ঢাকা, রবিবার ১৪, জুন ২০২৬ ১৬:২৩:৪৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রামিসা হত্যা: মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের আপিল গ্রহণ হাইকোর্টে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলকে রুখে দিল মরক্কো ৮তলা থেকে পড়ে অভিনেত্রীর মৃত্যু, স্বামী রিমান্ডে ১০ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালু হচ্ছে কাল চ্যাটজিপিটির প্রভাবে তরুণীর মৃত্যু, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা

জরায়ু মুখের ক্যান্সার সম্পর্কে যা জানা জরুরী

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪.কম

আপডেট: ০২:০৫ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০১৮ রবিবার

আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা এজেন্সি সাম্প্রতিক এক জরীপে বলছে বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে। প্রতি বছর নতুন করে ১২ হাজারের মতো নারীর শরীরে এই ক্যান্সার সনাক্ত হচ্ছে। অথচ অন্য ধরনের ক্যান্সারের তুলনায় জরায়ু মুখের ক্যান্সার খুব সহজে নির্ণয় করা যায়।


এমনকি হওয়ার আগেই ধরা যায়। তাছাড়া দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল, এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও এটি নির্ণয়ের প্রাথমিক ধাপটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়।


তবুও বাংলাদেশে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের হার এত বেশি কেন?


ঢাকায় জাতিয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের হাসপাতালের গাইনি অংকলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ আফরোজা খানম বলেন, জরায়ু মুখের ক্যান্সার নিয়ে হাসপাতালে যেসব নারীরা আসেন তাদের বেশিরভাগেরই বড্ড দেরি হয়ে গেছে। জরায়ু মুখের ক্যান্সারের মূল সমস্যা হল এটি শেষ পর্যায়ে গেলেই শুধুমাত্র ব্যথা দেখা দেয়। এর লক্ষণগুলোকে অনেকেই মাসিকের মেয়েলি সমস্যা বলে ভুল করে থাকেন।যখন চিকিৎসকের আসে আসেন তখন প্রায়শই অনেক দেরি হয়ে যায়।


তিনি বলেন, "ব্যথা একদমই থাকে না। এর ব্যথা থাকে কখন যখন শেষ পর্যায়ে চলে যায়, যখন রোগটা অনেক দূর ছড়িয়ে যায়। হাড়ের মধ্যে চলে যায়। এই পর্যায়ে গিয়ে ব্যথা হয়। প্রাথমিক ভাবে কোন ব্যথা থাকে না দেখেই কিন্তু আমাদের দেশের মহিলারা আসে না। প্রিভেনশন তো বোঝেই না, যখন হয়, হওয়ার পরেও তারা অপেক্ষা করে। দেখা যায় দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যাচ্ছে কিন্তু লজ্জায় সে কাউকে বলছে না। স্বামীর সাথে মেলামেশায় রক্ত যাচ্ছে সেটিও সে বলছে না। যখন আসে তখন অনেকে দেরি হয়ে যায়।"


অথচ এতদূর পর্যন্ত এটি গড়ানোরই কথা নয়। কারণ অন্য ধরনের ক্যান্সারের তুলনায় জরায়ু মুখের ক্যান্সার সবচাইতে সহজে নির্ণয় করা যায়। এমনকি হওয়ার আগেই খুব সহজ পরীক্ষায় ধরা যায় ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা। জীবাণু প্রবেশের পর জরায়ু-মুখের ক্যান্সার হতে ১৫ থেকে ২০ বছরও সময় লাগে।


বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ জেবুন্নেসা বেগম জরায়ু মুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিং সম্পর্কে প্রচারে সহায়তা করেন।


তিনি বলেন, জরায়ু মুখের ক্যান্সার হওয়ার আগেই নির্ণয়ে অনেক সময় পাওয়া যায়। অল্প বয়সে বিয়ে আর অনেক বাচ্চা হওয়া অন্যতম প্রধান কারণ।


