ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:২৯:৫৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকা ও কিশোর লেখা

কিশোর লেখা ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:২২ পিএম, ৩ মে ২০২৬ রবিবার

ছোটদের প্রিয় পত্রিকা কিশোর লেখা।

ছোটদের প্রিয় পত্রিকা কিশোর লেখা।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শিশু-কিশোরদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মনন, কল্পনা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতা গড়ে ওঠে যে কয়েকটি প্রধান মাধ্যমের মাধ্যমে, তার মধ্যে শিশু-কিশোর পত্রিকা অন্যতম। পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞান, আনন্দ, কৌতূহল, চিন্তাশক্তি ও মানবিক বোধ জাগিয়ে তুলতে শিশু-কিশোর পত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বাংলা ভাষায় শিশু-কিশোর পত্রিকার ইতিহাস প্রায় দুই শতকের। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অসংখ্য পত্রিকা এসেছে, কিছু হারিয়ে গেছে, কিছু আজও আলো ছড়াচ্ছে। এই ধারার প্রতিটি পত্রিকা একেকটি সময়ের প্রতিনিধি, একেকটি প্রজন্মের স্মৃতি। বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্য ও পত্রিকা জগতে কিশোর লেখা সেই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

বাংলা শিশু-কিশোর পত্রিকার সূচনা

বাংলা ভাষায় শিশুদের জন্য পৃথকভাবে পত্রিকা প্রকাশের ধারণা উনিশ শতকে গড়ে ওঠে। তখন শিক্ষিত সমাজে শিশুদের জন্য আলাদা সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে শুরু করে।

১৮১৮ সালে প্রকাশিত দিগ্দর্শন বাংলা ভাষার প্রথম দিকের সাময়িকপত্রগুলোর একটি। যদিও এটি সরাসরি শিশুদের জন্য প্রকাশিত হয়নি, তবু সহজ ভাষায় জ্ঞানবিষয়ক নানা লেখা থাকায় কিশোর পাঠকেরাও তা পড়ত।

পরবর্তীতে বিদ্যাদর্পণ, অবোধ বন্ধু, বালক, সখা প্রভৃতি পত্রিকা শিশু-কিশোর সাহিত্যের ভিত্তি গড়ে তোলে।

১৮৯৫ সালে শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত মুকুল শিশুদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যপত্রিকাগুলোর একটি। এতে গল্প, কবিতা, বিজ্ঞান, ইতিহাস, নীতিকথা ও শিক্ষামূলক নানা বিষয় প্রকাশিত হতো।

‘সন্দেশ’: বাংলা শিশু সাহিত্যের বিপ্লব

বাংলা শিশু-কিশোর পত্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম সন্দেশ। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতে এর সূচনা। পরে সুকুমার রায় এবং আরও পরে সত্যজিৎ রায় এই পত্রিকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

সন্দেশ শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, এটি ছিল শিশু-কিশোরদের কল্পনার জগৎ। এতে প্রকাশিত হয়েছে—

হাস্যরসাত্মক লেখা
বিজ্ঞানভিত্তিক রচনা
ছবি ও অলংকরণ
ধাঁধা
গল্প
ছড়া
অভিযানের কাহিনি

বাংলা শিশুসাহিত্যকে আধুনিক রূপ দিতে সন্দেশ-এর অবদান অনস্বীকার্য।

পূর্ববাংলায় শিশু-কিশোর পত্রিকার বিকাশ

ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলায় শিশু-কিশোর পত্রিকা প্রকাশ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রকাশনা অবকাঠামোর অভাব এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা এর অন্যতম কারণ।

তবু কিছু পত্রিকা শিশুদের সাহিত্যচর্চায় ভূমিকা রাখে। স্কুলভিত্তিক ম্যাগাজিন, সাহিত্যপত্রের শিশুপাতা এবং বিশেষ সংখ্যা শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকার সুবর্ণ সময়

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চা নতুন গতি পায়। স্বাধীনতার পর জাতি গঠনের অংশ হিসেবে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সময় শিশু-কিশোর পত্রিকার এক নতুন যুগ শুরু হয়।

কিশোর বাংলা

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নামগুলোর একটি কিশোর বাংলা। এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা। আশির ও নব্বইয়ের দশকে এটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

এর বিশেষত্ব ছিল—

সমসাময়িক বিষয়
রোমাঞ্চকর গল্প
বিজ্ঞানচর্চা
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখা
পাঠকের চিঠি
কিশোরদের লেখা প্রকাশ

অনেক লেখকের সাহিত্যজীবনের শুরু হয়েছিল কিশোর বাংলা-তে লেখার মাধ্যমে।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পত্রিকা
টাপুর টুপুর

ছোটদের জন্য আনন্দময় ও রঙিন উপস্থাপনায় জনপ্রিয়।

ঝিনুক

গল্প, ছড়া ও শিক্ষামূলক রচনার জন্য পরিচিত।

তোতা

কিশোরদের জ্ঞান ও বিনোদনের সমন্বিত পত্রিকা।

কচিকাঁচার আসর

শিশুদের সাহিত্যচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

শিশু

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রকাশিত একটি ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির অবদান

