ঢাকা, রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬ ২০:০৯:৫৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ২ হাজার ৮৮ মূল্যস্ফীতির চাপে ঋণের ফাঁদে দেশের ৪৭ শতাংশ পরিবার বাংলাদেশের নারী টি-টোয়েন্টি দলের নতুন অধিনায়ক নাহিদা ভারতে মন্দিরের কাছে ট্রাকচাপায় ১২ ভক্ত নিহত তৃণমূলে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের উদ্যোগ ছদ্মনামে লিখে সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ইসাবেল আলেন্দে কলকাতায় পূজামণ্ডপ ভেঙে ১৩ নারীসহ ১৯ জনের প্রাণহানী ঢাকায় বৃষ্টি ঝরবে কিনা, জানাল আবহাওয়া অধিদফতর

ছোটগল্প ‘সা র স’ : আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:৪৮ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

ছোটগল্প ‘সা র স’ : আইরীন নিয়াজী মান্না

ছোটগল্প ‘সা র স’ : আইরীন নিয়াজী মান্না

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। পূর্ব আকাশের গায়ে কে যেন একটু একটু করে গোলাপি রং মাখিয়ে দিচ্ছে। রাতের শিশিরে ভিজে আছে ধানখেতের সবুজ পাতা, ঘাসের ডগা আর আলপথের দুপাশে ফুটে থাকা ছোট ছোট বুনো ফুল। দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। কোথাও একটা দোয়েল শিস দিচ্ছে, পুকুরের জলে ঝুপ করে ডুব দিল মাছরাঙা।
এমন সময় ধানখেতের ওপরে উড়ে এল একটি বড় পাখি।
তার লম্বা দুটি পা পিছনের দিকে ছড়িয়ে আছে, গলা সামনের দিকে প্রসারিত। প্রশস্ত ডানায় সকালের বাতাস ভর করে সে এগিয়ে চলেছে। রোদ তখনো ওঠেনি, তবু তার ধূসর-সাদা পালকে ভোরের আলো চিকচিক করছে।
পাখিটির নাম সারস।
গ্রামের মানুষ তাকে চেনে। কেউ বলে সারস পাখি, কেউ বলে সারস। জলাভূমি, বিল, হাওর কিংবা ধানখেতের আশপাশে কখনো কখনো তার দেখা মেলে। লম্বা পা দিয়ে অগভীর পানিতে হেঁটে বেড়ায়, সরু ঠোঁট দিয়ে খুঁজে নেয় ছোট মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড় কিংবা জলজ প্রাণী। তার চলাফেরায় কেমন একটা ধীর, শান্ত গাম্ভীর্য। মনে হয়, সে যেন এই পৃথিবীর অনেক পুরোনো গল্প জানে।
সেদিন যে সারসটি ধানখেতের পাশে নেমেছিল, তার নাম ছিল শঙ্খ।
শঙ্খের গায়ের পালক ধূসর, বুকের দিকে হালকা সাদা আভা। তার চোখ দুটি উজ্জ্বল, আর লম্বা ঠোঁটটি বেশ ধারালো। সে এক পা তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কচুরিপানার ফাঁক থেকে একটি ছোট ব্যাঙ লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল। শঙ্খ ঠোঁট বাড়াতেই ব্যাঙটি আবার পানিতে ঝপাং করে ডুব দিল।
শঙ্খ মাথা কাত করে তাকাল। তারপর এমন ভঙ্গিতে ঘাড় সোজা করল, যেন কিছুই হয়নি।
ঠিক তখনই পাশের আলপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ছোট্ট মেয়ে মেঘলা। তার এক হাতে বইয়ের ব্যাগ, অন্য হাতে লাল রঙের একটি পানির বোতল। স্কুলে যাওয়ার আগে সে প্রায়ই ধানখেতের পাশ দিয়ে হাঁটে। মাঠের পাখিদের দেখতে তার খুব ভালো লাগে।
সারসটিকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল।
‘আহা! কী সুন্দর পাখি!’
মেঘলা ফিসফিস করে বলল, যেন একটু জোরে কথা বললেই পাখিটি উড়ে যাবে।
শঙ্খ একবার তার দিকে তাকাল। তারপর আবার জলাভূমির দিকে মন দিল।
মেঘলা বাড়ি ফিরে মাকে বলল, ‘মা, আজ একটা সারস দেখেছি। কী লম্বা পা! কী সুন্দর করে হাঁটে! ও কি আমাদের গ্রামের পাখি?’
