ঢাকা, শনিবার ১০, অক্টোবর ২০২৬ ৫:৩১:২৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যা: চট্টগ্রামে অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার শান্তিতে নোবেল পেলেন অধিকারকর্মী নাভানেথেম পিল্লাই বছরে ৫০০ কোটির বেশি ঘাটতি, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি ডাক বিভাগ টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা, একাদশে আছেন যারা শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল ফ্রান্স, থামছে না বিক্ষোভ সারাদেশে বৃষ্টির আভাস, রাতে তাপমাত্রা কমতে পারে

সাহিত্যে নোবেলজয়ী ১৯ নারী: বিশ্বসাহিত্যে তাদের অবদান

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৫৬ পিএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; এটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর সৃষ্টিকর্মের গুরুত্বেরও স্বীকৃতি। ১৯০১ সালে এই পুরস্কার প্রবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে পুরুষ লেখকদেরই প্রাধান্য ছিল। তবে সেই ইতিহাসে নারীরাও তাঁদের স্বতন্ত্র কণ্ঠ, গভীর জীবনবোধ, ভাষার অভিনব ব্যবহার এবং সমাজ-ইতিহাসকে দেখার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মোট ১৯ জন নারী। প্রথম নারী হিসেবে ১৯০৯ সালে পুরস্কার পান সুইডিশ সাহিত্যিক সেলমা লাগেরলফ। আর ২০২৬ সালে এই স্বীকৃতি পেয়েছেন কানাডীয় কবি ও লেখক অ্যান কারসন। নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক তালিকায় ২০২৫ সাল পর্যন্ত নারী বিজয়ীর সংখ্যা ছিল ১৮; ২০২৬ সালের নতুন বিজয়ী যুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি এখন ১৯। 

তাঁদের কেউ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমাজের বৈষম্য, কেউ কবিতায় খুঁজেছেন অস্তিত্বের অর্থ, কেউ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস লিখেছেন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে। আবার কেউ আত্মজৈবনিক লেখার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিকে রূপ দিয়েছেন একটি জাতি বা সময়ের সামষ্টিক অভিজ্ঞতায়।

নিচে কালানুক্রমে তাঁদের পরিচয়, দেশ এবং বিশ্বসাহিত্যে অবদানের সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যসমৃদ্ধ পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

১. সেলমা লাগেরলফ — সুইডেন, ১৯০৯

 সাহিত্যে প্রথম নারী নোবেলজয়ী

সেলমা লাগেরলফ ছিলেন সুইডিশ কথাসাহিত্যের এক পথিকৃৎ। কল্পনা, লোককথা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক অনুভূতির মিশেলে তিনি নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র সাহিত্যজগৎ। ১৯০৯ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পান। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস গোস্তা বেরলিংস সাগা এবং শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা নিলসের বিস্ময়কর ভ্রমণ বিশ্বসাহিত্যে বিশেষভাবে পরিচিত। 

২. গ্রাজিয়া দেলেদ্দা — ইতালি, ১৯২৬

ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপের জীবন, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক টানাপোড়েন, নৈতিক সংকট ও মানুষের নিয়তি ছিল তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপাদান। গ্রামীণ সমাজের মানুষের সুখ-দুঃখকে তিনি গভীর সহমর্মিতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস এলিয়াস পোরতোলু, অ্যাশেজ এবং ক্যানেস অন দ্য উইন্ড। ১৯২৬ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান; পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯২৭ সালে প্রদান করা হয়। 

৩. সিগ্রিড উনসেট — নরওয়ে, ১৯২৮

সিগ্রিড উনসেটের সাহিত্যিক খ্যাতির বড় ভিত্তি মধ্যযুগীয় নরওয়ের পটভূমিতে লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস। তাঁর তিন খণ্ডের উপন্যাস ক্রিস্টিন লাভরান্সদাত্তার-এ প্রেম, বিবাহ, ধর্মবিশ্বাস, দায়িত্ব ও নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জটিলতা ফুটে উঠেছে। ইতিহাসের পটভূমি ব্যবহার করেও তিনি মানুষের চিরন্তন আবেগ ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছেন।

৪. পার্ল এস. বাক — যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৩৮

চীনে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা পার্ল বাকের সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। চীনের কৃষকসমাজ, পরিবার, জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, দারিদ্র্য ও সামাজিক পরিবর্তন তাঁর উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গুড আর্থ চীনা কৃষকজীবনকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পরিচিত করে। তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 

