটিকে দেখতে হবে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে। প্রশাসন একটি বিয়ে বন্ধ করেছে—ভালো কথা। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন, সেটিও খুঁজে দেখা দরকার।

প্রশ্ন করতে হবে—এলাকায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কার্যকর নজরদারি আছে কি না। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কিশোরীদের বিষয়ে কেউ খোঁজ নেয় কি না। বিয়ের আয়োজনের আগেই খবর পাওয়ার মতো কোনো কার্যকর স্থানীয় ব্যবস্থা আছে কি না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাল্যবিবাহ বন্ধ করার পর সেই পরিবার ও মেয়েটির পাশে কে দাঁড়াবে?

কারণ একটি বিয়ে বন্ধ করে দায়িত্ব শেষ হয় না। বিয়ে বন্ধ করার পর মেয়েটি যেন আবার পারিবারিক চাপ, সামাজিক অপমান কিংবা অন্য কোনো ঝুঁকির মুখে না পড়ে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা চাই, আর কোনো বাল্যবিবাহ বন্ধের খবরের সঙ্গে ‘ইউএনওর হস্তক্ষেপে’ কথাটি যেন সংবাদে লিখতে না হয়। কারণ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়ে বন্ধ হওয়া ভালো খবর হলেও, তার চেয়েও ভালো খবর হবে—বাল্যবিবাহের আয়োজনই হচ্ছে না।

সেই দিনটির জন্য শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, জবাবদিহি এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। একটি শিশুকে বিয়ের হাত থেকে বাঁচানো জরুরি; কিন্তু তার শৈশব, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা আরও জরুরি।