ঢাকা, শনিবার ০৪, জুলাই ২০২৬ ০:২৬:৫৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মেসিদের সামনে রূপকথার কেপ ভার্দে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর প্রাণহানী নারী উন্নয়নে সরকার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে: পানিসম্পদমন্ত্রী ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৫৯৫ এফডিসিতে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে শিল্পী সমিতির নির্বাচন

স্বপ্নে রঙ মেশানো মানুষ মুস্তাফা মনোয়ার

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:১৫ পিএম, ৩ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

পৃথিবীর সব শিশুই রঙ ভালোবাসে। কেউ নীল আকাশ আঁকে, কেউ সবুজ মাঠ, কেউ আবার লাল-হলুদ ফুলে ভরে তোলে সাদা কাগজ। ছোট্ট দুটি হাত যখন রঙ পেন্সিল ধরে, তখন সেই শিশুটি শুধু ছবি আঁকে না—সে তার মনের ভেতরের পৃথিবীটাকে সবাইকে দেখাতে চায়।

বাংলাদেশে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি শিশুর হাতেই লুকিয়ে আছে এক একটি রঙিন স্বপ্ন। সেই মানুষটির নাম মুস্তাফা মনোয়ার।

তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী। কিন্তু শুধু একজন শিল্পী বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন শিশুদের বন্ধু, স্বপ্নের কারিগর এবং কল্পনার শিক্ষক। তিনি জানতেন, একটি শিশুকে শুধু পড়ালেখা শেখালেই হবে না; তাকে গান শুনতে দিতে হবে, ছবি আঁকতে দিতে হবে, গল্প পড়তে দিতে হবে, প্রশ্ন করতে দিতে হবে। কারণ এসবের মধ্য দিয়েই একটি শিশুর মন বড় হয়, চিন্তা বড় হয়, মানুষ বড় হয়।

একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের জন্য একটি অনুষ্ঠান হতো। সেই অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ার খুব সহজ ভাষায় ছবি আঁকা শেখাতেন। তাঁর সামনে থাকত একটি সাদা কাগজ। হাতে থাকত রঙ কিংবা তুলি। ধীরে ধীরে কয়েকটি রেখা টেনে তিনি কখনো একটি পাখি, কখনো একটি মাছ, কখনো গ্রামের কুঁড়েঘর, আবার কখনো সবুজ গাছ এঁকে ফেলতেন।

শিশুরা অবাক হয়ে দেখত—কী সহজে একটি সাদা কাগজ রঙে ভরে উঠছে!

কিন্তু তিনি শুধু ছবি আঁকতেন না। তিনি বলতেন, “যেমন দেখছ, তেমনই আঁকো। ভুল হওয়ার ভয় পেও না। নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখো, নিজের মনে যেমন আসে তেমনই আঁকো।”

এই কথাগুলো ছিল শিশুদের জন্য অনেক বড় সাহসের শিক্ষা।

মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন, একটি শিশুর ছবি সুন্দর হলো কি না, তার চেয়ে বড় কথা হলো—সে আনন্দ নিয়ে আঁকছে কি না। কারণ আনন্দ থেকেই জন্ম নেয় সৃজনশীলতা।

তিনি কখনো শিশুদের অন্যের ছবি নকল করতে উৎসাহ দিতেন না। বরং বলতেন, তোমার আকাশ তোমার মতোই হবে, তোমার নদীও তোমার মতো। পৃথিবীতে দুইজন মানুষের মন যেমন এক নয়, তেমনি দুইটি ছবিও এক হওয়ার দরকার নেই।

এই শিক্ষা আজও অনেক বড়।

মুস্তাফা মনোয়ার প্রকৃতিকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি চাইতেন শিশুরা বইয়ের পাতার বাইরে বেরিয়ে মাঠে যাক, নদীর দিকে তাকাক, পাখির ডাক শুনুক, ফুলের গন্ধ নিক। কারণ প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

তিনি মনে করতেন, যে শিশু একটি প্রজাপতির ডানার রঙ দেখে আনন্দ পায়, যে শিশু একটি গাছকে ভালোবাসে, যে শিশু বৃষ্টির শব্দ শুনে মুগ্ধ হয়—সে কখনো নিষ্ঠুর মানুষ হতে পারে না।

শুধু ছবি আঁকা নয়, তিনি শিশুদের গল্প, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং দেশের ইতিহাসের প্রতিও আগ্রহী করে তুলতে চেয়েছেন। তিনি জানতেন, যে শিশু নিজের দেশকে চিনবে, সে একদিন দেশকে ভালোবাসবে।

তাঁর কাছে প্রতিটি শিশু ছিল সম্ভাবনার এক একটি প্রদীপ। সেই প্রদীপে আলো জ্বালিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের বড় কাজ।

আজকের দিনে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার আর নানা প্রযুক্তির ভিড়ে অনেক শিশুই কাগজে ছবি আঁকার আনন্দ ভুলতে বসেছে। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি সাদা কাগজ, কয়েকটি রঙ পেন্সিল আর একটি মুক্ত মনই পারে অসাধারণ সব স্বপ্নের জন্ম দিতে।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সৃজনশীলতা কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটি আনন্দের, ভালোবাসার এবং নিজের মনের কথা প্রকাশ করার একটি সুন্দর পথ।

একজন শিক্ষক হয়তো শত শত ছাত্রকে পড়ান। একজন শিল্পী হাজার হাজার ছবি আঁকেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা একটি জাতির শিশুদের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।

তাঁর আঁকা ছবি হয়তো কোনো জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তাঁর ভালোবাসা স্থান পেয়েছে অসংখ্য শিশুর মনে। আজও বাংলাদেশের অনেক বড় শিল্পী, শিক্ষক কিংবা সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁদের শৈশবের অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন মুস্তাফা মনোয়ারকে।

শিশুরা যখন রঙ নিয়ে খেলে, নতুন কিছু ভাবতে শেখে, নিজের কল্পনার গল্প আঁকে, তখন যেন দূর থেকে মৃদু হেসে বলেন মুস্তাফা মনোয়ার—“ভয় পেও না, নিজের মতো করে আঁকো। পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখো।”

এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কারণ তিনি জানতেন, আজকের একটি কৌতূহলী, সৃজনশীল ও স্বপ্নবাজ শিশুই আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশের নির্মাতা।

তাই মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়। তিনি শিশুদের হাতে রঙ তুলে দেওয়া এক আলোকিত মানুষ, যিনি শিখিয়ে গেছেন—স্বপ্ন দেখতে জানলে একটি সাদা কাগজও একদিন রঙিন পৃথিবীতে পরিণত হতে পারে।