ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৪৬:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

সেলাই মেশিনের শব্দে লেখা জীবন: সেলাইকন্যাদের গল্প

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৫৫ এএম, ১৩ মে ২০২৬ বুধবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ভোর সাড়ে পাঁচটা। ঢাকার উপকণ্ঠের একটি ভাড়া বাসার ছোট্ট ঘরে ঘুম ভাঙে রুবিনার। চুলায় ভাত বসানো, সন্তানের জন্য খাবার গুছিয়ে রাখা, তারপর তাড়াহুড়ো করে কারখানার উদ্দেশে রওনা। সকাল আটটার শিফটে ঢুকতে দেরি হলে হাজিরা কাটা যায়। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে সেলাই মেশিনের সামনে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও কখনও কখনও কাজ থামে না—অর্ডারের চাপ থাকলে ওভারটাইম চলতেই থাকে।

রুবিনার গল্প আলাদা কিছু নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কাজ করা লাখো নারীর জীবন যেন একই সুতোয় গাঁথা। এই নারীদের ঘাম, শ্রম আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই নারী। অর্থাৎ প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লাখ নারী সরাসরি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। একসময় এই হার আরও বেশি ছিল, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বয়ংক্রিয়তা ও দক্ষতার চাহিদা বাড়ায় নারী শ্রমিকের অংশ কিছুটা কমেছে। 

গ্রামের উঠোন থেকে শিল্পাঞ্চলের কারখানায়:
এই নারীদের বড় অংশই এসেছেন গ্রামবাংলা থেকে। দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, সংসারের অভাব কিংবা পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে তারা শহরমুখী হয়েছেন।

গাজীপুরের একটি কারখানায় কাজ করা শ্রমিক শারমিন আক্তার বলেন, “বাবা অসুস্থ হওয়ার পর সংসার চালানোর কেউ ছিল না। দশ বছর আগে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি। এখন আমার বেতনের টাকাতেই দুই ভাইয়ের পড়াশোনা চলে।”

তিনি জানান, তার মাসিক আয় ১৬ হাজার টাকা। ওভারটাইম থাকলে কিছুটা বাড়ে। কিন্তু বাড়িভাড়া, খাবার, গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠানো আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রায় সব টাকা ফুরিয়ে যায়।

নারী শ্রমিকদের বেশিরভাগই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী বা অন্তত প্রধান সহায়ক। অনেকের স্বামী বেকার, কেউ রিকশাচালক, কেউ দিনমজুর। ফলে সংসারের অর্থনৈতিক ভার প্রায় পুরোটা এসে পড়ে তাদের কাঁধে।

শ্রমের বিনিময়ে কতটা স্বস্তি:
বর্তমানে পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকই তা যথেষ্ট মনে করেন না। অনেকের অভিযোগ, ওভারটাইম ছাড়া সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

নারায়ণগঞ্জের আরেক শ্রমিক মিতু বেগম বলেন, “মাসে ১৩-১৪ হাজার টাকা পাই। কিন্তু বাসাভাড়া, বাজার আর বাচ্চার স্কুলের খরচ মিলিয়ে কিছুই থাকে না। অসুস্থ হলে ধার করতে হয়।”

শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বড় উদ্বেগের জায়গা। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করায় কোমর ও ঘাড়ের ব্যথা, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, অপুষ্টি, অনিদ্রা—এসব যেন নিত্যসঙ্গী। 

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নারী পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে কাজের চাপ, শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদের বিষয়টি উঠে এসেছে। 

মানসিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতা:
কারখানার কাজ শুধু শারীরিক পরিশ্রমের নয়, মানসিক চাপেরও। উৎপাদন টার্গেট পূরণ, সুপারভাইজারের চাপ, চাকরি হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই এক ধরনের অদৃশ্য উদ্বেগে কাটে তাদের সময়।

অনেক নারী শ্রমিকের অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে এখনও হয়রানি, অসম্মানজনক আচরণ কিংবা পদোন্নতিতে বৈষম্যের ঘটনা ঘটে। আবার বাসায় ফিরেও তাদের অপেক্ষায় থাকে রান্না, সন্তান সামলানো, সংসারের কাজ।

সামাজিকভাবে তারা এখন আগের চেয়ে বেশি স্বাবলম্বী। পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা বেড়েছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল্য দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ পরিশ্রমে।

মালিকপক্ষ কী বলছে:
একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নারীরা শুধু শ্রমিক নন, এই শিল্পের চালিকাশক্তি। এখন আমরা স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ডে-কেয়ার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি।”

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে অনেক কারখানাই এখন শ্রমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্ডারের চাপের কারণে সব সুবিধা একসঙ্গে নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জ।

বদলে দেওয়া এক শিল্প:
বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসে পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ এক বড় অধ্যায়। এই খাত শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেনি, বদলে দিয়েছে লাখো নারীর জীবন। অনেকেই প্রথমবারের মতো নিজের আয় করেছেন, পরিবারের সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন।

গাজীপুরের শ্রমিক রিনা খাতুন কথাটা সহজ ভাষায় বললেন, “কষ্ট আছে, অনেক কষ্ট। কিন্তু এই কাজ না থাকলে আমি হয়তো আজও গ্রামের বাড়িতে অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকতাম।”

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিটি পোশাকের সেলাইয়ে তাই জড়িয়ে আছে শুধু সুতা নয়—আছে লাখো নারীর সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ, স্বপ্ন আর অদম্য বেঁচে থাকার গল্প।