ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:২৭:৩৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

চীনে পোষ্য কুকুরে মিলছে সন্তানের ছায়া

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:২১ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার

চীনে পোষ্য কুকুরে মিলছে সন্তানের ছায়া

চীনে পোষ্য কুকুরে মিলছে সন্তানের ছায়া

বিকেলের নরম আলো নেমে এসেছে। চীনের রাজধানী  বেইজিং–এর কোনো এক পার্কে ধীরে ধীরে হাঁটছেন এক বৃদ্ধ দম্পতি। তাদের পাশে ছোট্ট সাদা লোমশ একটি কুকুর। কখনো কোলে, কখনো মাটিতে নেমে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে সে। বৃদ্ধা মাঝেমধ্যে ঝুঁকে তার গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বৃদ্ধ লোকটি ব্যাগ থেকে বের করে দিচ্ছেন ছোট্ট বিস্কুট। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, হয়তো নাতিকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন তারা। কিন্তু না, এটি তাদের পোষা কুকুর—যাকে তারা প্রায় সন্তানের মতোই ভালোবাসেন।

এ দৃশ্য এখন শুধু বেইজিং নয়, সাংহাই, গুয়াঙজো, সেনজেনসহ চীনের নানা শহরে খুবই পরিচিত এক চিত্র। সকালবেলা পার্কে, সন্ধ্যায় আবাসিক এলাকার সামনে, এমনকি শপিংমল কিংবা বাজারেও দেখা যায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের পোষা কুকুরদের।

কেন এমন বদল?

চীনের সামাজিক কাঠামোয় গত কয়েক দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় এক ছাদের নিচে কয়েক প্রজন্মের একসঙ্গে থাকার সংস্কৃতি ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য দূর শহরে চলে যাওয়া তরুণ প্রজন্ম এবং বৈশ্বিক চাকরির বাজারে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সেই চিত্র বদলে গেছে।

অনেক ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা বা চাকরির কারণে বাড়ি ছাড়ে। কেউ যায় অন্য শহরে, কেউ অন্য দেশে। ব্যস্ত জীবনের চাপে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হয় খুব কম। ফোন বা ভিডিও কলে যোগাযোগ থাকলেও শারীরিক উপস্থিতির অভাব পূরণ হয় না।

এই শূন্যতাই অনেক বয়স্ক মানুষকে টেনে নিয়েছে পোষা প্রাণীর দিকে।

পোষ্য, কিন্তু আসলে পরিবারের সদস্য

চীনের অনেক পরিবারে পোষা কুকুরকে আর শুধু প্রাণী হিসেবে দেখা হয় না; তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

অনেকেই কুকুরের নাম রাখেন নিজের ছেলে-মেয়ে বা নাতি-নাতনির নামে। কেউ আবার এমন নাম রাখেন, যেটি ডাকলে মনে হয় ঘরের ছোট কাউকে ডাকছেন।

বৃদ্ধা মায়েরা যেমন সন্তানের জন্য রান্না করে রাখতেন, এখন তেমন যত্নে পোষ্যের খাবার তৈরি করেন। কেউ বিশেষ ডায়েট চার্ট মেনে চলেন, কেউ চিকিৎসকের পরামর্শে খাবার বেছে দেন।

কুকুরের জন্মদিন পালন, নতুন পোশাক কেনা, পার্লারে নিয়ে যাওয়া, এমনকি ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করাও এখন চীনের শহুরে জীবনের অংশ।

একাকীত্বের বিরুদ্ধে নীরব লড়াই

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বার্ধক্যে একাকীত্ব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় একা থাকা থেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, এমনকি শারীরিক অসুস্থতাও বাড়তে পারে।

এখানে পোষা প্রাণী এক ধরনের মানসিক সহায়তা দেয়।

কুকুরকে খাওয়ানো, হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া, গোসল করানো কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানো—এসব কাজ বৃদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনে নতুন রুটিন তৈরি করে। এতে তারা সক্রিয় থাকেন, সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে।

পার্কে গিয়ে অন্য পোষ্যপ্রেমীদের সঙ্গে গল্প হয়, অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। অনেক সময় নতুন বন্ধুত্বও তৈরি হয়।

‘ফার বেবি’ সংস্কৃতির উত্থান

চীনে এখন একটি শব্দ বেশ জনপ্রিয়—“ফার বেবি” বা লোমশ সন্তান।

এই শব্দটি শুধু মজা করে বলা নয়; এটি আসলে বদলে যাওয়া পারিবারিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

এক-সন্তান নীতির দীর্ঘ প্রভাব, কম জন্মহার, দেরিতে বিয়ে বা বিয়ে না করার প্রবণতা—সব মিলিয়ে চীনে পরিবার কাঠামো বদলেছে। ফলে শুধু বৃদ্ধরাই নন, তরুণদের মধ্যেও পোষ্যকে সন্তানসম ভালোবাসার প্রবণতা বেড়েছে।

তবে বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আবেগঘন। কারণ তাদের কাছে পোষ্য অনেক সময় অনুপস্থিত সন্তানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

বাজারও বদলে গেছে

চীনে পোষা প্রাণী কেন্দ্রিক বিশাল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

পোষা প্রাণীর খাবার, খেলনা, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা, ডে-কেয়ার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এমনকি পোষ্যদের জন্য বিশেষ ক্যাফেও তৈরি হয়েছে।

বেইজিংয়ের অনেক মার্কেট বা শপিং এলাকায় এখন এমন দোকান দেখা যায়, যেখানে কুকুরের জন্য শীতের জ্যাকেট থেকে শুরু করে উৎসবের পোশাক পর্যন্ত পাওয়া যায়।

বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা সেসব দোকানে গিয়ে অনেক যত্নে পছন্দ করে কিনে আনেন তাদের প্রিয় সঙ্গীর জন্য।

ভালোবাসার ভাষা বদলায়, মমতা বদলায় না

সন্তান বড় হয়ে দূরে চলে যায়—এটাই জীবনের নিয়ম। কিন্তু বাবা-মায়ের স্নেহ তো আর দূরত্ব মানে না।

সেই স্নেহ কখনো ফোনের ওপারে অপেক্ষা করে, কখনো উৎসবের দিনে খালি ঘর দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আবার কখনো ছোট্ট এক পোষ্যের চোখে নিজের সন্তানের ছায়া খুঁজে নেয়।

চীনের শহরগুলোর পার্কে যখন কোনো বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখা যায় তাদের কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে, তখন সেটি শুধু একটি পোষা প্রাণীকে নিয়ে বেড়ানো নয়। সেটি আসলে নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে এক নরম প্রতিবাদ, ভালোবাসার নতুন ভাষা, আর বয়সের শেষ প্রান্তেও সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার এক মানবিক গল্প।

ভালোবাসা কখনো ফুরোয় না—শুধু তার ঠিকানা বদলে যায়।