মা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের দেশে সারসের দেখা পাওয়া যায়। তবে সব জায়গায় নয়। জলাভূমি আর খোলা মাঠের কাছাকাছি এরা খাবার খুঁজতে আসে। পাখিরা যেখানে নিরাপদ বোধ করে, সেখানেই থাকতে ভালোবাসে।’
‘তাহলে আমরা যদি ওদের জন্য একটা জায়গা নিরাপদ করে রাখি, ওরা কি এখানে থাকবে?’
মা হেসে বললেন, ‘আমরা প্রকৃতির যত্ন নিলে অনেক পাখিই ফিরে আসতে পারে। তবে মনে রেখো, পাখিদের ভালোবাসা মানে শুধু তাদের কাছে টেনে নেওয়া নয়, তাদের নিজের মতো বাঁচতে দেওয়াও।’
মায়ের কথাটা মেঘলার মনে গেঁথে গেল।
পরদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে আবার শঙ্খকে দেখতে পেল। পাখিটি তখন ধানখেতের পাশের অগভীর জলায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার ছায়া পানির ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। হালকা বাতাসে কচুরিপানার গোল পাতা দুলছে, আর পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটি ছোট সাদা ফুল।
মেঘলা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, জলার এক পাশে পড়ে আছে ছেঁড়া পলিথিন, খাবারের প্যাকেট আর প্লাস্টিকের কয়েকটি কাপ। আরও একটু দূরে জমে আছে নোংরা পানি। জায়গাটির দিকে এগিয়ে যেতেই সে দেখল, শঙ্খ বারবার ঠোঁট নামিয়ে কিছু খুঁজছে। কিন্তু পলিথিনের টুকরো বাতাসে উড়ে তার পায়ের কাছে চলে এলেই সে সতর্ক হয়ে সরে যাচ্ছে।
মেঘলার মন খারাপ হয়ে গেল।
‘এই সুন্দর জায়গাটাকে এমন নোংরা করে রেখেছে কারা?’
সে বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলল। বাবা বললেন, ‘মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে না, তার ফেলে দেওয়া ছোট্ট একটি জিনিসও অন্য প্রাণীর বিপদ ডেকে আনতে পারে। পলিথিন আর প্লাস্টিক জলাভূমিকে নোংরা করে, পাখিদের খাবার খুঁজতেও অসুবিধা হয়।’
মেঘলা বলল, ‘বাবা, আমরা কি জায়গাটা পরিষ্কার করতে পারি?’
পরদিন বিকেলে মেঘলা তার বন্ধু রাফি, তুলি আর নীলকে নিয়ে হাজির হলো জলার ধারে। সঙ্গে ছিল কয়েকটি বস্তা, ঝুড়ি আর হাতমোজা। তাদের দেখে প্রথমে গ্রামের দু-একজন মানুষ হেসে বললেন, ‘এইটুকু বাচ্চা মিলে এত বড় জায়গা পরিষ্কার করবে?’
মেঘলা হাসিমুখে বলল, ‘আমরা পুরো পৃথিবী পরিষ্কার করতে পারব না। কিন্তু আমাদের গ্রামের এইটুকু জায়গা তো পারব!’
কথাটা শুনে পাশের চায়ের দোকানের কুদ্দুস চাচা এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ‘বেশ কথা! দাঁড়াও, আমিও আসছি।’
তারপর এলেন আরও কয়েকজন। কেউ কুড়িয়ে নিলেন প্লাস্টিকের বোতল, কেউ সরালেন পলিথিন, কেউ জমে থাকা আবর্জনা তুলে রাখলেন নির্দিষ্ট বস্তায়। মেঘলার মা শিশুদের জন্য পানি নিয়ে এলেন। গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষ জলার পাশে একটি ফলকও লাগিয়ে দিলেন। তাতে লেখা হলো—
‘জলাভূমি আমাদের সম্পদ। এখানে ময়লা ফেলবেন না। পাখিদের বাঁচতে দিন।’
কাজ শেষ হতে হতে বিকেলের রোদ নরম হয়ে এসেছে। আকাশের পশ্চিম প্রান্তে মেঘের গায়ে সোনালি আভা। জলার পানি যেন আবার একটু স্বচ্ছ দেখাচ্ছে। কচুরিপানার ফাঁক দিয়ে মাথা তুলেছে একটি ছোট মাছ।
মেঘলা চারদিকে তাকিয়ে খুশিতে হাততালি দিল।
‘দেখো, জায়গাটা কত সুন্দর লাগছে!’
