ঢাকা, শনিবার ১০, অক্টোবর ২০২৬ ৫:৩০:০৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যা: চট্টগ্রামে অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার শান্তিতে নোবেল পেলেন অধিকারকর্মী নাভানেথেম পিল্লাই বছরে ৫০০ কোটির বেশি ঘাটতি, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি ডাক বিভাগ টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা, একাদশে আছেন যারা শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল ফ্রান্স, থামছে না বিক্ষোভ সারাদেশে বৃষ্টির আভাস, রাতে তাপমাত্রা কমতে পারে

শান্তিতে নোবেলজয়ী ২১ নারী: সংগ্রামের ইতিহাস

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:২৭ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

এবছর শান্তিতে নোবেল পেলেন অধিকারকর্মী নাভানেথেম পিল্লাই।

এবছর শান্তিতে নোবেল পেলেন অধিকারকর্মী নাভানেথেম পিল্লাই।

শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়। শান্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী-পুরুষের সমতা, শিক্ষা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রাম। শান্তিতে নোবেলজয়ী নারীদের জীবন ও কাজের দিকে তাকালে এই বিস্তৃত অর্থটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হওয়ার পর প্রথম নারী হিসেবে ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পান অস্ট্রিয়ার বের্তা ফন জুটনার। এরপর নানা সময়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, নিরস্ত্রীকরণ, মানবাধিকার, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং সংঘাতের শিকার মানুষের পক্ষে কাজ করে স্বীকৃতি পেয়েছেন আরও অনেকে। ২০২৬ সালে নাভি পিল্লাইয়ের পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে নারী বিজয়ীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১-এ। 

১. বের্তা ফন জুটনার — অস্ট্রিয়া, ১৯০৫

প্রথম নারী শান্তিতে নোবেলজয়ী

বের্তা ফন জুটনার ছিলেন লেখক, শান্তিবাদী ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস লে ডাউন ইয়োর আর্মস যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার ধ্বংসাত্মক প্রভাব তুলে ধরে। তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলন, নিরস্ত্রীকরণ এবং সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে কাজ করেন। ১৯০৫ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।

২. জেন অ্যাডামস — যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৩১

জেন অ্যাডামস ছিলেন সমাজসংস্কারক, সমাজকর্মী ও শান্তি আন্দোলনের নেত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে তিনি হাল হাউস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দরিদ্র অভিবাসী পরিবার, নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে প্রচার চালান। সামাজিক ন্যায়বিচার ও শান্তিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

৩. এমিলি গ্রিন বলচ — যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৪৬

অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও শান্তিকর্মী এমিলি গ্রিন বলচ জীবনের দীর্ঘ সময় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য কাজ করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি শান্তির পক্ষে অবস্থান নেন। আন্তর্জাতিক নারী শান্তি ও স্বাধীনতা লীগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনা, নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। শান্তির জন্য আজীবন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৬ সালে তিনি নোবেল পান।

৪. বেটি উইলিয়ামস — উত্তর আয়ারল্যান্ড, ১৯৭৬

উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘস্থায়ী সহিংস সংঘাতের বিরুদ্ধে শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বেটি উইলিয়ামস পরিচিত। ১৯৭৬ সালে সংঘাতের মধ্যে তিনটি শিশুর মৃত্যুর পর তিনি সহিংসতার অবসানের দাবিতে জনমত সংগঠিত করতে উদ্যোগী হন। মায়েরাও অন্য নাগরিকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেন। মানুষের জীবন রক্ষা এবং প্রতিশোধের চক্র ভাঙার লক্ষ্যে তাঁর এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।

৫. মায়েরেড কোরিগান — উত্তর আয়ারল্যান্ড, ১৯৭৬

বেটি উইলিয়ামসের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পাওয়া মায়েরেড কোরিগান উত্তর আয়ারল্যান্ডে সহিংসতার অবসানের জন্য কাজ করেন। শিশুদের মৃত্যু ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তাঁকে শান্তি আন্দোলনে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, আন্তসম্প্রদায়িক সংলাপ এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে সহাবস্থানের পক্ষে প্রচার চালান। ১৯৭৬ সালে দুজনের যৌথ স্বীকৃতি দেখিয়ে দেয়, সাধারণ নাগরিকদের সংগঠিত উদ্যোগও সংঘাতের বিরুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

৬. মাদার তেরেসা — আলবেনীয় বংশোদ্ভূত, ভারত, ১৯৭৯

মাদার তেরেসার জন্ম বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ার স্কোপিয়েতে, আলবেনীয় পরিবারে। তিনি ভারতে এসে কলকাতায় দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মিশনারিজ অব চ্যারিটি। সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান।