৫. গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল — চিলি, ১৯৪৫

গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল ছিলেন কবি, শিক্ষক ও কূটনীতিক। মাতৃত্ব, শিশুর প্রতি ভালোবাসা, শোক, নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতি এবং লাতিন আমেরিকার মানুষের জীবন তাঁর কবিতায় গভীর আবেগে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কবিতার ভাষা একই সঙ্গে কোমল ও শক্তিশালী। তিনি ১৯৪৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া প্রথম লাতিন আমেরিকান লেখক এবং স্প্যানিশ ভাষার কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

৬. নেলি স্যাক্স — জার্মানিতে জন্ম, সুইডেনে আশ্রয়, ১৯৬৬

ইহুদি বংশোদ্ভূত এই কবি নাৎসি নিপীড়ন থেকে প্রাণে বাঁচতে সুইডেনে আশ্রয় নেন। হলোকাস্ট, নির্বাসন, মৃত্যু, স্মৃতি ও মানবিক যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতার কেন্দ্রে। ব্যক্তিগত ও জাতিগত বিপর্যয়কে তিনি এমন ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যা একই সঙ্গে শোকগাথা ও মানবতার পক্ষে সাক্ষ্য। ১৯৬৬ সালে তিনি যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

৭. নাদিন গর্ডিমার — দক্ষিণ আফ্রিকা, ১৯৯১

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাহিত্যকে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম করে তুলেছিলেন নাদিন গর্ডিমার। তাঁর উপন্যাসে বর্ণবৈষম্য, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অন্যায়ের মধ্যে মানুষের নৈতিক অবস্থান উঠে এসেছে। বার্গারের ডটার, জুলাইস পিপল ও দ্য কনজারভেশনিস্ট তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে।

৮. টনি মরিসন — যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৯৩

টনি মরিসন আফ্রিকান-আমেরিকান মানুষের ইতিহাস, দাসত্বের উত্তরাধিকার, বর্ণবাদ, মাতৃত্ব, স্মৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্নকে আধুনিক উপন্যাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস বিলাভড দাসত্বের ভয়াবহতা ও তার দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতকে গভীর শিল্পরূপ দিয়েছে। দ্য ব্লুয়েস্ট আই এবং সং অব সলোমনও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। তাঁর সাহিত্য মার্কিন ইতিহাসের এমন অভিজ্ঞতাকে সামনে এনেছে, যা দীর্ঘদিন মূলধারার আলোচনায় উপেক্ষিত ছিল।

৯. ভিস্লাভা শিম্বর্স্কা — পোল্যান্ড, ১৯৯৬

ভিস্লাভা শিম্বর্স্কার কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের সামান্য ঘটনা থেকে উঠে আসে অস্তিত্ব, ইতিহাস, মৃত্যু, স্মৃতি ও মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ ভাষা, সূক্ষ্ম কৌতুক, বিদ্রূপ ও দার্শনিক গভীরতা। তিনি ইতিহাসকে কেবল বড় ঘটনা দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও দেখেছেন। ১৯৯৬ সালে কবিতার এই স্বতন্ত্র শিল্পভঙ্গির জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। 

১০. এলফ্রিডে ইয়েলিনেক — অস্ট্রিয়া, ২০০৪

অস্ট্রিয়ার এই লেখক উপন্যাস ও নাটকে সমাজের ক্ষমতাকাঠামো, পুরুষতন্ত্র, ভোগবাদ, গণমাধ্যমের ভাষা এবং সামাজিক ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণভাবে আক্রমণ করেছেন। তাঁর লেখায় প্রচলিত সংলাপ, স্লোগান ও সামাজিক ভাষার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ক্ষমতার অন্তর্নিহিত সহিংসতা প্রকাশ পায়। তাঁর আলোচিত উপন্যাস দ্য পিয়ানো টিচার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, যৌনতা ও নিয়ন্ত্রণের জটিল সম্পর্ক তুলে ধরে।

১১. ডরিস লেসিং — ব্রিটেন, ২০০৭

ইরানে জন্ম নেওয়া এবং তৎকালীন দক্ষিণ রোডেশিয়ায় বেড়ে ওঠা ডরিস লেসিংয়ের সাহিত্যজীবন জুড়ে ছিল ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, বর্ণবৈষম্য, নারীর স্বাধীনতা, রাজনীতি ও ব্যক্তিমানসের অনুসন্ধান। তাঁর দ্য গোল্ডেন নোটবুক নারীর পরিচয়, সৃজনশীলতা ও মানসিক দ্বন্দ্বের জটিল উপস্থাপনার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর রচনায় ব্যক্তির অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সমাজ ও সভ্যতার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

