ঢাকা, রবিবার ০৭, জুন ২০২০ ৮:০০:২৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রাজধানীতে করোনা চিকিৎসায় ৩শ শয্যার হাসপাতাল উদ্বোধন চট্টগ্রামে করোনা চিকিৎসায় মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু শুধু ঢাকাতেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখ : দ্য ইকোনমিস্ট পল্লবীতে নারীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন হাসপাতালে ভর্তি ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস কাল

হো-চি-মিনের দেশ ভিয়েতনাম

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:১০ পিএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার

হো-চি-মিনের দেশ ভিয়েতনাম

হো-চি-মিনের দেশ ভিয়েতনাম

ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইন্দো চীন উপদ্বীপের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। ভিয়েতনামের উত্তরে গণচীন, পশ্চিমে লাওস ও কম্বোডিয়া, দক্ষিণ ও পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগর অবস্থিত। হ্যানয় ভিয়েতনামের রাজধানী। হো চি মিন সিটি হল বৃহত্তম শহর।

ভিয়েতনাম ভৌগোলিক ভাবে সরু ও দীর্ঘ। এর ভূমিরূপ বিচিত্র। উত্তর প্রান্তে ও মধ্যভাগের ভিয়েতনাম পাহাড়-পর্বতময়। উত্তরের উচ্চভূমিগুলি ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে পূর্বদিকের প্রশস্ত, নদীবহুল উপকূলীয় সমভূমির সঙ্গে মিশে গেছে। সমভূমিগুলিতে নিবিড় কৃষিকাজ হয় এবং বহু শতাব্দী ধরে ভিয়েতনামীয়রা এগুলিতে অনেক বাঁধ তৈরি করে ও খাল কেটে সেচকাজ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মধ্য ভিয়েতনাম দেশের সবচেয়ে সরু অংশ; এখানে পর্বতগুলি সাগরপারের অনেক কাছে অবস্থিত, এমনকি কোন কোন জায়গায় এগুলি সাগরের একেবারে গা ঘেঁষে রয়েছে। দক্ষিণ ভিয়েতনাম মূলত মেকং নদীর অববাহিকা দ্বারা গঠিত প্রশস্ত এবং এই সমভূমি উর্বর। এখানে প্রচুর কৃষিকাজ হয় এবং মূলত ধান উৎপাদন করা হয় ।

ভিয়েতনাম একটি কৃষিভিত্তিক সমাজ হিসেবে গড়ে ওঠে। এখনও এখানকার অধিকাংশ লোক গ্রামে বাস করেন। ২০০৩ সালের হিসাব অনুযায়ী শহরে ২৬% লোকের বাস। তবে শহরমুখী জনসংখ্যার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে, ফলে হো চি মিন সিটি, হানয় এবং অন্যান্য এলাকার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভিয়েতনামে প্রায় ৫০টির মত ভিন্ন জাতিগত ও ভাষাগত গোষ্ঠী বসবাস করেন। তবে ভিয়েত বা ভিয়েতনামীয় জাতির লোকেরাই সর্বতোভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভিয়েতনামীয় জাতির লোকেরা আদিতে লোহিত নদীর উপত্যকায় বাস করত। নদীটি দক্ষিণ চীনে উৎপত্তি লাভ করে উত্তর ভিয়েতনামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে টোনকিন উপসাগরে পতিত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে চীন অঞ্চলটি দখল করে। ৯৩৯ সালে ভিয়েতনামীয়রা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী ১০০০ বছর ধরে ভিয়েতনাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গতিশীল সভ্যতায় পরিণত হয় এবং উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে বিস্তার লাভ করতে থাকে।

১৯শ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্স ভিয়েতনাম আক্রমণ করে। ফরাসিরা দেশটিকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে দেয় এবং অঞ্চলগুলিকে কম্বোডিয়া ও লাওসের সাথে যুক্ত করে ইন্দোচীন ইউনিয়ন তথা ফরাসি ইন্দোচীন গঠন করে। ফরাসিরা নিজেদের সুবিধার জন্য ভিয়েতনামের সম্পদ আহরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৩৯-১৯৪৫), ভিয়েতনামে উপনিবেশ বিরোধীরা সাম্যবাদী দলের নেতৃত্বে ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফু-তে ভিয়েতনামী সেনারা ফরাসি সেনাদের যুদ্ধে পরাজিত করে। এরপর ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে দুইটি অঞ্চলে ভাগ করা হয় --- উত্তর ও দক্ষিণ। উত্তর ভিয়েতনামে একটি সাম্যবাদী সরকার এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাম্যবাদ বিরোধীরা শাসন করা শুরু করে। পরবর্তী ২০ বছর ধরে উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম একত্রীকরণের একটি আন্দোলন শুরু হয় এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা সরিয়ে নেয় এবং দুই বছর পরে দক্ষিণ ভিয়েতনাম সাম্যবাদীদের করায়ত্ত করে। ১৯৭৬ সালে দুই ভিয়েতনামকে একত্রিত করে একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, রাজধানী হয় হানয়। যদিও ভিয়েতনাম এখনও সাম্যবাদী শাসনের অধীন। বর্তমানে অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন দিক বাস্তবায়ন করা শুরু হয়েছে।

