ঢাকা, সোমবার ১০, মে ২০২১ ২:২৬:৩৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারছেন না দেশে করোনায় ২৪ ঘণ্টায় প্রাণহানি ৫৬ মার্কেটে মানুষের ঢল, নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই একটা ঈদ বাড়িতে না করলে কী হয়: প্রধানমন্ত্রী ফেরিঘাটে বিজিবি মোতায়েনের পরও ঘরমুখো মানুষের ঢল কাবুলে বিস্ফোরণে নিহত ৫৫ জনের অধিকাংশই ছাত্রী আজ মা দিবস, মাগো…ওগো দরদিনী মা

মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে ‘পরিকল্পনা আপা’

ফিচার ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৫৬ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

জিন্নাত ফেরদৌসী, পেশায় একজন পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ পরিদর্শিকা। তার কর্মস্থল টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সন্ধানপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। অভাবের সংসারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। টানাপোড়েনে জর্জরিত পরিবারে ভালো জামাকাপড় তো দূরের কথা, খাবারই ঠিকমতো জোটেনি। এর মাঝে নিজের চোখের সামনে তার সবশেষ নবজাতক ছোট ভাইটিকে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে দেখেন। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি তার কিশোরী মনে বেশ দাগ কাটে।
এর মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মা শাহনাজ বেগমও। মাকেও চিকিৎসা করানোর মতো টাকাপয়সা ছিল না তার কৃষক বাবা একেএম সাহাবুদ্দিনের। তারা দুই ভাই ও দুই বোন। ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার সিংগুড়া গ্রামে। ছোট ভাইয়ের অকালমৃত্যুর ঘটনার পর থেকে তার আকাংক্ষা ও প্রত্যয়ঃ আর কোনো মাকে অকালে সন্তান হারাতে দেবেন না, গর্ভবতী মাকেও যেন কষ্ট পেতে না হয়। সেই লক্ষ্যেই ক্যারিয়ার গড়তে উদ্যোগী হন জিন্নাত ফেরদৌসী।
তিনি স্বপ্ন দেখেন, বড় হয়ে চিকিৎসক বা সেবিকা হবেন। মা ও শিশুর কল্যাণে কাজ করবেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তার এ স্বপ্ন পূরণ করার যে চাহিদা, তার জোগান দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
এসএসসি পাসের পর কোনো কূল-কিনারা দেখতে পাচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে হতোদ্যম হয়ে ভেঙে পড়েন। জিন্নাতের ভাষায়, ‘আমাদের এলাকার পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আপার সাথে আমার পরিচয় ছিল। তিনি প্রায়ই আমাদের ও আশপাশের বাড়িতে আসতেন। স্বাস্থ্য বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। কথা প্রসঙ্গে একদিন আমার স্বপ্নের কথা ওই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আপাকে বলি। তিনি আমাকে স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করাতে উদ্বুদ্ধ করেন। অর্থাৎ আমার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ কাজে লাগানোর কথা বলেন।’
তখনই জিন্নাত ফেরদৌসী বুঝতে পারেন- ডাক্তার বা নার্স না হয়েও মা-শিশুদের সেবা করা যায়। তার পরামর্শে ২০১৫-১৬ সালে পরিবার কল্যাণ অধিদফতরের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন জিন্নাত। এরপর পরীক্ষায় মাধ্যমে নিয়োগ পান। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন তিনি।
জিন্নাত জানান, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের ১৮ মাস মেয়াদী মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) তত্ত্বাবধানে, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে।
জিন্নাত ফেরদৌসী টাঙ্গাইল পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ১৮ মাস মেয়াদী মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল পরিচালিত এবং নিপোর্টের তত্ত্বাবধানে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালে প্রশিক্ষিত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে যোগ দেন সন্ধানপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে।
হাস্যজ্জল মুখে জিন্নাত বলেন, আমাদের দেশে আগে প্রায়ই সন্তান জন্মদানের সময় মায়ের মৃত্যু হতো। শিশু মারা যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল, এ বিষয়ে কাজ করবো, মনপ্রাণ ঢেলে করছিও তাই।
সরকারের উদ্যোগে দেশে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে সমন্বিত শিশু চিকিৎসা কার্যক্রমকে মূল কৌশল হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগে এমএনসি অ্যান্ড এএইচ অপারেশনাল প্লানের আওতায় নবজাতক ও শূন্য থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মৃত্যু হ্রাসকরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ চলছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের আওতায় গত ২০১৮ সালে দেশজুড়ে সমন্বিত শিশু চিকিৎসা কর্নারগুলোতে প্রায় ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৬১০ জন শিশুকে (অনূর্ধ্ব ৫ বছর) এ সেবা দেওয়া হয়েছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা দেওয়া এবং চিকিৎসার জন্য খরচ কমানো। মাঠ পর্যায়ে এসব সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছেন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকরা। প্রশিক্ষণের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে যোগ দিয়ে নিজ এলাকার মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন তারা।
এ বিষয়ে জিন্নাত ফেরদৌসী বলেন, আমার ভাবতেই ভালো লাগে মা ও শিশুর কল্যাণে আমি কাজ করছি। এখন আমার সেই পরিদর্শিকা আপার কথা খুবই মনে পড়ে। তিনিই আমাকে এ পথে আসার জন্যে উৎসাহ দিয়েছিলেন। নয়তো আমার পড়াশোনা তো দূরের কথা, দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন অধরা থেকে যেতো। এখন সেবার পাশাপাশি পরিবারের অভাবও ঘোচাতে পারছি। আমার মা-বাবার মুখেও হাসি ফুটেছে। এই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা বলেন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই যে একটি শিশুকে জীবনে সাফল্য এনে দিতে পারে। আমি তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
‘এখন স্বপ্ন দেখি আমার মতো মেয়ে শিশুরা যদি বড় হয়ে নিপোর্ট থেকে এই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করে তাহলে মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নয়ন হবে,’ যোগ করেন তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইউনিটের প্রধান পরিচালক ডা. মো. শরীফ বলেন, দেশের ৬০৩টি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা প্রদানকারীরা মা ও শিশুর উন্নয়নে কাজ করছেন। তারা নিয়মিত কাউন্সেলিং করছেন।
‘পাশাপাশি বাল্যবিবাহ যাতে না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ বাল্যবিবাহ ও মাতৃ মৃত্যু একসঙ্গে জড়িত। অল্প বয়সে গর্ভবতী হলেই মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। আমাদের কর্মীরা এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।’