কিন্তু শঙ্খ কোথায়?
অনেকক্ষণ খুঁজেও তাকে দেখা গেল না। মেঘলার মনে একটু দুঃখ হলো। এত কষ্ট করে জায়গাটা পরিষ্কার করা হলো, অথচ পাখিটা একবারও এল না!
রাফি বলল, ‘হয়তো অন্য কোথাও চলে গেছে।’
মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আলোয় এক ঝাঁক বক উড়ে যাচ্ছে। তাদের ডানার নিচে শেষ বিকেলের আলো চিকচিক করছে।
‘আসবে,’ মেঘলা আস্তে করে বলল, ‘জায়গাটা ভালো থাকলে একদিন নিশ্চয়ই আসবে।’
তারপর কেটে গেল কয়েক দিন।
প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় মেঘলা জলার দিকে তাকায়। কখনো শালিক আসে, কখনো পানকৌড়ি ডুব দিয়ে মাছ ধরে, কখনো দু-একটি বক নেমে দাঁড়ায় পানির ধারে। কিন্তু শঙ্খের দেখা নেই।
একদিন ভোরে মেঘলার ঘুম ভাঙল দূর থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত এক ডাক শুনে। সে জানালার কাছে ছুটে গেল। কুয়াশার পাতলা চাদর তখনো মাঠের ওপর বিছানো। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ধানখেতের মাথায় এসে পড়ছে।
আর সেই আলোয়, জলার ধারে, দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খ!
তার পাশে আরও একটি সারস। দুজনেই লম্বা গলা বাড়িয়ে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। শঙ্খ এক পা তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর ঠোঁট নামিয়ে খাবার খুঁজতে লাগল। অন্য সারসটিও তার পাশে হাঁটছে।
মেঘলা আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। পাখিদের ভয় দেখাতে চায় না সে। তাড়াতাড়ি মা-বাবাকে ডেকে আনল।
তারা তিনজন দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখল, সকালের আলোয় সারস দুটির পালক ঝলমল করছে। হালকা বাতাসে তাদের ডানা কেঁপে উঠছে। একটু পর একটি সারস গলা উঁচু করে ডাকল। তার ডাক ভেসে গেল মাঠের ওপর দিয়ে, বাঁশবাগান পেরিয়ে, দূরের নদীর দিকে।
মেঘলার মনে হলো, পাখিটি যেন বলছে, ‘আমরা এসেছি। এই জায়গাটা আমাদেরও।’
সেদিন স্কুলে গিয়ে মেঘলা বন্ধুদের সব বলল। তারা ঠিক করল, জলাভূমির যত্ন নেওয়ার কাজ তারা চালিয়ে যাবে। শুধু সারস নয়, সব পাখি, মাছ, ব্যাঙ আর জলজ প্রাণীর জন্যই জায়গাটি ভালো রাখতে হবে।
শিক্ষক তাদের কথা শুনে বললেন, ‘তোমরা একটা বড় শিক্ষা পেয়েছ। প্রকৃতি শুধু মানুষের নয়। এই পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কোনো পাখি আমাদের কথা বুঝতে পারে কি না, তা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা কী করছি, তার প্রভাব তারা ঠিকই অনুভব করে।’
সেদিন বিকেলে মেঘলা আবার জলার ধারে গেল। দূরে শঙ্খকে দেখা যাচ্ছে। সে পানির মধ্যে ধীরে ধীরে হাঁটছে। কখনো স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কখনো ঠোঁট নামিয়ে খাবার খুঁজছে। তার পাশে অন্য সারসটি নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মেঘলা মৃদু হেসে বলল, ‘ভালো থেকো, শঙ্খ। তোমাদের জন্য এই জায়গাটা আমরা যত্ন করে রাখব।’
পাখিটি তার কথা শুনল কি না, কে জানে! সে শুধু একবার মাথা তুলে তাকাল। তারপর ডানা মেলে উড়ে গেল জলার অন্য প্রান্তে।
আকাশে তখন সূর্য ডুবছে। পশ্চিম দিগন্তে লাল, কমলা আর সোনালি রঙের মেলা বসেছে। সেই রঙের ভেতর দিয়ে সারসটির লম্বা ডানা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
মেঘলা দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।