ঢাকা, সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬ ১:৪৫:০০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
১৭ ডিগ্রিতে নামল পঞ্চগড়ের তাপমাত্রা, বাড়ছে শীতের অনুভূতি টানা পাঁচ দিনের ছুটি শেষে আজ খুলছে অফিস-আদালত সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন, কবর খুঁড়লেন স্ত্রী-মেয়ে-বোন এইচএসসির ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ আজ লক্ষ্মীপূজা স্বর্ণের দামে টানা তিন দফায় পতন আজ ঢাকায় আসছেন জার্মান ভাইস মিনিস্টার

কুমিল্লা শহরে রানীর দিঘির পাড়ে নজরুল স্মৃতি, অবহেলার ছাপ স্পষ্ট

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:৪৭ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ রবিবার

রানীর দিঘির পারে নজরুল স্মৃতি চত্বর ময়লার ভাগার।

রানীর দিঘির পারে নজরুল স্মৃতি চত্বর ময়লার ভাগার।

কুমিল্লা গিয়েছিলাম ইতিহাসের টানে, বাবার স্মৃতির খোঁজে। দেখতে গিয়েছিলাম ভিক্টোরিয়া কলেজ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার বাবার শিক্ষাজীবনের স্মৃতি। কলেজের পাশেই, ক্যাম্পাসের ভেতরে রানির দিঘি। এই দিঘির পাড়ে রয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। সেখানে কবির ছবি, তাঁর লেখার বিষয়ে তথ্য-- সবই আছে। ছবির নিচে লেখা আছে বাস্তবায়নে মেয়র, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন। ওই যে বললাম সবই আছে, নেই শুধু সেই শ্রদ্ধা আর যত্ন, যা একজন জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি থাকা উচিত।
কুমিল্লার রানীর দিঘির পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, সময়ের ওপার থেকে ভেসে আসছে কবিতার পঙ্ক্তি আর গানের সুর। এই দিঘির পশ্চিম পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে আড্ডা দিতেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর চারপাশে জড়ো হতেন তরুণেরা। জমে উঠত কবিতা পাঠ, গান আর প্রাণবন্ত আলোচনা। এখানেই বসে ‘মাধবী লতা দোলে’সহ গান রচনা করেছেন বলে বিভিন্ন স্থানীয় বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। প্রিয় প্রমীলার কাছে চিঠিও লিখতেন এই স্মৃতিমাখা জায়গায়। আজ দীঘির পাড়ে দাঁড়ালে তাই শুধু একটি জলাশয় দেখা হয় না; অনুভব করা যায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সময়ের উপস্থিতি।
আজ জায়গাটি দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। দেয়ালের রং উঠে গেছে, গায়ে জমেছে শেওলা। দীর্ঘদিন রং করা হয়নি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখারও যেন কোনো উদ্যোগ নেই। আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। যে জায়গাটি হতে পারত কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি সুন্দর পরিসর, সেটিই এখন অবহেলার চিহ্ন বহন করছে। চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হয়, স্থানটির দেখভালের দায়িত্ব যেন কারও নেই।
প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের সম্মান করতে জানি? নাকি তাঁদের জন্মদিনে ফুল দেওয়া, মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা করা আর বক্তৃতার মঞ্চে তাঁদের নাম উচ্চারণ করাই আমাদের শ্রদ্ধার সমস্ত দায় মিটিয়ে দেয়?
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আমাদের বিদ্রোহের, মানবতার, সাম্যের এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। তাঁর কবিতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। তাঁর গান আমাদের আনন্দে, বেদনায়, সংগ্রামে সঙ্গি হয়। অথচ সেই কবির স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থানের দেয়ালে যখন শেওলা জমে, রং উঠে যায়, পাশে আবর্জনা পড়ে থাকে, তখন আমাদের শ্রদ্ধাবোধ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
কবির কবিতার পঙ্ক্তি দেয়ালে লিখে দিলেই কি তাঁর প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? ছবি টাঙিয়ে রাখলেই কি স্মৃতি সংরক্ষিত হয়? স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার পরিচর্যা করতে হয়। নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়, দেয়াল সংস্কার করতে হয়, পরিবেশ সুন্দর রাখতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, স্থানটির গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হয়।
এই জায়গাটির দেখভালের দায়িত্ব কার? রানীর দীঘিকে বেষ্টিত করে পাশেই ভিক্টোরিয়া কলেজ। কলেজ কর্তৃপক্ষ কি কখনো খোঁজ নেয়, কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির কী অবস্থা? স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট নগর প্রশাসনের নজরে কি বিষয়টি এসেছে? যদি এসে থাকে, তাহলে এমন অবহেলা কেন? আর যদি না এসে থাকে, তাহলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের দুরবস্থা তাঁদের চোখ এড়িয়ে যায় কীভাবে? কি করে নজরুল ইনস্টিটিউটের কুমিল্লা শাখা?
দায়িত্ব ঠিক কার, তা নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—স্থানটি রক্ষণাবেক্ষণের দায় কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। কলেজ কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ—সবারই এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং জবাবদিহি।
রানির দিঘির পাড়ে এই স্থানটিকে ঘিরে সুন্দর একটি স্মৃতিচত্বর গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়। দেয়ালগুলো নতুন করে সংস্কার করা যেতে পারে। কবির ছবি ও কবিতার পঙ্ক্তিগুলো পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দনভাবে সংরক্ষণ করা যায়। আবর্জনা ফেলার স্থানটি বন্ধ করে নিয়মিত পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা যায়। উপযুক্ত পরিচিতিফলকে কবির সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্ক এবং স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা যায়। শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাহিত্যপাঠ, কবিতাপাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা গেলে জায়গাটি নতুন প্রাণও পেতে পারে।
কুমিল্লা ইতিহাস ও সংস্কৃতির শহর। এই শহরের সঙ্গে নজরুলের জীবনের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেই স্মৃতিগুলো কেবল বইয়ের পাতায় কিংবা বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোকেও জীবন্ত রাখতে হবে। নইলে একসময় ইতিহাসের নাম থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের চিহ্নগুলো হারিয়ে যাবে অবহেলা আর অযত্নের নিচে।
সেদিন রানির দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে কবির ছবিগুলোর দিকে তাকিয়েছিলাম। দেয়ালে লেখা কবিতার পঙ্ক্তিগুলোও চোখে পড়েছিল। কিন্তু সেগুলোর চারপাশের নোংরা পরিবেশ দেখে আনন্দের বদলে মনে জমেছিল গভীর বিষণ্নতা। মনে হচ্ছিল, যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের মনকে জাগিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতির এই জায়গাটিই যেন ঘুমিয়ে আছে অবহেলার অন্ধকারে।
আমরা প্রায়ই বলি, নজরুল আমাদের অহংকার। কিন্তু অহংকারকে আগলে রাখতে হয়, তার মর্যাদা রক্ষা করতে হয়। কবির নাম উচ্চারণ করে তাঁকে সম্মান জানানো সহজ; তাঁর স্মৃতি রক্ষা করার দায় পালন করাই আসল পরীক্ষা।
রানির দিঘির পাড়ে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি কি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই প্রশ্ন রেখে গেলাম। আশা করি, বিষয়টি তাঁদের নজরে আসবে এবং কথার বাইরে বাস্তব উদ্যোগ দেখা যাবে।
কবির ছবির পাশে ময়লার স্তূপ নয়—থাকুক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সবুজের ছোঁয়া আর শ্রদ্ধায় নত হওয়া মানুষের পদচারণা। কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি আমাদের সম্মানটুকু অন্তত এতটা হওয়া উচিত।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক- উইমেননিউজ২৪.কম