ঢাকা, শনিবার ২৪, অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৫৭:৫৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ভাঙছে প্রায় ৪৪টি সংসার সৌদিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা আছে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস খাদে,৩জনের প্রাণহানী কমছে না পোলাওর চাল ও আটা-ময়দার দাম ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ২৬ অক্টোবর থেকে চলবে মহানগর এক্সপ্রেস তিব্বতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প: নিহত ১৬, আহত অর্ধশতাধিক অপ্রতীম হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল

বিদ্রোহী কবি নজরুল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গল্প

ফিচার ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৫৭ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

১৯২৭ সালের ডিসেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলায় নারীশিক্ষার পথ তখনো নানা সামাজিক বাধায় সংকীর্ণ। উচ্চশিক্ষার আঙিনায় নারীর উপস্থিতি ছিল বিরল, আর নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিয়ে সমাজে ছিল কঠোর রক্ষণশীলতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের পরিবেশ কেমন ছিল? নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও যে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, তার সাক্ষ্য পাওয়া যায় পরবর্তী সময়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৫৩ সালে তাঁর ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, কোনো ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হলে প্রক্টরের কাছে আবেদন করতে হতো। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক কথোপকথনও একসময় প্রশাসনিক অনুমতির অধীন ছিল।

এমন এক রক্ষণশীল পরিবেশেই প্রচলিত একটি কাহিনিতে উঠে এসেছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম।

কাহিনিটি বলে, ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতা থেকে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে এসেছিলেন নজরুল। ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা এসে পৌঁছালেন কার্জন হলের সামনে। তখন কার্জন হল ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভবন।

হঠাৎ নজরুলের চোখে পড়ল এক তরুণী। পরনে সুতির শাড়ি, গায়ে তিন-চতুর্থাংশ হাতার ব্লাউজ। সাদামাটা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তিনি সঙ্গীদের কাছে জানতে চাইলেন, কে এই তরুণী?

বন্ধুরা জানালেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষার্থী—ফজিলাতুন্নেছা।

নামটি শুনে নজরুল আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তিনি তরুণীর সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যেতে চাইলে বন্ধুরা তাঁকে বাধা দিলেন। তাঁদের আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে ছাত্রীর সঙ্গে কথা বললে বিপদে পড়তে পারেন তিনি।

কিন্তু নজরুল তো নজরুলই! অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রচলিত বাধা ভাঙার সাহস আর মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর কবিসত্তার প্রধান পরিচয়। কাহিনির বর্ণনা অনুযায়ী, বন্ধুদের নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে গেলেন তরুণীর দিকে।

— আপনি কি ফজিলাতুন্নেছা?

তরুণী সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন।

— কোন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন?

— গণিতে।

— আপনার বাড়ি কোথায়?

— করটিয়া, টাঙ্গাইল।

— ঢাকায় কোথায় থাকেন?

— সিদ্দিকবাজারে।

কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন, সামান্য কথোপকথন। অথচ সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এমন একটি মুহূর্তও ছিল ব্যতিক্রমী।

কাহিনিটির পরবর্তী অংশ আরও নাটকীয়। বলা হয়, তিন দিন পর, ১৯২৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বিজ্ঞান ভবনের নোটিশ বোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়। তাতে কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কথা জানানো হয়েছিল বলে প্রচলিত বর্ণনায় দাবি করা হয়।

সত্যিই কি এমন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল? এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক নথি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বিজ্ঞপ্তি পাওয়া না গেলে ঘটনাটিকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রক্ষণশীল পরিবেশ এবং নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথোপকথনে বিধিনিষেধের বিষয়টি ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।

## ফজিলাতুন্নেছা: যাঁর জীবনও ছিল এক বিদ্রোহের নাম

এই কাহিনির তরুণী ফজিলাতুন্নেছা নিজেও ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও সাহসী নারী। টাঙ্গাইলের করটিয়ার প্রত্যন্ত সামাজিক পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি উচ্চশিক্ষায় যে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তা সে সময়ের মুসলিম নারীদের জন্য ছিল বিরল দৃষ্টান্ত।

ফজিলাতুন্নেছা গণিতশাস্ত্রে অসামান্য কৃতিত্ব দেখান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও যান। শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং নারীশিক্ষার প্রসারে অবদান রাখেন।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজের প্রচলিত বাধা ভাঙতে সব সময় উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো অধ্যবসায়, মেধা আর নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।

ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় এবং তাঁকে ঘিরে কবির অনুভূতি নিয়েও সাহিত্যিক মহলে আলোচনা রয়েছে। নজরুলের ‘বর্ষা-বিদায়’ কবিতাটি ফজিলাতুন্নেছার বিলেতযাত্রা উপলক্ষে রচিত বলে প্রচলিত। তবে তাঁদের পরিচয়, সম্পর্ক ও নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর বিবরণ দিতে হলে প্রামাণ্য জীবনী ও সমসাময়িক সাহিত্যপত্রের তথ্যের ওপর নির্ভর করাই শ্রেয়।

## যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নজরুলের নাম জড়িয়ে আছে চিরকাল

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাঙ্গণেই আজও তাঁর সমাধি রয়েছে।

এখানেই ইতিহাসের এক গভীর তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। যে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একসময় তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার কাহিনি প্রচলিত হয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই মাটিতে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত।

এটি নিছক কাকতালীয় দৃশ্য নয়; বরং নজরুলের জীবন ও দর্শনের কথা ভাবার একটি উপলক্ষ। তিনি মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য, মর্যাদা এবং শৃঙ্খল ভাঙার কথা বলেছেন। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল সামাজিক সংকীর্ণতা, বৈষম্য ও মানুষের ওপর আরোপিত অন্যায্য বাধার বিরুদ্ধেও।

নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং নারীর আত্মমর্যাদার দাবি বারবার উচ্চারিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন সেই বিধিনিষেধের স্মৃতি এবং ফজিলাতুন্নেছার মতো এক মেধাবী নারীর জীবন আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি কেবল জ্ঞান অর্জনের জায়গা, নাকি মানুষের চিন্তা, স্বাধীনতা ও সমতার চর্চারও জায়গা?

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মহত্ত্ব তার ভবনের বয়সে নয়, তার শিক্ষার্থীদের চিন্তার স্বাধীনতায়; তার নিয়মের কঠোরতায় নয়, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি তার দায়বদ্ধতায়।

আর নজরুল? তিনি আজও আমাদের শেখান, অন্যায়কে প্রশ্ন করতে হয়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় এবং মানুষের মর্যাদাকে সব নিয়মের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হয়।