তিনি সেটি সম্পর্কে বিস্তারিত যা বললেন তা হল, "যে দুই প্রকার প্যাপিলোমা ভাইরাস দিয়ে এই ক্যান্সার হয়, সহবাসের মাধ্যমেই সেটি স্প্রেড হয়। ভাইরাসটি ঢোকার সাথে সাথেই ক্যান্সার হয় না। অন্য ক্যান্সারে জীবাণুটি ঢোকার পরে আমরা সময় খুব একটা পাইনা। কিন্তু জরায়ু-মুখের ক্যান্সারে ১৫ থেকে ২০ বছরও সময় লাগে জীবাণু প্রবেশের পর ক্যান্সারটি হতে। তার মানে হল এটি নির্ণয়ে এতটা সময় পাওয়া যায়। নিয়মিত স্ক্রিনিং করালে ইনিশিয়ালি আমরা জার্মটা কমিয়ে দিতে পারি।"


ক্যান্সার শব্দটি শুনলে বেশিরভাগ মানুষের মাথায় সম্ভবত ভীতিকর কিছুর অনুভূতি হয়। কিন্তু এর সাথে যখনি জরায়ু মুখ শব্দটি যুক্ত হয় তখন অনেকেই এ নিয়ে কথা বলায় যেন সংকোচ বোধ করেন। আর এর সাথে যৌন সম্পর্কের বিষয়টি যুক্ত থাকায় সে নিয়ে কথা বলায় রয়েছে আরও আড়ষ্টতা। এমনকি চিকিৎসকেরাও তার বাইরে নন। অথচ জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপটি অত্যন্ত সহজ। সময়ও লাগে মাত্র এক মিনিট বলেন ডাঃ জেবুন্নেসা বেগম।


তিনি বলছেন, "এর স্ক্রিনিংটা খুবই সহজ। কোন যন্ত্রপাতি লাগে না। আমরা সবাই ভিনেগার বা সিরকার সম্পর্কে শুনেছি। সেটি ডাইলুট করে তুলায় লাগিয়ে জরায়ুর মুখে লাগিয়ে এক মিনিট রেখে দিলে যায়গাটা যদি সাদা হয়ে যায় তখন মনে করতে হবে এটি ক্যান্সারের পূর্বাভাস। তখন আমরা সেটি কোন পর্যায়ে আছে তা জানতে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে বাকি পরীক্ষা করতে পাঠাই। এমনও হয় খুব প্রাথমিক হলে সেখানেই রোগীর জরায়ুতে ইলেকট্রিক সেক দিয়ে দেয়া হয়। সেটাতেও কয়েক মিনিট লাগে"।


বাংলাদেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, এমনকি নির্বাচিত কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের প্রাথমিক ধাপটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়। অর্থাৎ বিবাহিত ও যৌন সংসর্গ আছে এমন নারীরা সিরকা দিয়ে পরীক্ষার সহজ এই ধাপটি করিয়ে নিলেই জেনে যাবেন তার এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা।

অধ্যাপক ডাঃ এম এ হাই বলেন, নারীদের নিজেদের সম্পর্কে কথা বলতে হবে। বয়স তিরিশ হওয়ার পর থেকে প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর একবার এই পরীক্ষাটি করিয়ে নিতে বলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু এত সহজ ও বিনামূল্যে সেবা থাকা সত্ত্বেও জরায়ু মুখের ক্যান্সার বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান ক্যান্সার। এতে বছরে মারা যাচ্ছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি। নতুন করে ১২ হাজারের মতো নারীর শরীরে এই ক্যান্সার সনাক্ত হচ্ছে।


ডাঃ আফরোজা খানম বলছেন, "এর সনাক্তকরণের বিনামূল্যের সেবাটি সম্পর্কে তথ্য নারীরা অনেকেই জানেন না। জানলেও সংসার ফেলে সময় ও আর্থিক সমস্যার কারণে আসতে পারেন না। আবার অনেকেই বলেন আমার ক্যান্সার হয়নাই আমি কেন যাবো। স্ক্রিনিং এর উপকারটি সম্পর্কে তাদের জানাটা খুব জরুরী।"


বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এম এ হাই বলেন, এর পেছনে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা একটি সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে আর ঘন ঘন সন্তান জন্মদানকেই বলা হচ্ছে এর প্রধান কারণ।


তিনি বলেন, "আমাদের কালচারাল বিষয় হল এখানে অল্প বয়সে বিয়ে হয় আর অনেক বাচ্চা হয়। এত অল্প বয়সে সবকিছু ঠিকমতো গঠনই হয়নি। তারমধ্যেই যৌন সঙ্গম আর খুব অল্প বয়সে বাচ্চা নেয়া। এতে জরায়ু মুখের উপর অনেক চাপ পড়ে। যেহেতু তারা অপুষ্টিতে ভোগে তাই তাদের সেরে উঠতে সময় লাগে। তাতে দেখা যাচ্ছে জরায়ু মুখের রিপেয়ারটা ভালোমতো হয়না। এভাবে বারবার বাচ্চা হতে গিয়ে যদি বারবার ড্যামেজ হয় তাহলে ঐখানে একটা অ্যাবনরমাল সেল তৈরি হতে পারে।"

জরায়ু মুখের ক্যান্সারই একমাত্র ক্যান্সার যার টিকা রয়েছে। তিনি বলেন, "এর অর্থনৈতিক কারণও আছে। যেমন মেয়েরা যারা খাটাখাটি করে ফ্যামিলিতে হয়ত তাদের ঠিকমত দেখাশোনা করে না। তাদেরকে সময়মত ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়না। সে নিজে অর্থের অভাবে যেতে পারে না। আর বাংলাদেশে নারীদের স্বভাবই হল সবাই খাওয়ার পরে কিছু থাকলে খায় না থাকলে খায়না।"


ডাঃ হাই বলেন, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণের সাথে শিক্ষারও একটি বিষয় রয়েছে। তিনি বলছেন, তারই করা এক গবেষণায় তিনি দেখেছেন বাংলাদেশে যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে শিক্ষার মারাত্মক অভাব। তিনি বলছেন, "আমি আমার এক স্টাডিতে দেখেছি যে বাংলাদেশে গ্রামে ৭৫ শতাংশ নারীর জরায়ু-মুখে ইনফেকশন আছে। এর কারণ হচ্ছে সেক্সুয়াল অর্গানের পরিচ্ছন্নতার অভাব।"


তিনি বলছেন, এই পরিচ্ছন্নতা তাকে নিজেকে যেমন বজায় রাখতে হবে তেমনি তার পুরুষ সঙ্গীকেও সমানভাবে রাখতে হবে।


তিনি বলছেন, নারীরা লজ্জায় কিছু মুখ ফুটে বলে না সেই সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করতে হবে। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের এ ব্যাপারে তাদের সাথে কথা বলতে পারতে হবে।


তবে ডাঃ আফরোজা খানম হতাশা প্রকাশ করে বলছেন, "দেশে মেয়েরা রূপচর্চার জন্য যে সময় ও অর্থ ব্যয় করে সেটি যদি তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের জন্য করতো। চেহারা দেখা যায় তাই আমরা তার পেছনে সময় দিচ্ছি। কিন্তু আমার জরায়ু আমাকে মা হতে সাহায্য করে। এটির গুরুত্ব তাদের বোঝা উচিৎ।"


এর বাইরে যেসব নারীর বহু পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক, তারা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে। অথবা যেসব পুরুষের অনেক যৌন সঙ্গী রয়েছে তারাও নারী সঙ্গীদের বেশি ঝুঁকিতে ফেলছেন। কিন্তু এই ক্যান্সার সম্পর্কে আরেকটি ভালো বিষয় হল এটিই একমাত্র ক্যান্সার যার টিকা রয়েছে। যা দেয়ার উপযুক্ত সময় হল মেয়েদের যৌন জীবন শুরুর আগে।

 

সূত্র : বিবিসি অনলাইন বাংলা