ঢাকা, শনিবার ০৩, অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৭:০১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সবজির দামে আগুন, শিম ২০০ টাকা আজ কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতুল্লাহ`র মৃত্যুবার্ষিকী যশোরে এবার ৭৩৭ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের বড় পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণকাণ্ডে তদন্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ গভর্নর ঢাকা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক হুমায়ূন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন

৩ হাজার টাকার পুঁজি থেকে ৩০ নারীর কর্মসংস্থান

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:২১ এএম, ৩ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

দিনাজপুরের তরুণী শামিমা নাসরিন।

দিনাজপুরের তরুণী শামিমা নাসরিন।

করোনার লকডাউনে যখন চার দেয়ালে বন্দি মানুষের জীবন, তখন ঘরে বসেই নিজের শখকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দিনাজপুরের তরুণী শামিমা নাসরিন। মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে সুতা ও দড়ি কিনে শুরু করেছিলেন হস্তশিল্পের কাজ। চার-পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগ এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে স্থানীয় প্রায় ৩০ নারীর।

দিনাজপুর শহরের পশ্চিম রামনগর লালবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাড়ি থেকে পরিচালিত হচ্ছে শামিমার হস্তশিল্পের কাজ। তার তৈরি ম্যাক্রামে, ড্রিমক্যাচার, ওয়ালম্যাট, প্ল্যান্ট হ্যাঙ্গার, বেতের ঝুড়ি, আয়না, টেবিল রানারসহ নানা পণ্য এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছে যাচ্ছে। অনলাইনের পাশাপাশি এসব পণ্য যাচ্ছে বিদেশেও।

শখ থেকেই শুরু

শামিমা নাসরিনের শৈশব কেটেছে লক্ষ্মীপুরে। ছোটবেলা থেকেই সূচিশিল্প ও হস্তশিল্পের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। মায়ের কাছ থেকেই এসব কাজের প্রাথমিক হাতেখড়ি। বিয়ের পর স্বামী সুজন মিয়ার সঙ্গে দিনাজপুরে এসে সংসার শুরু করেন।

ঘর সাজানোর প্রতি আগ্রহ থেকেই নিজের জন্য সুতা ও দড়ি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করতেন শামিমা। স্বামী তার কাজ দেখে উৎসাহ দেন। এরপর করোনার সময়ে ঘরে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িকভাবে হস্তশিল্প তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি।

শামিমা বলেন, ‘শুরুটা হয়েছিল নিজের ঘর সাজানোর শখ থেকে। ২০২০ সালে করোনার সময় বাইরে যাওয়া বন্ধ ছিল। তখন মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে কিছু কাঁচামাল কিনে কাজ শুরু করি। তখন ভাবিনি, এই ছোট কাজ একদিন এত মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবে।’

সুতা-দড়িতে নান্দনিক পণ্য

শামিমার উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ম্যাক্রামে ও ড্রিমক্যাচার। সুতা ও দড়ির বুনন এবং নানা ধরনের গিঁটের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এসব পণ্য। সঙ্গে ব্যবহার করা হয় পাখির পালক, বেত ও ভালো মানের বোর্ড।

তার তৈরি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ড্রিমক্যাচার, লাক্সারি ক্যানভাস ড্রিমক্যাচার, ম্যাক্রামে ওয়ালম্যাট, প্ল্যান্ট হ্যাঙ্গার, সেলফ, টেবিল রানার, বুনন টেবিল, জায়নামাজ হ্যাঙ্গার, কোরআন হ্যাঙ্গার, কুশিকাঁটার কাজ, বেতের ঝুড়ি ও ম্যাক্রামে আয়না।

পণ্যের দাম রাখা হয়েছে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। নকশা ও আকার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়।

অনলাইনে বাড়ছে বাজার

শামিমা তার ব্যবসা সম্প্রসারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘চতুর্ভুজ’ নামে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা তার পণ্য সম্পর্কে জানতে পারেন এবং অর্ডার করেন।

শামিমার ভাষ্য, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার পণ্যের অর্ডার আসে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নকশার পণ্য তৈরি করে কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমনভাবে পণ্য তৈরি করি, যাতে একই নকশার একাধিক পণ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলে ঘরের সাজে একটা আলাদা আবহ তৈরি হয়। এ কারণে অনেক ক্রেতাই একবার কেনার পর আবার অর্ডার করেন।’

৩০ নারীর কাজের সুযোগ

শামিমার উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ব্যবসা নয়, নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করা। বর্তমানে তার সঙ্গে প্রায় ৩০ জন নারী নিয়মিত কাজ করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গৃহিণী, অসচ্ছল পরিবারের নারী ও শিক্ষার্থী।

চার বছর ধরে শামিমার সঙ্গে কাজ করছেন স্থানীয় কামরুন্নাহার কাকলি। তিনি বলেন, ‘এখানে কাজ শিখে আমার জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। এখন মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করি। স্বামীর আয়ের পাশাপাশি আমার এই টাকা দিয়ে দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি।’

শিক্ষার পাশাপাশি এখানে কাজ করছেন দিনাজপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনীষা আক্তার। তিনি বলেন, ‘অবসর সময়ে এখানে কাজ করি। বিভিন্ন ধরনের ওয়ালম্যাট ও নকশার কাজ শিখেছি। এখন নিজের কিছু খরচ নিজেই চালাতে পারি। ভবিষ্যতে নিজে হস্তশিল্পের ব্যবসা করতে চাই।’

প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমের তদারকি করেন প্রোডাকশন ম্যানেজার আয়েশা সিদ্দিকা। চার বছর ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন। মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় করার পাশাপাশি কাজের ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করছেন বলে জানান তিনি।

যাচ্ছে বিদেশেও

দেশের বাজারের পাশাপাশি শামিমার তৈরি পণ্য এখন বিদেশেও যাচ্ছে। প্রবাসীদের মাধ্যমে এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত অর্ডারের ভিত্তিতে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য পাঠানো হচ্ছে।

শামিমা জানান, ভবিষ্যতে তার লক্ষ্য আরও বড় পরিসরে কাজ করা। দিনাজপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে চান তিনি। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিসিকের সহযোগিতার আশ্বাস

শামিমার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দিনাজপুরের উপমহাব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে ৩০ নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করা উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। শামিমার ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিতে বিসিকের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানান তিনি। স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, দেশি-বিদেশি মেলায় অংশগ্রহণ এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

করোনার সংকটের সময়ে নিজের শখকে পুঁজি করে শুরু করা শামিমার সেই ছোট উদ্যোগ এখন শুধু তার নিজের আয়ের পথ নয়, আরও অনেক নারীর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। সুতা, দড়ি আর বেতের বুননে তাই তৈরি হচ্ছে শুধু নান্দনিক পণ্য নয়—বদলে যাচ্ছে কয়েকটি পরিবারের জীবনও।