৭. আলভা মিরডাল — সুইডেন, ১৯৮২

আলভা মিরডাল ছিলেন সুইডিশ কূটনীতিক, সমাজচিন্তক ও নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষে তিনি কাজ করেন। জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অস্ত্রের বিস্তার রোধের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন। ১৯৮২ সালে আলফনসো গার্সিয়া রব্লেসের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান।

৮. অং সান সু চি — মিয়ানমার, ১৯৯১

মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে অং সান সু চি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে তাঁর ভূমিকার জন্য ১৯৯১ সালে তাঁকে নোবেল দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় তাঁর ভূমিকা ও অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তাঁর জীবন দেখায়, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাজ ও অবস্থানও পরবর্তী সময়ে সমালোচনামূলক মূল্যায়নের বিষয় হতে পারে।

৯. রিগোবের্তা মেনচু তুম — গুয়াতেমালা, ১৯৯২

মায়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় রিগোবের্তা মেনচু তুমের ভূমিকা ঐতিহাসিক। গুয়াতেমালার গৃহযুদ্ধের সময় আদিবাসী মানুষের ওপর নিপীড়ন, সহিংসতা ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক মনোযোগ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান।

১০. জোডি উইলিয়ামস — যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৯৭

স্থলমাইন নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক আন্দোলনে জোডি উইলিয়ামস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি আন্তর্জাতিক স্থলমাইন নিষিদ্ধকরণ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন দেশের সরকার, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে একত্রিত করেন। স্থলমাইন যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও শিশু, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় এবং মানুষের চলাচল ও জীবিকা ব্যাহত করে। এই অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে নোবেল দেওয়া হয়।

১১. শিরিন এবাদি — ইরান, ২০০৩

শিরিন এবাদি একজন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী। ইরানে নারী ও শিশুর অধিকার, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক বন্দি, নিপীড়নের শিকার মানুষ এবং অধিকারবঞ্চিতদের পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন। নারী ও শিশুর অধিকারকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য ২০০৩ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান। তিনি নোবেলজয়ী প্রথম ইরানি নারী।

১২. ওয়াঙ্গারি মাথাই — কেনিয়া, ২০০৪

ওয়াঙ্গারি মাথাই ছিলেন পরিবেশকর্মী ও গ্রিন বেল্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি গাছ লাগানো, বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে নারী ও গ্রামীণ মানুষের ক্ষমতায়নকে যুক্ত করেন। তাঁর আন্দোলনের মাধ্যমে বহু নারী বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তিনি দেখিয়েছেন, বন ধ্বংস, দারিদ্র্য, সম্পদের বৈষম্য ও সামাজিক সংঘাত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবেশ, গণতন্ত্র ও শান্তির ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি নোবেল পান।

১৩. এলেন জনসন সারলিফ — লাইবেরিয়া, ২০১১

এলেন জনসন সারলিফ আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালে তিনি লেইমাহ গবোই ও তাওয়াক্কুল কারমানের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান। তাঁদের সম্মিলিত স্বীকৃতির মূল বিষয় ছিল নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার।

১৪. লেইমাহ গবোই — লাইবেরিয়া, ২০১১

লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় লেইমাহ গবোই খ্রিষ্টান ও মুসলিম নারীদের একত্র করে শান্তি আন্দোলন সংগঠিত করেন। নারীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, সমাবেশ এবং সংঘাতের অবসানের দাবিকে তিনি জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে নারীরা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হন। ২০১১ সালে তাঁর নোবেলপ্রাপ্তি সংঘাত নিরসনে তৃণমূলের নারী আন্দোলনের গুরুত্বকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরে।

১৫. তাওয়াক্কুল কারমান — ইয়েমেন, ২০১১

তাওয়াক্কুল কারমান ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনে রাজনৈতিক সংস্কার ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। ২০১১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পাওয়া প্রথম ইয়েমেনি নারী এবং আরব বিশ্বের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

১৬. মালালা ইউসুফজাই — পাকিস্তান, ২০১৪

পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মালালা ইউসুফজাই তালেবানের হামলার শিকার হন। প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পরও তিনি মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দাবিতে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ চালিয়ে যান। মালালা ফান্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগে তিনি যুক্ত রয়েছেন। ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি নোবেল পান এবং ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হন।

১৭. নাদিয়া মুরাদ — ইরাক, ২০১৮

ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারী নাদিয়া মুরাদ ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের হাতে বন্দি হন এবং যৌন সহিংসতার শিকার হন। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতার ব্যবহার বন্ধ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং বেঁচে ফেরা নারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করেন। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৮ সালে ডেনিস মুকওয়েগের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল পান।

