ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ১৬:১৪:৩৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
১৪ বছরের অগাস্টিনার হত্যায় ক্ষোভে ফুঁসছে আর্জেন্টিনা কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় ৪ বাংলাদেশি আহত রামিসা ধ*র্ষণ-হত্যা মামলার রায় ৭ জুন রামিসা হত্যা মামলা: রায়ের দিন নির্ধারণ হতে পারে আজ সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার

পিতা-মাতার সুরক্ষা আইন: বাবা-মায়ের ভরসা নাকি কাগুজে অধিকার?

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:৫২ পিএম, ৪ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

আইন আছে, কিন্তু কতটা প্রয়োগ হচ্ছে?—এ প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা, নির্যাতন কিংবা ভরণপোষণ না দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। পরিবার ও সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা যেমন কম, তেমনি এর প্রয়োগও খুব বেশি চোখে পড়ে না। এমন কি অনেকে এ আইন সম্পর্কে জানেনও না।

কেন করা হয়েছিল এই আইন?

বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অবহেলার ঘটনাও বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর বাবা-মায়ের খোঁজখবর রাখে না, চিকিৎসা বা দৈনন্দিন খরচ বহন করে না। এমন বাস্তবতায় বাবা-মায়ের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৩ সালে এ আইন প্রণয়ন করে।

আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো—সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব আইনগতভাবে নিশ্চিত করা।

আইনে কী বলা হয়েছে?

আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। ভরণপোষণের মধ্যে রয়েছে—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও পরিচর্যা।

আইনে বলা হয়েছে, সন্তানরা নিজেদের আয় ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করবে।

এছাড়া কোনো সন্তান বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও রেখে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবে না, যদি না বাবা-মা নিজেরাই সেখানে থাকতে সম্মত হন।

শাস্তির বিধান কী?

আইন অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করে, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে দোষী প্রমাণিত হলে— সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।

একইভাবে, কোনো পুত্রবধূ বা জামাতা যদি সন্তানকে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতে বাধা দেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মামলা করতে পারেন কারা?

পিতা বা মাতা নিজে অভিযোগ করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অনুমতি নিয়ে অন্য ব্যক্তিও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। অভিযোগের পর বিষয়টি প্রথমে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। সমাধান না হলে আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

বাস্তবতা কী বলছে?

আইনটি কার্যকর থাকলেও দেশে এ আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম। আইনজীবীরা বলছেন, অধিকাংশ বাবা-মা সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কিংবা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনীহার কারণে আদালতের দ্বারস্থ হন না।

ঢাকার একজন সিনিয়র আইনজীবীর ভাষায়, "অনেক বাবা-মা না খেয়ে থাকলেও সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তারা শাস্তি নয়, সন্তানের দায়িত্বশীল আচরণ চান।"

বৃদ্ধাশ্রমে বাড়ছে প্রবীণদের সংখ্যা

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী প্রবীণদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনেকেই সন্তান থাকা সত্ত্বেও একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও মানসিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভরণপোষণ শুধু অর্থের বিষয় নয়; বাবা-মায়ের প্রয়োজন সন্তানের সময়, সঙ্গ ও মানসিক সহায়তাও।

আইনের সীমাবদ্ধতা কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাবা-মায়ের মানসিক নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। অভিযোগ করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ওপরই নির্ভরতা বেশি। সচেতনতার অভাবে অনেকেই আইনের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন না। গ্রামীণ পর্যায়ে আইনি সহায়তা পাওয়াও অনেক সময় কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মত

প্রবীণ অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা এবং প্রবীণবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন। তাদের ভাষায়, "বাবা-মায়ের ভরণপোষণ কোনো দয়া নয়, এটি সন্তানের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।"

উপসংহার

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ বাংলাদেশের প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আইনটির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করছে এর কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হওয়ার ওপর। কারণ আদালত হয়তো ভরণপোষণ আদায় করতে পারে, কিন্তু সন্তানের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সান্নিধ্য নিশ্চিত করতে পারে না। বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া এখনো সেই পুরোনো—সন্তানের পাশে থাকা।