ঢাকা, শুক্রবার ২৭, নভেম্বর ২০২০ ১৮:০৯:৫৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
করোনায় দেশে আরও ২০ মৃত্যু, শনাক্ত ২২৭৩ মুনীর চৌধুরীর জন্মদিনে গুগলের ডুডল বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত হলে হোয়াইট হাউস ছাড়বেন ট্রাম্প কোভিডে মৃত্যু বিশ্বব্যাপী ১৪ লাখ ৩০ হাজার ছাড়াল অ্যাস্ট্রাজেনিকার ভ্যাকসিন মূল্যায়নে ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশ

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ২৫ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:৪১ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২০ সোমবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে ৩টা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিস্তব্ধতা ভেঙে মহাসড়ক দিয়ে শাঁ শাঁ করে নাইট কোচ ছুটে চলছে। একটি মাত্র চায়ের দোকানে দু-তিন জন ক্রেতা বসে আছে। মহাসড়কের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৪ বছরের একটি কিশোরী। বাসের জন্য অপেক্ষায় সে। চোখেমুখে তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। হঠাৎ একটি পুলিশের পিকআপ এলো। পিকআপের ভিতর থেকে তিন পুলিশ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিশোরীর দিকে। কোথায় যাবে, এমন প্রশ্ন কিশোরীকে করল এক পুলিশ। কিশোরীটি জানাল দিনাজপুর তার মায়ের কাছে যাবে। মায়ের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে। মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিশোরীকে তাদের সঙ্গে পিকআপে তুলে নিল। কিছু দূর যাওয়ার পরই এই ভালোমানুষী চেহারার পশুগুলোর আসল রূপ উন্মোচিত হয়। রক্ষক তখন ভক্ষকের বেশে। পিকআপেই ধর্ষণের চেষ্টা। হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে গাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিশোরীটি। আবারও তাকে তুলে নেয়। দশমাইলের আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিশোরীকে নিয়ে যায় তারা। সেখানে উপর্যুপরি ধর্ষণ শেষে হত্যা করে কিশোরীকে। গাড়িতে কিশোরীর দেহ তুলে নেয়। চলন্ত গাড়ি থেকেই ছুড়ে ফেলে দেয় হতভাগ্য কিশোরীর নিথর দেহ। দিনাজপুরের সেই কিশোরী ইয়াসমিনের ঘটনা এটি।

পুলিশবেশী হায়েনার দল ইয়াসমিনকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যায়নি। মাকে দেখতে যে কিশোরী মেয়েটি ঢাকা থেকে ছুটে চলে এসেছিল একদম একা। ভয়ডর পেছনে ফেলে পৌঁছে গিয়েছিল মায়ের দোরগোড়ায়। কিন্তু মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া দূরে কথা, ১৪ বছরের ইয়াসমিনকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে পুলিশরূপী দুর্বৃত্তরা। শুধু তাই নয়, দুনিয়া থেকেই তাকে বিদায় করে দিয়েছে নির্মম নির্যাতন করে।

আজ সেই ২৪ শে আগস্ট। ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস। ২৫ বছর আগের এই দিনে কিছু উচ্ছৃঙ্খল বিপথগামী পুলিশ সদস্যের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ইয়াসমিন। পরে এই ঘটনার প্রতিবাদে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরও সাতজন। সেদিন থেকেই সারাদেশে একযোগে ২৪ আগস্ট ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

সেই সময় ইয়াসমিন ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সারা দেশ যেন কেঁপে উঠেছিল। কেঁপে উঠেছিল তৎকালীন সরকারের ক্ষমতার ভিতও। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডটি সর্বাধিক আলোচিত ঘটনা। ইয়াসমিনকে নিয়ে চলচ্চিত্র ও নাটক তৈরি হয়েছে। কবি, সাহিত্যিক ও লেখকরা ইয়াসমিনকে নিয়ে বহু লেখালেখি করেছেন। বই প্রকাশ করেছেন। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ইয়াসমিন ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। উত্তাল হয় গোটা দিনাজপুর। শান্ত মানুষ গর্জে ওঠে। গুলি চালায় পুলিশ। এতে জীবন দিয়েছেন অন্তত সাতজন। আর পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে অগণিত মানুষকে। কারফিউ দিতে হয় সরকারকে।

ইয়াসমিন হত্যার পর থেকে প্রতি বছর ২৪ আগস্ট ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ বা ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। পরে এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশের তিন সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মামলার বিচারের রায় কার্যকর করা হয়। পত্রিকাগুলোয় ইয়াসমিনের ঘটনাটি প্রকাশ হয় ধারাবাহিক প্রধান সংবাদ হিসেবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকার রিকশাচালক মৃত এমাজ উদ্দিন ও শরিফা বেগমের একমাত্র মেয়ে ইয়াসমিন বেগম। শহরের লালবাগ কোহিনূর স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত সে। বাবা মারা যাওয়ার পর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় ইয়াসমিনের। সংসারে অভাবের তাড়নায় মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৯২ সালে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে ঢাকায় যায়। সে আবুল আহসান আহমদ আলী নামের এক ব্যক্তির ঢাকার ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাসার এক পরিবারে গৃহপরিচারিকার কাজ করত। আবুল আহসান আহমদ আলীর গ্রামের বাড়িও দিনাজপুর। টানা তিন বছরে একবারও দিনাজপুরে মায়ের কাছে আসা হয়নি ইয়াসমিনের। তাই বাড়িতে আসার জন্য বিশেষ করে মাকে দেখার জন্য ভীষণ উতলা ছিল সে। গৃহস্বামী তাকে দুর্গাপূজার ছুটিতে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার জন্য উতলা ইয়াসমিন সে বাক্যে সান্ত্বনা পায়নি।

