ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:২৮:০০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:২৩ এএম, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ মঙ্গলবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ—শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক আবেগ, এক উৎসব, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে পুরোনো সব গ্লানি, ক্লান্তি আর দুঃখকে পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্ন আর আশার আলোয় পথচলার অঙ্গীকারই যেন এই দিনের মূল সুর।

ইতিহাসের পাতা থেকে পহেলা বৈশাখ

বাংলা সনের সূচনা মুঘল সম্রাট আকবর-এর আমলে। তখন কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌরবর্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করা হয়, যা পরবর্তীতে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিতি পায়।

ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে খাজনা আদায়ের সময় মিলিয়ে দেওয়ার জন্যই এই সংস্কারের প্রয়োজন হয়। ফলে কৃষকরা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে খাজনা দিতে পারতেন। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় একটি সাংস্কৃতিক উৎসব—পহেলা বৈশাখ।

গ্রামবাংলার উৎসব: হালখাতা থেকে মেলা

গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল এক আনন্দঘন দিন। ব্যবসায়ীরা এই দিনে ‘হালখাতা’ খুলতেন—পুরোনো দেনা-পাওনার হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা শুরু করা হতো। ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ানো, শুভেচ্ছা বিনিময়—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো।

গ্রামে গ্রামে বসত বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় থাকত মাটির খেলনা, পুতুল, লোকজ সামগ্রী, নাগরদোলা, সার্কাস আর নানা ধরনের খাবার। এই মেলাগুলো শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়—এগুলো ছিল মানুষের মিলনমেলা, আনন্দ ভাগাভাগির ক্ষেত্র।

শহরের রঙিন আয়োজন: শোভাযাত্রা ও সংস্কৃতি

সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ শহরেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ এখন এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

রঙিন মুখোশ, বিশাল মোটিফ, লোকজ প্রতীক—সব মিলিয়ে এই শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে—যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

খাবার, পোশাক আর উৎসবের আমেজ

পহেলা বৈশাখের দিন বাঙালির ঘরে ঘরে থাকে বিশেষ আয়োজন। পান্তা-ইলিশ, ভর্তা, শাক-সবজি—এই খাবারগুলো যেন এই দিনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। যদিও সময়ের সঙ্গে খাবারের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, তবুও ঐতিহ্যের ছোঁয়া রয়ে গেছে।

পোশাকেও থাকে উৎসবের রঙ। নারীরা লাল-সাদা শাড়ি, পুরুষরা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে উৎসবে অংশ নেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই মেতে ওঠে নতুন বছরের আনন্দে।

সংগীত ও সাংস্কৃতিক চেতনা

পহেলা বৈশাখ মানেই গান—বিশেষ করে এসো হে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর এই গান যেন নতুন বছরের আহ্বান হয়ে বেজে ওঠে প্রতিটি প্রভাতে।

এছাড়া লালনগীতি, পালাগান, বাউলগান—সব মিলিয়ে এই দিনটি হয়ে ওঠে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক বিশাল মঞ্চ।

অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি—সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একত্রিত হয় এই দিনে। এটি শুধু একটি উৎসব নয়—এটি এক ধরনের সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।

বাংলাদেশে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও পহেলা বৈশাখ তার নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

আধুনিকতা ও পরিবর্তনের ছোঁয়া

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও নগরায়নের প্রভাব পহেলা বৈশাখেও পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়, অনলাইন অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে উৎসবের ধরনে এসেছে নতুন মাত্রা।

তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও মূল চেতনা একই আছে—নতুনকে স্বাগত জানানো, পুরোনোকে বিদায় দেওয়া এবং জীবনের প্রতি নতুন করে ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া।

উপসংহার

পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়—এটি বাঙালির আত্মার উৎসব। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আবেগ—সব মিলিয়ে এটি আমাদের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রতিটি নতুন বছর যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন মানেই পরিবর্তন, নতুন শুরু, আর অনন্ত সম্ভাবনার পথচলা।