ঢাকা, শনিবার ০৪, ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১:২৯:১৫ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সরকার সমৃদ্ধ রাজস্ব ভাণ্ডার গড়ে তোলায় প্রাধান্য দিচ্ছে নেপালকে হারিয়ে সাফে শুভ সূচনা বাংলাদেশের মেয়েদের ছুটির দিনে সরগরম প্রাণের বইমেলা নজরুলের মানবিকতা সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনুপ্রেরণা যোগাবে দেশে করোনায় আক্রান্ত আরও ১০ জন বেড়েছে মুরগি ও ডিমের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে যেসব পণ্যের দাম

স্যার, আমরাই তো... 

শামীম আজাদ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:০০ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০২২ বৃহস্পতিবার

শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

ডিসেম্বর এলেই আমি অন্য রকম হয়ে যাই। এক অপ্রাপ্ত  বয়সের মানুষ হয়ে যাই। ডিসেম্বর একই সংগে তা বিজয় ও বেদনার মাস। এ মাসেই আমার বাবার প্রয়াণ হয়। সে তো বেদনার। এবং সেছিল ১৯৭৭ সাল। কিন্তু ১৯৭১ এ মাসেই আমার পিতৃস্থানীয় যে শিক্ষকদের হারিয়েছি তাদের কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারেনি। তাদের হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে তাঁদেরকে বাংলাদেশের কপাল থেকে কেড়ে নিয়েছে কিছু কুলাঙ্গার। ডিসেম্বর এলেই তাই ক্ষুদ্ধ, আহত ও ভারাক্রান্ত থাকি। সব কিছুতেই তাঁদের কথা মনেপড়ে।
জানি ‌‌‌'মানুষ চলে গেলে তার পালক রেখে যায় জ্ঞাতি চিহ্ন দেখে দেখে পরশ বুলায়।' তাইতে তাঁদের স্মরণ। 
রাতে, লেখার জন্য উঠেছিলাম। দেখি ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে এমন ভাবে আলো এসে পড়েছে যেন চাপাতি! সে আলো চাঁদের, না লাইট পোস্টের জানি না। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠ্তে গিয়ে চমকে উঠলাম। বাথরুমে গিয়ে গামছা ভিজিয়ে মুখ মুছলাম। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় ফিরে এলাম। কারন মাসটা ডিসেম্বর। তারিখটা ১৪ ডিসেম্বর।
ঐ চাপাতির আকার দেখে প্রতিবছরের মত আবার আমার স্যারদের যে হত্যা করা হয়েছে তা মনেপড়ে।শয়তানরা হত্যা করেছে আমার স্যারদের। কী মর্মান্তিকভাবে তাদের চাপাতির আঘাতে আঘাতে ক্ষত ক্ষতবিক্ষত করেছে আহ তাঁদের দেহের অবশেষও রাখেনি সে হত্যাকারী নরাধম খুনীরা। 
এখনো আমার কানের বাজে রায়ের বাজার ঘুরে আসা অনুজপ্রতিম কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বুলবুলের চিৎকার। ‘আপা গো, তাঁরা নিখোঁজ না ওরা মাইর‍্যা ফেলছে আপনার স্যারদের'। বুলবুলের সারা শরীর থর থর কাঁপছে কাঁপছে হাতের এসএলআর। সোবহান বাগের ফ্ল্যাটের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে আমার ক্রন্দনে। আব্বা আম্মা ছুটে এসেছেন। আমি জানতাম বুলবুলরা সবগুলো বন্দীশালা খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কোথায় আমাদের স্যাররা? মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশিদুল হাসান, আনোয়ার পাশা, আর গিয়াসুদ্দিন স্যার? এখন কী বলছে সে? আরো অনেক গুণীজনের মৃতদেহের  সঙ্গেপাওয়া গেছে তাদের ছিন্নভিন্ন দেহ।  কিন্তু চেনা যায় না। বুলবুলের সেই হাহাকার এত বছর পরেও আমার এই ঘরে এসে দাঁড়ায়। আমি সেই ভয়াবহ বধ্যভূমিতে জেগে উঠি। দেখি, সেই চাপাতি ও ছুরির কোপে চোখ তোলা, আঙ্গুল কাটা, পেছনে হাতবাঁধা আমার স্যারদের মৃতদেহ। 
আমার নিরীহ বাবার মতই ঘরে তাঁরাও গেঞ্জি পরতেন, ঘরে লুঙ্গি পরতেন। তাঁদের সেই সব ঘরে পরার জামা বেয়োনেটের খোঁচায় খোঁচায় ফাড়া। আমি এখনো মরে যাই তা মনে করে। আমার যে কি হাল হয় তা কেবল আমার সতীর্থরাই বুঝবেন আর কেউ না। 
যারা তাঁদের এতো কষ্ট দিয়ে, ঘা দিয়ে হত্যা করেছে তারাও তো ছিলো স্যারদের সরাসরি ছাত্র! তবে কি করে তা পারলো? তারাও তো আমার বাবার মত, স্যারদের মত সাধারণ এক বাবার সন্তান ছিলো! স্যারদের গায়ে অস্ত্র ব্যবহারের আগে কি একবার ও সেই শয়তানদের চোখে নিজের বাবার মুখ ভেসে আসেনি? আসেনি কোন একজনও বয়সী নির্লোভ, নরম মানুষের অবয়ব? 
