ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৩০:২১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে চাই সঠিক পরিকল্পনা

জোসেফ সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:১৪ পিএম, ১৮ মে ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। শিক্ষকসংখ্যার ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তির অভাব—এসব সমস্যার কারণে শিশুদের মৌলিক শিক্ষা প্রভাবিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত করা ছাড়া দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাসামগ্রীর ঘাটতিও শিক্ষার মানকে কমিয়ে দিয়েছে। একাধিক শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি।

মূল সমস্যা

১. শিক্ষকসংখ্যার ঘাটতি: দেশের প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম, যা শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও সেই অনুপাতে শিক্ষক না থাকায় প্রতিটি শিশুর প্রতি আলাদা মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে পাঠদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার গুণগত মান কমে যায়। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতার অভাবও শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনেক, কিন্তু শিক্ষক খুবই কম। এতে প্রত্যেক শ্রেণিতে ঠিকভাবে পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখান না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

২. অবকাঠামো ও শিক্ষাসামগ্রী: অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শ্রেণিকক্ষের অভাব, জরাজীর্ণ ভবন, অপ্রতুল টেবিল-চেয়ার এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার ঘাটতি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত পাঠ্যবই, সহায়ক শিক্ষা উপকরণ, বিজ্ঞানাগার ও ব্যবহারিক শিক্ষার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তবভিত্তিক ও দক্ষতামূলক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের মান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিশুদের শেখার আগ্রহ ও সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।

৩. আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির অভাব: বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদা, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা এবং পরিবর্তিত শিক্ষা বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাপদ্ধতিতে আধুনিকায়ন জরুরি হলেও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা এখনও সীমিত। বিশেষ করে শিশুদের উপযোগী ইন্টারঅ্যাকটিভ, প্রযুক্তিভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ এখনো সর্বত্র গড়ে ওঠেনি। অনেক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল উপকরণ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ব্যবহারিক শিক্ষা ও সৃজনশীল শেখার সুযোগের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু মুখস্থনির্ভর পাঠে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যা তাদের বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বাস্তবজ্ঞান বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। আধুনিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির বিস্তার অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন: প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক পাঠ্যক্রম, শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকবৃন্দ।

শিক্ষক হাসিনা বেগম বলেন, মেয়েদের স্কুলে আসা বাড়াতে নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার মান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিশুর মানসিক ও জ্ঞানের ভিত্তি।

শিশু অধিকারকর্মী লিজা রহমান বলেন, শিশুদের শেখার আগ্রহ তৈরি করতে প্রয়োজন কৌশলগত পাঠক্রম, খেলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম। শুধু বই পড়লেই হবে না।

উন্নয়নের জন্য সুপারিশ

শিক্ষকসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ: নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষককে আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি, কম্পিউটার ও ডিজিটাল শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া।

সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন: নিরাপদ ক্লাসরুম, বই, টেবিল-চেয়ার, ল্যাব সরঞ্জাম ও খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা।

ডিজিটাল শিক্ষা ও ইন্টারঅ্যাকটিভ পদ্ধতি: শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে ই-লার্নিং, ভিডিও ক্লাস ও শিক্ষামূলক গেম ব্যবহারের সুযোগ।

এছাড়াও নারী শিক্ষার্থী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য সমতা সৃষ্টি করতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ, হাইজিন ব্যবস্থা, অনলাইন শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। মাতাপিতার সচেতনতা ও সম্প্রদায় ভিত্তিক সমর্থন বৃদ্ধি করা জরুরী। শিশুদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানো ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার।

উপসংহার: প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। যদি শিশুরা এই পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা না পায়, তবে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে। সরকার, শিক্ষক, পরিবার ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু সমান সুযোগে মৌলিক শিক্ষা পায়।