শত শত বছর ধরে চলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামি জাতির জন্ম৷ খ্রীস্টপূর্ব ২২১ সালে চীনের ছিন রাজবংশ এই এলাকা দখল করে। ২১০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ছিন রাজবংশের পতনের পর তাদের দক্ষিণাঞ্চলের সেনাপতি চাও থুও (ভিয়েতনামে ট্রিয়েউ দা নামে পরিচিত) সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকা নিয়ে নাম ভিয়েত নামক নতুন রাজ্য গঠন করেন। পরবর্তীতে বর্তমান ভিয়েতনামের আরো এলাকা এই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১১১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে নাম ভিয়েত চীনা হান রাজবংশের দখলে চলে যায়। চৈনিক আধিপত্যের বিপক্ষে ভিয়েতনামিদের প্রতিরোধ বিক্ষিপ্তভাবে চলতে থাকে। অবশেষে ঙো কুইয়েনের নেতৃত্বে ৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে তারা চীনাদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। নতুন রাজবংশের শুরু হয়। তবে অল্পদিনেই তাতে ভাঙ্গন ধরে। এরপর কিছুদিন গৃহযুদ্ধের পর ১০১০ সালে লি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজ্যের নাম হয় দাই ভিয়েত। ১২২৫ সাল থেকে শুরু হয় ট্রান রাজবংশের শাসন। এই পুরো সময়টাতে তাদেরকে চীনের রাজাদের সাথে লড়তে হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গোলরা চীন দখল করে ইউয়ান রাজবংশের সূচনা করে, তারা ভিয়েতনামেও আক্রমণ চালায়, তবে সফল হয়নি। এদিকে দক্ষিণে অবস্থিত চাম্পা রাজ্য দখল করায় ভিয়েতনাম রাজ্যের পরিধি আরো বৃদ্ধি পায়। ১৪০৭ সালে চীনা মিং রাজবংশ ভিয়েতনাম দখল করে। তবে দুই দশকের মাঝে ভিয়েতনামিরা স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। শুরু হয় লে রাজবংশের শাসন। এটি প্রায় তিন শতক শাসন করে। তবে সপ্তদশ শতকে রাজ্যটি প্রশাসনিকভাবে কার্যত দুই ভাগ হয়ে যায়। এটি ইউরোপীয় শক্তির আধিপত্যবিস্তারকে সহজ করে দেয়।

ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত একটি একদলীয় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। ১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। দেশের সর্বশেষ সংবিধান ১৯৯২ সালের ১৫ই এপ্রিল প্রণীত হয়। ভিয়েতনামের সরকার ব্যবস্থা তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বে আছেন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা ও অন্যান্য কমিশনের প্রধান। জাতীয় সংসদের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ন্যস্ত। বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্ট এবং অন্যান্য আদালত নিয়ে গঠিত। ভিয়েতনামের সংবিধান অনুসারে কেবল একটিই রাজনৈতিক দল স্বীকৃত এবং বৈধ, যার নাম ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি। এর সদস্যসংখ্যা ৩০ লক্ষেরও বেশি। এটি অতীতে ভিয়েতনাম শ্রমিক দল নামে পরিচিত ছিল, যা আবার ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্দোচীন কমিউনিস্ট পার্টিরই বিবর্তিত রূপ। ভিয়েতনামে ভোটাধিকারের বয়স ১৮; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ভোট দিতে পারে।

ভিয়েতনাম ৫৮টি প্রদেশ এবং ৫টি মিউনিসিপাল শহর নিয়ে গঠিত। মিউনিসিপালিটিগুলি হল কান থাও, হাইফং, দা নাং, হানয় এবং হো চি মিন শহর।

ভিয়েতনামীয় ভাষা ভিয়েতনামের সরকারি ভাষা। এছাড়াও ভিয়েতনামে আরও প্রায় ৭০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে তাই ভাষার বিভিন্ন উপভাষাতে ১০ লক্ষাধিক ব্যক্তি কথা বলেন। খমের ভাষা এবং মুওং ভাষা-তে আরও প্রায় ১০ লক্ষ করে লোক কথা বলেন। চীনা ভাষার ইউয়ে উপভাষাতে প্রায় ৫ লক্ষ লোক কথা বলেন। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডেফরাসি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

ভিয়েতনামের সবচেয়ে প্রাচীন তিনটি ধর্ম হল মহায়ন বৌদ্ধধর্ম, কনফুসিয়াসবাদ এবং দাওবাদ। এগুলি ভিয়েতনামে ত্রিধর্ম তথা ট্যাম গিও নামে পরিচিত। এছাড়াও এখানে রোমান ক্যাথলিক ধারার খ্রিস্টধর্ম, কাও দাই, হোয়াও হো ধর্মের উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আছে। সাম্প্রতিক শতকগুলিতে ভিয়েতনামে প্রোটেস্টান্ট ধারার খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম এবং থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম প্রচলিত হয়।

ভিয়েতনামের বেশিরভাগ মানুষ নিজেদেরকে ধার্মিক দাবী করে না, তবে অনেকেই প্রতি বছর বেশ কয়েকবার ধর্মীয় মন্দিরগুলিতে যায়। ভিয়েতনামীয়দের আচার ও রীতিনীতিতে বিভিন্ন ধর্মের মিশ্রণ ঘটেছে; এদের মধ্যে উপরোল্লিখিত তিনটি প্রধান ধর্মের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই তিনটি ধর্ম বহু শতক ধরে ভিয়েতনামে সহাবস্থান করে আসছে।