আমার বিদ্যাদেবগন বিশ্বাসপ্রবণ মানুষ। ঘাতকদের ঘাতক ভাবেন নি। স্যার বলে সম্বোধন করায় ছাত্র মনে করে পরম বিশ্বসে হাত ধরে উঠে গেছেন সেই মরন শকটে।  ঘাতকরা যে মিথ্যে করে বলছে, স্যারদের নিয়ে আসা হবে শিগগীরই তখন আমার স্যাররা পিতা যেমন সন্তানের উপর নির্ভর করে তারা মঈন্দুদ্দিন ও তার সংগীদের উপর সেভাবেই নির্ভর করেছিলেন।
এখনো স্পষ্ট মনে আছে  রাশিদুল  হাসান স্যারের কথাগুলো।যেদিন বাবলী আর আমি মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সতর্কবানী পৌঁছে দিতে দেখা করেছিলাম তাঁদের সঙ্গে।
- স্যার এখন আর আপনাদের নিজের বাসায় থাকা না। ইংরাজীর অধ্যাপক রাশীদুল হাসান হেসে বলেছিলেন, 
- কি বল! ওরা আমাদের ছাত্র না! আমাকে একবার ধরে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে না? হায়রে সন্তের মত স্যার আমার তাদের করেন নি অবিশ্বাস।
রাশিদুল হাসান স্যার পড়াতেন আমার সাবসিডিয়ারী ইংরাজী। স্মার্ট, সুদর্শন। ব্যাক ব্রাশ, সাদা হাফ-হাতা শার্ট। সি পি স্নো পড়াতে পড়াতে বাংলা সাহিত্যের মানিক, ওয়ালীউল্লাহ কিছুই বাকি রাখতেন না। স্যারের ক্লাশ ছিলো দুপুর বেলা। পড়াতে পড়াতে সেই শ্রেণীকক্ষের পেছনে নিচে মধু দা’র ক্যন্টিনের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ থেকে আছরের আজান ভেসে আসতো। স্যার তখন পড়ানো থামিয়ে দিতেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে নিরবতা পালন করতাম। আজান শেষ হলে সেই ‘কমা’ থেকেই এবার শুধু করতেন। আমি বিস্মিত হয়ে শুনতাম ইংলিশ ব্রিটিশ উচ্চারণ।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর কব্জিতেও- আব্বার মত তবে কালোর বদলে একটা লালচে খয়েরী বেল্টের ঘড়ি। তিনি পরতেন ঘি রঙা খদ্দর বা দেশীসূতির লম্বা পাঞ্জাবি। তাঁর পা’জামা সাদা আর ঘেরওলা। স্যূ পরা দেখেছি কি? মনে পড়ে না। তাঁর ছিল বেল্টওলা স্যান্ডেল। সামনে পড়ে গেলে পিতার মমতায় কথা বলতেন। ভর্তি পরীক্ষার ভাইভায় আমি সিলেটের মেয়ে জেনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলতো কোন বাঙ্গালী মহাপুরুষের জন্ম হয়েছিলো সিলেটে? সেই ফ্যাঁসফ্যাঁসে অসাধারণ স্বরে। ঠেকে গেছিলাম। তখন নিজেই সূত্র ধরিয়ে বলেছিলেন- তাঁর ডাক নাম দিয়ে তোমাদের সিলেটে কত গান হয়েছে। মুহুর্তে অবনত মুখ তুলে বলেছিলাম
- শ্রী চৈতন্য দেব?