১৮. মারিয়া রেসা — ফিলিপাইন, ২০২১

সাংবাদিক মারিয়া রেসা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তিনি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম র‌্যাপলার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাজের বড় অংশজুড়ে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অনলাইন অপতথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়রানির প্রভাব অনুসন্ধান। ২০২১ সালে রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল পান। স্বাধীন সাংবাদিকতা যে গণতন্ত্র ও শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর স্বীকৃতি সেই বার্তা বহন করে।

১৯. নার্গিস মোহাম্মদি — ইরান, ২০২৩

নার্গিস মোহাম্মদি ইরানে নারী নিপীড়ন, মৃত্যুদণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছেন। বন্দি অবস্থাতেও তিনি নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে ছড়িয়ে পড়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁর সংগ্রাম নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। ২০২৩ সালে তাঁকে নোবেল দেওয়া হয় নারীর ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সবার জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ।

২০. মারিয়া কোরিনা মাচাদো — ভেনেজুয়েলা, ২০২৫

মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী বিরোধী আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। অবাধ নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার, আইনের শাসন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে তাঁর ভূমিকার জন্য ২০২৫ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান। ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তিনি বিরোধী পক্ষকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর পুরস্কার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সামনে এনেছে। 

২১. নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই — দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০২৬

৯ অক্টোবর ২০২৬-এ শান্তিতে নোবেলজয়ী হিসেবে ঘোষিত নাভি পিল্লাই একজন দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক বিচারক। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এই নারী বর্ণবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য তিনি ২০২৬ সালে এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। 

শান্তিতে নোবেলজয়ী নারীদের অবদান: কয়েকটি বড় শিক্ষা

এই ২১ নারীর জীবন ও কর্মকে পাশাপাশি রাখলে শান্তি প্রতিষ্ঠার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. যুদ্ধবিরোধিতা ও নিরস্ত্রীকরণ: বের্তা ফন জুটনার, এমিলি গ্রিন বলচ, আলভা মিরডাল ও জোডি উইলিয়ামস দেখিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনমত, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

২. নারী ও শিশুর অধিকার: শিরিন এবাদি, মালালা ইউসুফজাই, নার্গিস মোহাম্মদি ও লেইমাহ গবোইয়ের কাজ প্রমাণ করে, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

৩. সংঘাতের মধ্যে মানবিক মর্যাদা: মাদার তেরেসা ও নাদিয়া মুরাদ ভিন্ন বাস্তবতায় কাজ করলেও তাঁদের অবদান মানুষের দুর্দশা লাঘব, সহিংসতার শিকার মানুষের মর্যাদা এবং মানবিক সহায়তার গুরুত্ব সামনে আনে।

৪. পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচার: ওয়াঙ্গারি মাথাই দেখিয়েছেন, পরিবেশ ধ্বংস, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যও সংঘাতের কারণ হতে পারে। প্রকৃতি ও মানুষের জীবিকার সুরক্ষা তাই শান্তির বৃহত্তর আলোচনার অংশ।

৫. গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যম ও আইনের শাসন: জেন অ্যাডামস, মারিয়া রেসা, মারিয়া কোরিনা মাচাদো এবং নাভি পিল্লাইয়ের কাজ ভিন্ন ভিন্নভাবে নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরে।

সংখ্যার আড়ালে যে বাস্তবতা

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে নারীর স্বীকৃতি এসেছে ধীরগতিতে। প্রথম নারী পুরস্কার পান ১৯০৫ সালে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মাত্র তিন নারী এই সম্মান পেয়েছিলেন। এরপর নারী অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টা, পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও নারী স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে ১৩ জন নারী শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন বলে নোবেল পিস প্রাইজের নারী বিজয়ীদের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। 

তবে নোবেলজয়ী হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তির জীবনের সব সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যাওয়া নয়। অং সান সু চির মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক সময়ে গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রামের স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিকেও পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার বিষয়ে তাঁর অবস্থানের জন্য কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়নে তাই অর্জনের পাশাপাশি বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করা জরুরি।

শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ২১ নারীর সবচেয়ে বড় সম্মিলিত শিক্ষা হলো—শান্তি কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের চুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কখনো তা গড়ে ওঠে যুদ্ধবিরোধী লেখকের কলমে, কখনো কারাগারে বন্দি মানবাধিকারকর্মীর প্রতিবাদে, কখনো মেয়েদের বিদ্যালয়ে ফেরানোর সংগ্রামে, কখনো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন কর্মীর সাহসে। তাঁদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায় ও সহিংসতার সামনে নীরব না থাকা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষায় কাজ করাও শান্তি প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য অংশ।