এ কারণে ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট ওই পরিবারের ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে একাই দিনাজপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যায়। সে উঠে পড়ে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওগামী নৈশ কোচ হাছনা এন্টারপ্রাইজে। ২৪ আগস্ট ইয়াসমিন রাত ৩টার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামে। কোচের সুপারভাইজার দশমাইল মোড়ের পান দোকানদার জাবেদ আলী, ওসমান গনি, রহিমসহ স্থানীয়দের কাছে কিশোরী ইয়াসমিনকে দিয়ে সকাল হলে মেয়েটিকে দিনাজপুর শহরগামী যেকোনো গাড়িতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা টহল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান সেখানে আসে। তারা মেয়েটিকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যায়। পরে ধর্ষণ ও হত্যা করে। পরদিন সকালে ইয়াসমিনের লাশ পাওয়া যায় দিনাজপুর-দশমাইল মহাসড়কে রানীগঞ্জ ব্র্যাক অফিসের সামনে। ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, পুলিশ হেফাজতে ধর্ষণ শেষে খুন হয় ইয়াসমিন। পুলিশের এ পৈশাচিক ঘটনা জানাজানি হলে দিনাজপুরবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের করে। দিনাজপুর কোতোয়ালি পুলিশ ‘একজন অজ্ঞাত পরিচয় যুবতীর লাশ উদ্ধার’ মর্মে ঘটনাটি সাজিয়ে থানায় একটি ইউডি মামলা ফাইল করে। লাশের তড়িঘড়ি ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বালুবাড়ি শেখ জাহাঙ্গীর গোরস্থানে দাফন করা হয়। লাশের কোনো প্রকার গোসল ও জানাজা হয়নি।

এখানে উল্লেখ্য যে উত্তর গোবিন্দপুর এলাকায় পড়ে থাকা ইয়াসমিনের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশ্যে কোতোয়ালি থানার এসআই স্বপনকুমার প্রকাশ্যে জনতার সামনেই লাশ উলঙ্গ করে ফেলেন, যা উৎসুক জনতার মাঝে ক্ষোভ সঞ্চার করে। এ নিয়ে পরদিন দিনাজপুরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের রহস্যময় আচরণ জনমনে কৌতূহল ও বিক্ষোভ শতগুণে জাগিয়ে তোলে। এক পর্যায়ে ২৬ আগস্ট স্থানীয় জনতা কর্তৃক রামনগর মোড়ে মিটিং আহ্বান করে প্রচার চালানোর সময় কোতোয়ালি থানা এলাকায় পুলিশ মাইক ভেঙে দেয়। এ ঘটনায় আশপাশ এলাকার লোকজন সংগঠিত হয়। সন্ধ্যার পরে রামনগর মোড়ে ইয়াসমিনের গায়েবি জানাজা শেষে রাত ১০টার দিকে প্রতিবাদী জনতা বিক্ষোভ মিছিলসহকারে কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে। ক্ষুব্ধ জনতা কোতোয়ালি থানার সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং সারা রাত থানা অবরোধ করে রাখে।

এ সময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে। এতে আট-দশ ব্যক্তি আহত হয়। ২৭ আগস্ট শহরে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই বেলা ১১টার দিকে ঘটনার প্রতিবাদ ও সব প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে একটি বিশাল মিছিল বের করলে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালালে সামু, কাদের ও সিরাজসহ সাতজন নিহত হন। আহত হয় তিন শতাধিক মানুষ। পরে বিক্ষুব্ধ জনগণ শহরের চারটি পুলিশ ফাঁড়ি জ্বালিয়ে দেয়। শহরের আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা (কারফিউ) জারি করা হয়। নামানো হয় বিডিআর। দিনাজপুর থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া : এসব ঘটনায় দিনাজপুরবাসীর পক্ষে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়; যার মধ্যে নিরাপত্তার কারণে ইয়াসমিন হত্যা মামলাটি দিনাজপুর থেকে স্থানান্তর করা হয় রংপুরে। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আবদুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মইনুল, কনস্টেবল আবদুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যান চালক অমৃত লাল বর্মণের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান, ১৯৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে রংপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এ ঘটনায় আন্দোলনকারী দিনাজপুরবাসীর ওপরে গুলি চালানোর অপরাধে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলা বর্তমানে দিনাজপুর বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

-জেডসি