বাংলাদেশে শিশু-কিশোর সাহিত্য ও পত্রিকা বিকাশে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শিশু একাডেমি নিয়মিতভাবে—

শিশুতোষ বই প্রকাশ
পত্রিকা প্রকাশ
লেখালেখি প্রতিযোগিতা
চিত্রাঙ্কন আয়োজন
সাংস্কৃতিক কার্যক্রম

পরিচালনার মাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করছে।

শিশু-কিশোর পত্রিকার সামাজিক ভূমিকা

শিশু-কিশোর পত্রিকার কাজ শুধু বিনোদন দেওয়া নয়।

১. পাঠাভ্যাস গড়ে তোলে

নিয়মিত পত্রিকা পড়ার মাধ্যমে শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়।

২. ভাষার দক্ষতা বাড়ায়

সহজ, সুন্দর ও শুদ্ধ ভাষার চর্চা হয়।

৩. সৃজনশীলতা বাড়ায়

গল্প, কবিতা ও চিত্রকল্প শিশুদের কল্পনাশক্তি প্রসারিত করে।

৪. নৈতিক শিক্ষা দেয়

মানবিকতা, সততা, দেশপ্রেম শেখায়।

৫. নতুন লেখক তৈরি করে

পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেয়ে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী হয়।

ডিজিটাল যুগে সংকট

বর্তমানে শিশু-কিশোর পত্রিকা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

প্রযুক্তির প্রভাব

মোবাইল ফোন, ইউটিউব, গেমস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের মনোযোগ দখল করেছে।

মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধি

কাগজ ও ছাপার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে।

পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন

দীর্ঘ লেখা পড়ার আগ্রহ কমছে।

নতুন সম্ভাবনা: অনলাইন শিশু-কিশোর পত্রিকা

সংকটের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এখন শিশু-কিশোর পত্রিকা—

ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হচ্ছে
মোবাইল অ্যাপে পড়া যাচ্ছে
অডিও গল্প শোনা যাচ্ছে
ভিডিও কনটেন্ট যুক্ত হচ্ছে

এতে শিশুদের কাছে পৌঁছানো সহজ হচ্ছে।

কিশোর লেখা: নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল ঠিকানা বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিশোর লেখা একটি আশাব্যঞ্জক নাম। এটি কেবল একটি পত্রিকা নয়, এটি শিশু-কিশোরদের সাহিত্যচর্চার একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র। কিশোর লেখা প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৮৬ সাল থেকে। এবছর পত্রিকাটি ৪০ বছরে পা রেখেছে। 

কী আছে কিশোর লেখা-তে?
গল্প
কবিতা
ছড়া
প্রবন্ধ
বিজ্ঞান
ইতিহাস
মুক্তিযুদ্ধ
পরিবেশ
প্রযুক্তি
কিশোরদের নিজস্ব লেখা
বিশেষত্ব

নতুন লেখকদের সুযোগ
অনেক শিশু-কিশোর প্রথম লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে এখানে।

সমসাময়িক বিষয়
বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়।

সৃজনশীলতা বিকাশ
শিশুদের কল্পনাশক্তি ও চিন্তার পরিধি বাড়ায়।

মূল্যবোধ শিক্ষা
মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা দেয়।

কেন কিশোর লেখা গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের শিশুরা তথ্যের ভিড়ে বেড়ে উঠছে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক নয়।

কিশোর লেখা তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।
এটি শিশুদের শুধু পড়তে শেখায় না, ভাবতে শেখায়।

এখানেই এর গুরুত্ব।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বাংলাদেশে শিশু-কিশোর পত্রিকার বিকাশে কিছু উদ্যোগ জরুরি—

ডিজিটাল সংস্করণ জোরদার করা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত উপস্থিতি বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়ে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া, স্কুলভিত্তিক সাবস্ক্রিপশন চালু করা যেতে পারে।

লেখক তৈরির কর্মশালা

শিশুদের জন্য লেখালেখি প্রশিক্ষণ আয়োজন করা দরকার। চিত্রসমৃদ্ধ উপস্থাপনা, আকর্ষণীয় ডিজাইন শিশুদের আগ্রহ বাড়াবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকার ইতিহাস এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

মুকুল থেকে সন্দেশ, কিশোর বাংলা থেকে কিশোর লেখা—এই যাত্রা কেবল প্রকাশনার ইতিহাস নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের ইতিহাস। একটি ভালো শিশু-কিশোর পত্রিকা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে নীরব কিন্তু গভীর ভূমিকা রাখে।

কিশোর লেখা সেই আলোকবর্তিকা হয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছে স্বপ্ন, কল্পনা, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার আলো।

যতদিন শিশুরা স্বপ্ন দেখবে, ততদিন শিশু-কিশোর পত্রিকার প্রয়োজন থাকবে। আর সেই স্বপ্নকে ভাষা দেওয়ার জন্য কিশোর লেখার মতো পত্রিকাগুলো পথ দেখিয়ে যাবে।