ঢাকা, সোমবার ১৬, মার্চ ২০২৬ ১:০৫:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জমে উঠেছে শেষ সময়ের ঈদ বাজার শেষ হলো বইমেলা; ১৭ দিনে বিক্রি ১৭ কোটি টাকা ওমরাহ ভিসার সময়সীমা নির্ধারণ করল সৌদি আরব জাবি শিক্ষার্থী খুন, পুলিশ হেফাজতে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ৪২ জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ লাইলাতুল কদর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বলিউডের আশির দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মধু মালহোত্রা মারা গেছেন দেশে ভোজ্য তেলের কোনো সংকট নেই : বাণিজ্যমন্ত্রী

একজন সুখি মানুষের গল্প: শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:২৯ এএম, ১৯ নভেম্বর ২০২১ শুক্রবার

শান্তা মারিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক।

শান্তা মারিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক।

শিরোনামটি দেখে অনেকে হয়তো ভাবছেন কে এই সুখি মানুষ। আমি বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমি সেই সুখি মানুষ। স্রষ্টাকে ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা আমার প্রতি তাঁর অসীম করুণার জন্য।
আমার কি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আছে? না তা নেই। দিন আনি, দিন খাই। চাকরি না করলে চলা মুশকিল হয়ে দাঁড়াতো। লেখালেখি করি বটে, তবে লেখক হিসেবে নাম খ্যাতি, ভক্ত, পুরস্কার কিছুই নেই। 
সাংবাদিকতা করছি ২৫ বছর। কিন্তু সেলিব্রিটি সাংবাদিক হতে পারিনি। কেউ চেনেও না, জানেও না। ফেসবুকে অগণন ফ্রেন্ডস ফলোয়ার থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। 
তবু নিজেকে আমার সুখি মনে হয়। কারণ আমার যা আছে আমি তাতেই সন্তুষ্ট। হীরার গয়না নয়, গাউছিয়া থেকে কেনা একশ টাকা দামের গয়না পরেই আমি খুশি হয়ে উঠি। চারুকলার সামনে থেকে কাচের চুড়ি কিনতে পারলেই মনটা ভরে ওঠে।
বারান্দার টবে কয়েকটা মানি প্ল্যান্ট আর শাক পাতা ধরনের গাছ আছে। সেগুলোর পাতা মেলা দেখতে আনন্দ পাই। সকাল বেলা চড়ুই পাখিরা আসে রুটি খেতে। কি যে ভালো লাগে ওদের দেখতে। 
আমার কাছে মনে হয়, মানুষের অসুখি হওয়ার, হতাশ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর প্রতিযোগিতা। টাকার মোহ, খ্যাতির মোহ, যা আমার নেই তা পাওয়ার মোহ মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। 
সবাইকে সেলিব্রিটি হতে হবে, দেশবিদেশ বেড়াতে হবে, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, বাগানবাড়ি, বিএমডব্লিউর মালিক হতে হবে কেন? সবার সন্তানকে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে, বুয়েটে, মেডিকেলে বা বিদেশে লেখাপড়াই বা করতে হবে কেন? 
আমার কাছে আরও একটি বিষয় মনে হয়। আগে আমরা যাদের  সঙ্গে বন্ধুত্ব করতাম তাদের সুখঃদুখ সবই দেখতে পেতাম। ফলে একজন মানুষকে আমরা খণ্ডিত নয়, পুরোপুরি বুঝতাম। দেখতাম সব মানুষের জীবনেই সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা রয়েছে।
