ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০১, অক্টোবর ২০২৬ ৪:১৪:০৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে মমতা মেঝে বারান্দা করিডোরেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের জাতীয় কন্যা শিশু দিবস আজ অর্থায়ন কাটছাঁটে ঝুঁকিতে ৮৩ লাখ শরণার্থী: জাতিসংঘ সুপার এল নিনিয়ো: বিশ্বজুড়ে চরম বিপর্যয় ও প্রাণহানির শঙ্কা দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি

মেঝে বারান্দা করিডোরেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫৮ এএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ডেঙ্গু এখন শুধু বাড়ছে না, রীতিমতো ছুটছে। মঙ্গলবার এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৫৮ জন চলতি বছরে এক দিনে রোগী ভর্তির রেকর্ড। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ছয়জনের। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৩ জনে এবং আক্রান্ত হয় ৭৩ হাজার ৬৯৪ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের ২৮ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের। হাসপাতালগুলোয় রোগীর জায়গা হচ্ছে না; শয্যা না পেয়ে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। অথচ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় মোট কতটি শয্যা রয়েছে, ডেঙ্গুর মতো মহামারিসদৃশ পরিস্থিতিতে কতটি শয্যা ব্যবহার করা সম্ভব—তার সমন্বিত তথ্যই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। ফলে রোগীর ঢল সামলাতে হাসপাতালগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন কেন্দ্রীয়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০৬, ঢাকা দক্ষিণে ১৬৭ এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকায় ৪৩২ জন ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ২৬৭, চট্টগ্রামে ৩২৩, বরিশালে ২৫৪, রাজশাহীতে ১৯৭, ময়মনসিংহে ১১৫, রংপুরে ৬২ এবং সিলেটে ১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে আটজনের। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৩০ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭০ হাজার ২৫৮ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ হাজারের বেশি রোগী।

সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে চলতি সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি। এ মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের, চলতি বছরের অন্য যে কোনো মাসের তুলনায় যা অনেক বেশি। আগস্টে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬ এবং জুনে ১৩ জনের। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে।

রোগীর চাপের বাস্তব চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না হাসপাতালগুলোয়। ঢাকার মুগদা হাসপাতালে ৩৮ শয্যার একটি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৪৫ জন রোগী চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। রোগীর চাপ বাড়ায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে সাধারণ ওয়ার্ড, মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

বর্তমানে ঢাকার সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড শয্যা সংখ্যা কতটি জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার সহকারী পরিচালক ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ কর্নার করা হয়েছে, সেখানেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু রোগীদের জায়গা দিতে না পেরে হাসপাতালের করিডোর, বারান্দা ও অন্যান্য খালি জায়গায় চিকিৎসা দেওয়ার তথ্য এসেছে। অনেক রোগী একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা পাননি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় বর্তমানে ১ হাজার ৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে ৬৯টি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৭২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অন্তত ১০ শতাংশ শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রাখার নির্দেশ দিয়েছে। হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সক্ষমতা অনুযায়ী ডেডিকেটেড শয্যা বাড়াতেও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন যে হারে বাড়ছে, অনেক হাসপাতালেই সেই তুলনায় শয্যা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে রোগীদের একটি অংশকে শয্যার পরিবর্তে মেঝে কিংবা বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে শুধু শয্যা থাকলেই হবে না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, মনিটরিং সুবিধা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, স্যালাইন, ওষুধ এবং গুরুতর রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা। রোগীর চাপ যখন নির্ধারিত সক্ষমতার অনেক ওপরে চলে যায়, তখন চিকিৎসাসেবার মানও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই প্রতিদিন এক হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিলেন। তখনই বিশেষজ্ঞরা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। এখন সেই আশঙ্কাই বাস্তব রূপ নিচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন সেটিই ছিল এ বছরের সর্বোচ্চ। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে ২ হাজার ওপরে উঠেছে দৈনিক ভর্তি।

এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ার তাসনিম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফিস নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালে ৫ শতাংশ রোগী বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বড় সতর্কবার্তা হলেও, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তার স্পষ্ট চিত্র নেই। ডেঙ্গু মোকাবিলায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতার পাশাপাশি হাসপাতাল প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার শেষ পরিণতি এসে পড়ে হাসপাতালের দরজায়। আর সেখানে যদি রোগীর জন্য শয্যাই না থাকে, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা দিয়ে ডেঙ্গুর এই আগ্রাসন ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক রোগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেভাবে গ্রামে গ্রামে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে, আগামী ১০ বছরে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। আগে ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সরকারের একটি কর্মসূচি ছিল, এখন সেটিও নেই। ফলে রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।