১২. হার্টা মুলার — জার্মানিতে লেখালেখি, জন্ম রোমানিয়ায়, ২০০৯

রোমানিয়ার জার্মানভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে জন্ম নেওয়া হার্টা মুলার স্বৈরশাসন, রাষ্ট্রীয় নজরদারি, ভয়, নিপীড়ন ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তাঁর গদ্য ও কবিতায় ভাষা কখনো ভাঙা, কখনো তীক্ষ্ণ—যেন আতঙ্কের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। দ্য ল্যান্ড অব গ্রিন প্লামস তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তাঁর সাহিত্য ক্ষমতার দমনমূলক চরিত্র ও মানুষের ভঙ্গুর স্বাধীনতাকে সামনে আনে।

১৩. অ্যালিস মুনরো — কানাডা, ২০১৩

অ্যালিস মুনরোকে আধুনিক ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কানাডার ছোট শহর ও গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবন, নারীর সম্পর্ক, প্রেম, বার্ধক্য, গোপন আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁর গল্পের মূল বিষয়। অল্প পরিসরে চরিত্রের অতীত ও বর্তমানকে জুড়ে দিয়ে মানুষের জীবনের জটিল সত্য উন্মোচন ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা। ২০১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পান।

১৪. স্ভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ — বেলারুশ, ২০১৫

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের অভিনব মিশ্রণে স্ভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ গড়ে তুলেছেন এক স্বতন্ত্র লেখনরীতি। তিনি যুদ্ধফেরত সৈনিক, নার্স, সাধারণ নাগরিক, পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিকার এবং সোভিয়েত সমাজের মানুষের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করে তাঁদের কণ্ঠকে বইয়ে রূপ দিয়েছেন। ওয়ারস আনওম্যানলি ফেস, জিঙ্কি বয়েজ ও ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিল তাঁর আলোচিত গ্রন্থ। তাঁর রচনায় ইতিহাসের সরকারি বিবরণের বদলে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণা প্রধান হয়ে ওঠে।

১৫. ওলগা তোকারচুক — পোল্যান্ড, ২০১৮

ওলগা তোকারচুকের সাহিত্য কল্পনা, ইতিহাস, দর্শন, ভ্রমণ ও মনস্তত্ত্বের সীমানা অতিক্রম করে। বিচ্ছিন্ন কাহিনি, বহুমাত্রিক চরিত্র ও বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে তিনি মানুষের পরিচয় ও পৃথিবীতে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফ্লাইটস এবং ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০১৮ সালের পুরস্কারটি ২০১৯ সালে ঘোষণা করা হয়; তিনি ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী।

১৬. লুইস গ্লুক — যুক্তরাষ্ট্র, ২০২০

লুইস গ্লুকের কবিতা সংযত, তীক্ষ্ণ ও আবেগের গভীরতায় পূর্ণ। শৈশব, পারিবারিক সম্পর্ক, ক্ষতি, একাকিত্ব, প্রেম, মৃত্যু ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। গ্রিক পুরাণের চরিত্র ও কাহিনিকেও তিনি আধুনিক মানুষের অনুভূতি বোঝার মাধ্যম করেছেন। দ্য ওয়াইল্ড আইরিস এবং আরারাত তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার জন্য তিনি ২০২০ সালে নোবেল পান।

১৭. অ্যানি এরনো — ফ্রান্স, ২০২২

অ্যানি এরনোর লেখার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিগত স্মৃতি, শ্রেণিগত বৈষম্য, নারীর শরীর, যৌনতা, পরিবার, সামাজিক লজ্জা ও সময়ের পরিবর্তন। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতাকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত কাহিনি হিসেবে লেখেননি; বরং দেখিয়েছেন, একজন মানুষের স্মৃতির ভেতরে কীভাবে একটি সমাজের শ্রেণি ও সংস্কৃতির ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। দ্য ইয়ার্স তাঁর বহুল আলোচিত বই। ব্যক্তিগত জীবনকে সামাজিক ইতিহাসের আয়নায় দেখার এই পদ্ধতি সমকালীন সাহিত্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।