কিন্তু আজকাল আমরা দেখি মানুষকে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেখতে পাই তিনি দেশ বিদেশ বেড়াচ্ছেন, দামি রেস্টুরেন্টে খাচ্ছেন, স্পাউসের সঙ্গে সুখি সুখি চেহারায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার সন্তান দারুণ কৃতী, দারুণ প্রতিভাবান, তার বাড়িঘর ছবির মতো সাজানো। সেই তুলনায় নিজের অপ্রাপ্তি, নিজের দৈন্য, নিজের অশান্তি, অসুখ বড় হয়ে ওঠে। 
যে দম্পতিদের সুখি ভঙ্গিতে ছবিতে দেখা যায়, ঘরে কিন্তু তারাও ঝগড়া করে, তাদের মধ্যেও অনেক ফাটল, অনেক গ্যাপ, অনেক সমস্যা আছে। যাদের নামি রেস্টুরেন্টে বা বাড়িতে দামি খাবার খেতে দেখা যায়, কখনও কখনও তারাও কিন্তু ডিমভাজা দিয়ে ভাত খায়, তারাও অ্যাসিডিটিতে ভোগে। 
সকলেরই সমস্যাও আছে, সুখও আছে। এই ব্যালেন্সটা বোঝা দরকার। 
আবার বিপরীত চিত্রও আছে।
আমি আমার কয়েকজন ফেবু বন্ধুকে ক্রমাগত অভিযোগ, আর হা-হুতাশ করতেও দেখি। তারা ক্রমাগত চোখের জল ফেলছেন, ক্রমাগত সমস্যার কথা বলছেন। এর ওর বিরুদ্ধে নালিশ করছেন। জীবন নিয়ে তাদের অতৃপ্তি, অসন্তুষ্টি, অভাব, অনুযোগের আর শেষ নেই। 
তাদের স্ট্যাটাস দেখলে মনে হয় সমাজ, সংসার এমনকি বিশ্ব জগতের সকল সমস্যা সমাধানের ভার তাদের কাঁধে চাপানো আছে। সেই ভার বহন করতে গিয়ে তারা কুঁজো হয়ে গেছেন। তারা রোদ উঠলেও নালিশ করেন, বৃষ্টি পড়লেও ব্যাজার হন।
তাদের দেখে-শুনে, নিজেকে অনেক খেলো ও অসচেতন বলেও মনে হয়। আমি তো অগ্রহায়ণ মাসে বাতাসে ছাতিম ফুলের সুবাস পাই আর বর্ষায় জল ঝরার শব্দে গান শুনি। সব সময় সব ঋতুতে এই ঢাকা শহরে বসেও মন আনন্দে ভরে ওঠে। এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় বসে থাকলেও আরাম লাগে, নিজেকে সুখি মনে হয়। 
আর একলা লাগা? আগেও অনেকবার লিখেছি যে, আমার কখনও একা লাগে না। এত এত বই থাকতে একা হওয়ার সুযোগ কোথায়? তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ, জ্যাক লন্ডন, ডিকেন্স, বিভূতিভূষণ আছেন কি করতে? 
নষ্টনীড়ের ভূপতি বুঝেছিল, ‘সহজ সুখ সহজ নহে। যাহা মূল্য দিয়া কিনিতে হয় না, তাহা যদি আপনি হাতের কাছে না পাওয়া যায়, তবে আর কোনোমতেই কোথাও খুঁজিয়া পাইবার উপায় থাকে না।’ 
আমি কিন্তু উল্টো। খোঁজাখুঁজি না করে যা আছে, যা সহজে পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়েই সুখি হওয়ার চেষ্টা করি। এখনও সূর্যের আলো, চাঁদের জোছনা, আকাশের মেঘ, বৃষ্টি, হাওয়া বাতাসের জন্য কেউ পেটেন্ট দাবি করেনি, ট্যাক্সও দিতে হয় না। এখনও ক্ল্যাসিক সাহিত্যগুলো পাবলিক ডোমেইনে আছে। 
ভ্যানগঘের সূর্যমুখী দেখার জন্য নেদারল্যান্ডসে না গিয়েও নেটে দেখা যায়। কিছুটা হলেও জানা যায়। আমি তাতেই সুখি হই। 
শোক, দুঃখ, রোগ, আত্মীয় বিয়োগ, ব্যর্থতা কি আমার জীবনে নেই? আছে। শৈশব থেকে চিরসঙ্গি দাঁত ব্যথাও আছে। কিন্তু এগুলোকে আমি সহজভাবেই গ্রহণ করি। এগুলো হলো বেঁচে থাকার মাশুল। যেমন রোজগার করলে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়, তেমনি বেঁচে থাকলে কষ্ট সহ্য করতে হয়।  তারপরও তো ভালো থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। আনন্দও ছেঁকে নিতে হবে দুঃখ থেকে। 
সুখ কোন অলীক বস্তু নয়। ‘আসলে কেউ সুখি নয়’ কথাটি ভুল। বরং সকলেই সুখি হতে পারে, যদি জানে সহজে সুখি হওয়ার উপায়।

শান্তা মারিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক।