ঢাকা, মঙ্গলবার ২৭, অক্টোবর ২০২৬ ০:০১:৫৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
আজ স্পেন যাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা, ৩ বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস নির্বাসন শেষে ভেনেজুয়েলায় ফিরলেন নোবেলজয়ী মাচাদো জাপানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ ডিগ্রিতে নামল পঞ্চগড়ের তাপমাত্রা, বাড়ছে শীতের অনুভূতি টানা পাঁচ দিনের ছুটি শেষে আজ খুলছে অফিস-আদালত সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন, কবর খুঁড়লেন স্ত্রী-মেয়ে-বোন এইচএসসির ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর

কী অদ্ভুত এই স্বাধীনতা! যে দেশে মুক্তিযোদ্ধার কবরও নিরাপদ নয়

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:০৬ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্মৃতি, চেতনা ও আত্মত্যাগের প্রতীকগুলোকে ঘিরে একের পর এক যে ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন জাগে, যে দেশের জন্ম লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে, যে দেশের স্বাধীনতার জন্য মানুষ জীবন বাজি রেখেছিল, সেই দেশের মাটিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের কেন বারবার অপমানিত হতে হবে?

মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ভেঙে ফেলা, মুক্তিযোদ্ধার কবরের ওপর হামলা কিংবা সেখানে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিষয়মাত্র নয়। এগুলো আমাদের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জড়িত। এসব ঘটনার প্রতিটির সুষ্ঠু তদন্ত, দায় নির্ধারণ ও বিচার হওয়া জরুরি। কারণ, একটি জাতি যখন তার ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়, তখন তার ভবিষ্যৎও বিপন্ন হয়ে পড়ে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে কোনো ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যক্ষ নির্দেশ বা উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। ইতিহাসের বিচার আবেগ দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু তার পূর্ণতা আসে সত্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে।

তারপরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই—স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি এমন অবজ্ঞা ও বিদ্বেষের পরিবেশ কীভাবে তৈরি হলো? কেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষেরা নিজেদের নিরাপত্তা, সম্মান ও স্মৃতি নিয়ে শঙ্কিত হবেন? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় তাঁকে সম্মান দেওয়ার বদলে কখনো কখনো বিদ্রূপ, অপমান কিংবা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে?

মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধারা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহে মুক্তিযোদ্ধা হননি। তাঁরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য, একটি পতাকার জন্য, বাংলা ভাষায় নিজের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য। তাঁদের রাজনৈতিক মত, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা জীবনের শেষ দিনগুলোর অবস্থান যা-ই হোক, মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবদানকে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই।

এই প্রেক্ষাপটে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন নিয়ে যে পরিস্থিতির খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা আরও বেদনাদায়ক। সংবাদ অনুযায়ী, পিরোজপুরে তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে জটিলতা ও বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনকে নিজেরাই কবর খোঁড়ার মতো অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে জানা গেছে। একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য আর কী হতে পারে? একজন মৃত মানুষের শেষ বিদায়টুকুও যদি স্বাভাবিক মর্যাদায় সম্পন্ন করা না যায়, তবে আমাদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

মানিক পশারীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারা বাধা দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল এবং তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বিদ্বেষ কাজ করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর চাই। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ, কোনো মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের কারণে তাঁর মরদেহের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আজ যদি মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, কাল অন্য কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটবে না? আজ যদি ইতিহাসের একটি স্মারক ভেঙে ফেলা হয়, কাল কি অন্য কোনো স্মৃতিচিহ্নও নিরাপদ থাকবে? আজ যদি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে অপমান করা হয়, আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরব?

যাঁরা একাত্তরের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চান, তাঁদের মনে রাখা প্রয়োজন—ইতিহাসের স্থাপনা ভেঙে ফেলা যায়, স্মৃতিফলক মুছে ফেলা যায়, বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা যায়; কিন্তু একটি জাতির জন্মের ইতিহাসকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো বাড়ির দেয়ালে আটকে নেই। তা রয়েছে লাখো শহীদের আত্মত্যাগে, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে, স্বজনহারা পরিবারের কান্নায়, শরণার্থীদের দুর্দশায় এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা মানুষের সাহসে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো অপরাধ নয়। পাকিস্তানি শাসন, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল বাঙালির ন্যায়সংগত অধিকার। সেই স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়েছিলেন, তাঁদের ‘পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করা ইতিহাসের সঙ্গে নির্মম পরিহাস। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরই যদি তাঁদের অবদানের জন্য অপমানিত হতে হয়, তবে স্বাধীনতার অর্থ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবেই।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না; যেখানে ইতিহাসের স্মারক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে; যেখানে মৃত মানুষের শেষ বিদায়ও বিরোধ ও বিদ্বেষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। আমরা এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মানুষের মৌলিক মর্যাদা নিয়ে কোনো আপস থাকবে না।

স্বাধীনতা মানে শুধু একটি ভূখণ্ডের মালিকানা নয়। স্বাধীনতা মানে মানুষের মর্যাদা, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার এবং ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা। যে স্বাধীনতায় মুক্তিযোদ্ধার কবরও নিরাপদ থাকে না, সেই স্বাধীনতার চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ করলেই চলবে না; বর্তমানের অন্যায়, অবমাননা ও ইতিহাসবিকৃতির বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সব নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, সেই মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধাদেরই যদি এই দেশে অপমানিত হতে হয়, তবে প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কোন বাংলাদেশের পথে হাঁটছি?

বড় অদ্ভুত এই স্বাধীনতা! যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে সেই প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। ইতিহাসের কাছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, শহীদদের কাছে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে।

আইরীন নিয়াজী মান্না: সম্পাদক- উইমেননিউজ২৪.কম