১৮. হান কাং — দক্ষিণ কোরিয়া, ২০২৪

হান কাংয়ের গদ্যে শরীর, সহিংসতা, স্মৃতি, শোক ও মানুষের ভঙ্গুর অস্তিত্ব গভীর কাব্যিক ভাষায় প্রকাশিত হয়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ভেজিটেরিয়ান-এ এক নারীর মাংস খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পরিবার, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত উঠে এসেছে। হিউম্যান অ্যাক্টস দক্ষিণ কোরিয়ার গুয়াংজু গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতা ও তার ক্ষতকে সামনে আনে। ২০২৪ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রথম দক্ষিণ কোরীয় লেখক হন।

১৯. অ্যান কারসন — কানাডা, ২০২৬

অ্যান কারসন সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ। কবিতা, গদ্য, নাট্যরূপ ও অনুবাদের সীমানা ভেঙে তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণকে আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড, দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড এবং নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়। ভাষা ও সাহিত্যরীতির নিরীক্ষা, ধ্রুপদি ঐতিহ্যের নতুন পাঠ এবং প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামো ভাঙার দক্ষতার জন্য ২০২৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। 

তাঁদের সাহিত্য থেকে আমরা কী পাই?

এই ১৯ জন লেখকের সাহিত্যিক পথ এক নয়। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তবু কয়েকটি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে।

নারীর জীবন ও আত্মপরিচয়: টনি মরিসন, অ্যানি এরনো, ডরিস লেসিং ও এলফ্রিডে ইয়েলিনেক নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক অবস্থান এবং ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছেন।

যুদ্ধ, নিপীড়ন ও ইতিহাস: নেলি স্যাক্স, স্ভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ ও হার্টা মুলার দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও যুদ্ধের ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে।

প্রেম, স্মৃতি ও অস্তিত্ব: ভিস্লাভা শিম্বর্স্কা, লুইস গ্লুক, অ্যালিস মুনরো ও হান কাং মানুষের অন্তর্জগৎ, শোক, সম্পর্ক এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে সাহিত্যের গভীর অনুসন্ধানের বিষয় করেছেন।

ভাষা ও আঙ্গিকের নতুনত্ব: ওলগা তোকারচুক ও অ্যান কারসন প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে গল্প, ইতিহাস, পুরাণ ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে উপস্থাপন করেছেন।

লোকজ জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: সেলমা লাগেরলফ, গ্রাজিয়া দেলেদ্দা, পার্ল বাক ও গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল নিজেদের সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিয়েছেন।

সংখ্যাটি কী বলে?

১৯০৯ সালে সেলমা লাগেরলফের পুরস্কারপ্রাপ্তি ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু প্রথম নারী নোবেল পাওয়ার পরও দ্বিতীয় নারী বিজয়ীর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৭ বছর। এরপরও নারী সাহিত্যিকদের স্বীকৃতি নিয়মিত হয়নি। ১৯৬৬ সালের পর ১৯৯১ সালে নাদিন গর্ডিমারের পুরস্কারপ্রাপ্তি পর্যন্ত দীর্ঘ বিরতি ছিল। অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীতে একাধিক নারী লেখক এ সম্মান পেয়েছেন। এই ইতিহাস দেখায়, নারীর সাহিত্যিক অবদান বহুদিন ধরে স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করেছে। 

তবে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বা না-পাওয়া দিয়ে কোনো সাহিত্যিকের সামগ্রিক গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায় না। বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ নারী লেখক এই পুরস্কার পাননি। পুরস্কারটি বরং আমাদের সামনে তুলে ধরে এমন কিছু সাহিত্যিককে, যাঁদের রচনা ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছেছে।

নারী লেখকদের এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও বিশ্বসাহিত্যের বিষয় হতে পারে। একজন নারীর স্মৃতি, একটি পরিবারের সংকট, একটি গ্রামের জীবন, যুদ্ধের ক্ষত কিংবা সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন মানুষের সিদ্ধান্ত—সাহিত্যের শক্তিতে এসবই হয়ে উঠতে পারে সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতার অংশ।

বাংলা ভাষায় যারা লেখেন, বিশেষ করে নারী ও শিশুসাহিত্যিকেরা, তাঁদের জন্যও এই সাহিত্যিকদের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। কারণ বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিতে কেবল বড় বিষয় নয়, প্রয়োজন গভীর পর্যবেক্ষণ, নিজস্ব ভাষা, সৃজনশীল সাহস এবং মানুষের জীবনের সত্যকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করার ক্ষমতা।