- এবার ডাক নাম বলো।
- নিমাই।  
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী পড়াতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। শান্তি নিকেতনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া ছাত্র- এত মেধাবী, এত গুণের আকর, এত এক বিশ্বকোষ। শান্তিনিকেতনে তাঁকে বলা হতো ‘মুখোজ্জ্বল চৌধুরী’। যে কোন বেলায় দেখলেই মনে হতে যেন সদ্য শীতল জলে স্নান করে এসেছেন। তিনি পরতেন পাজামা পাঞ্জাবিও কালো ওয়েস্ট কোট। পায়ে বেল্ট দিয়ে আটকানো স্যান্ডেল। কিন্তু কথা বলতেন এতো নরম করে যেন বাতসের গায়ে আঁক বসে বাতাস ব্যথা না পায়। ক্লাশ নিতেন যেন তিনি বসে আছেন নিজের ঘরের মেহগিনি কাঠের এক হাতাওয়ালা চেয়ারে। আর আমরা কাঠের বেঞ্চে।
কবিতা পাঠের নিমিত্তে উচ্চারণ ধরে ধরে ধ্বনিবিন্যাস শিখেছি তাঁর কাছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার ধারা ও কবিগুরুর কবিতায় তাঁর নিজস্ব আত্মাটাও যে আমূল গাঁথা সে আমরা স্যারের পড়ানো থেকেই বুঝতাম। স্যার গাড়ি চালিয়ে আমাদের সোবহানবাগের ফ্ল্যাটেও গেছেন। আমার বাবার সঙ্গে গল্প করেছেন। আমার  বাবা ও মা, এত বড় মানুষের আগমনে আপ্লুত হয়েছেন।
আনোয়ার পাশা স্যার পড়াতেন রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ। স্যার অনেক দ্রুত কথকতায় কাদম্বিনী, চারুলতা, নরেশ, ভূপতি, রতন সবাইকে এনে ক্লাশরুমে দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারঙ্গম ছিলেন। স্যারের নিজের গদ্যের হাত ছিল শক্তিজলে ধোয়া। ছোটগল্পই একা শিল্পকর্ম হিসেবে যে একটা মহা কারুকার্যময় ব্যাপার, ঐ ব্যাপারের আগে যে শ্যাপারগুলোও পড়তে হয়, আর তার জন্যে যে পাবলিক লাইব্রেরী ও বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীর সামনে স্যান্ডেল ক্ষয় করতে হয়, স্যারের ক্লাশেই তা প্রথম বুঝেছিলাম।
তিনি লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত উপন্যাস- ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’। তু নামটা শুনলেই কি মনে হয় না- আগেই পেয়েছিলেন এক অশনি সংকেত? স্যার কি তবে এক সন্ত পুরুষ ছিলেন, যিনি ভবিষ্যত দেখতে পারতেন? কিন্তু নিজের নির্মম ভবিষ্যত তো দেখতে পান নি এ ভবিষ্যতদ্রষ্টা? নিজের ভবিষ্যতকে সুরক্ষা করতে ভেবেছিলেন, পাকিস্তানই তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য। ভারত থেকে তাই শরনার্থী হিসেবে এদেশে এসেছিলেন স্যার। যে দেশকে নিরাপদ ভেবেছিলেন, সেখানেই তাঁকে প্রান দিতে হল! 
জীবনে যাঁদের কেউ কোনদিন অশ্রদ্ধা করে কথা বলেনি। যাঁরা জীবনে কোনদিন পেন্সিল কাটার জন্য আধাভাঙা ব্লেড ছাড়া আর কোন অস্ত্রের  চেহারা দেখেন নি। পৃথিবীর মানুষের কল্যান কামনা ছাড়া আর কিছু ভাবেন নি। মানুষের শুভবুদ্ধির উদয়ের জন্য কেবল কোমল কথাই বলেছেন তাঁদেরই কি তীক্ষ ধারলো অস্ত্রে কি কষ্ট দিয়ে তারা কেটেছে! আর এত যে সম্মানিত সূর্য্যসন্তান তাঁরা তাদের দেহ মাটিতে ফেলে দিয়েছে! সে ছিলো দেশের সবচেয়ে সম্মানিত মহাপ্রানদিগের প্রতি সবচেয়ে বড় আঘাত, অন্যায়! তাঁদের সে দেহের পাশে চারিদিকে থান থান খয়েরী ইট ছিল আর ছিল জল। সে জল  ধুয়ে, ভাসিয়ে নিয়ে গেছে  দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদের রক্ত ও ক্রন্দন। 
বুদ্ধিজীবিরাই তো জাতির বিবেক, জাতির মগজ। আমাদের নিঃস্ব করে গেছে সে ১৪ ডিসেম্বর। আমাদের জাতি তাই আমরা ধীরে ধীরে পঞ্চাশ বছে মগজহীনতার প্রমাণ দিতে দিতে এখন নীতি-দেউলিয়া হয়ে গেছি। এখন মনে হয় তারাই ছিলেন আজকের বাংলাদেশের  এই দলিত লাঞ্ছিত, দেশদেহ। আর মগজবিহীন বলেই সেই পরাজিতদের শক্তিরই আমরা করছি শুশ্রুষা। 
‘মানুষ চলে গেলে তার পালক রেখে যায়। জ্ঞাতি চিহ্ন দেখে দেখে পরশ বুলায়।’ মনে হয় তাঁরা আসেন। কারন আমরা যে তাঁদের জ্ঞাতি! কিন্তু কী করছি আমরা?