ঢাকা, বুধবার ১৮, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০:৪৫:৫৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মা-বাবার কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাল সচিবালয়ে অফিস করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুপার এইটে জিম্বাবুয়ে, অস্ট্রেলিয়ার বিদায় বুধবার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে কাজ করবো: রুমিন ফারহানা শপথ নিলেন ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিলেন তারেক রহমান

কবির বিদায় এবং একজন রিপোর্টারের স্মৃতি

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:৫৪ পিএম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার

কবি শামসুর রাহমান

কবি শামসুর রাহমান

আমাদের দেশের অন্যতম কবি শামসুর রাহমান—এই নামটা শুধু সাহিত্য নয়, আমার নিজের জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অনেকটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে।

তিনি যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন প্রায় এক মাস ধরে তাঁর খবর করতে হয়েছে আমাকে। প্রতিদিন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ঢুকতাম এক অদ্ভুত দ্বিধা নিয়ে—আমি কি আজ কবির স্বাস্থ্যের উন্নতির সংবাদ দেব, নাকি অবনতির? রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব ছিল তথ্য জানানো, কিন্তু মানুষ হিসেবে বুকের ভেতর জমে থাকত অজানা ভয়।

হাসপাতালের করিডোরে তখন কবিকে ঘিরে একটা নিঃশব্দ ভিড় থাকত। কবির স্বজনেরা, চিকিৎসকেরা, আর আমরা কয়েকজন সাংবাদিক—সবার চোখেই থাকত একই প্রশ্ন: কবি কি সুস্থ হয়ে উঠবেন?

আমি বহুবার তাঁকে দূর থেকে দেখেছি। বিছানায় শুয়ে থাকা সেই মানুষটিকে দেখে মনে হতো—এই শরীরটা দুর্বল হয়ে গেলেও তাঁর কবিতার শক্তি যেন হাসপাতালের দেয়াল পেরিয়ে ছড়িয়ে আছে। নার্সেরা খুব সম্মানের সঙ্গে কথা বলতেন, চিকিৎসকেরাও আলাদা যত্ন নিতেন। কবি তখন আর কবিতা লিখতে পারছেন না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতিই যেন পুরো ওয়ার্ডটাকে নীরব করে রাখত।

প্রতিদিন খবর বানাতে গিয়ে আমাকে লিখতে হতো—‘শামসুর রাহমানের অবস্থা অপরিবর্তিত’, ‘কিছুটা উন্নতি’, ‘চিকিৎসকেরা সতর্ক’। কিন্তু এই নিরপেক্ষ বাক্যগুলোর আড়ালে আমার নিজের ভেতরে চলত এক যুদ্ধ। আমি চাইতাম, কোনো একদিন শিরোনাম লিখব—‘শামসুর রাহমান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন’। সেই শিরোনাম আর লেখা হয়নি।

যেদিন তিনি মারা গেলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশটা আজও চোখে ভাসে। সকালের আলো ঠিকমতো ঢোকেনি, তার আগেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল—কবি আর নেই। আমি তখনও কলম হাতে। কিন্তু সেদিন কলমটা যেন ভারী হয়ে গিয়েছিল। একজন জাতীয় কবির মৃত্যুর খবর লিখছি, অথচ মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের খুব পরিচিত কাউকে হারালাম।

হাসপাতালের করিডোরে কান্না ছিল না খুব বেশি, কিন্তু ছিল এক ধরনের শূন্যতা। মনে হচ্ছিল, একটা যুগ শেষ হয়ে গেল। যে মানুষটা শহরের শব্দ, রাজনীতি, প্রেম আর প্রতিবাদকে কবিতায় ধরে রেখেছিলেন, তিনি নিঃশব্দে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে চলে গেলেন।

আজ এত বছর পরও মনে পড়ে, প্রায় এক মাস ধরে তাঁর চিকিৎসার খবর করতে করতে আমি আসলে ধীরে ধীরে তাঁর বিদায়ের জন্য নিজেকেই প্রস্তুত করছিলাম—যদিও সেটা বুঝিনি তখন। সংবাদ ছিল আমার কাজ, কিন্তু স্মৃতি হয়ে গেছে আমার জীবনের অংশ।

শামসুর রাহমান শুধু কবি নন, আমার কাছে তিনি হাসপাতালের করিডোরে দেখা পাওয়া এক নীরব মানুষ, যাঁর জীবন শেষ হলো চিকিৎসাধীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর আমি, একজন রিপোর্টার হিসেবে, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে রইলাম।