ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১২:০৪:২৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
৪ অঞ্চলে‘অতি ভারী’বৃষ্টির পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা চারদিন পর বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা ভারতে ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন বাড়ছে, আন্দোলনে সংসদ অচ জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার

জামালপুরের নকশিকাঁথা এগিয়ে নিচ্ছে নারীরা

আপডেট: ১০:২০ এএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৩ মঙ্গলবার

Jamalpurস্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম জামালপুর : নকশিকাঁথা জামালপুরের বিত্তহীন দরিদ্র নারীদের আত্নবিশ্বাসী করে তুলেছে। স্বউদ্যোগে নকশিকাঁথা বুনিয়ে স্বাবলম্ভী হচ্ছে হতদরিদ্র নারীরা। হাতের কারুকাজ করা নকশীকাঁথা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। জেলায় ইতোমধ্যে ১০ হাজার নারীর আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। নারীদের সূচীকর্মের নান্দনিক ঐতিহ্য নকশিকাঁথা এখন শুধু ব্যবহারের জন্যই নয়, মানুষের কাছে সৌখিন ও সৌন্দর্যের উপাদানে পরিণত হয়েছে। বিত্তহীন দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্ভী হওয়ার পথ দেখিয়েছে সূচীকর্ম। নকশিকাঁথার ঐতিহ্যকে লালন করে হস্তশিল্পের প্রসার ঘটেছে জামালপুরে। নান্দনিকতার ছাপ পড়েছে হস্তশিল্পেও। নকশিকাঁথা পাশাপাশি পরিধানের বস্ত্র হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে নারীদের হাতের করুকাজ করা থ্রীপিছ, শাড়ি, ওড়না, বেড কভার, কুশন কভার, ওয়াল মেট, বালিশের ওয়ার, শাল ও চাদর। নকশিকরা পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টিসার্ট গেঞ্জিসহ নানা রকমের পরিধানের বস্ত্রের প্রতিও আকর্ষণ বেড়েছে। চাহিদার ব্যাপ্তি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দিনে দিনে বস্ত্র খাতে নকশিকাঁথা তথা হস্তশিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটছে। একসময় বাঙ্গালি নারীরা স্বভাবজাতভাবে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সংসারের যাবতীয় কাজকর্মের ফাঁকে মনোযোগ দিত সূচীকর্মে। শাড়ির পাড়ের সুতা তুলে তা দিয়েই রুমাল, কাঁথা ও বালিশের ওয়ার বুনত। যুগ যুগ ধরে সৌখিনতাবশত নারীরা সূচীকর্মের কাজ করে আসছে। মেয়ের বিয়ের জন্য নকশিকাঁথা বুনিয়ে রাখার রেওয়াজ চলে আসছে দীর্ঘকাল থেকেই। কিন্তু আজ দিন বদলের সঙ্গে নারীদের সূচীকর্মের ব্যবসায়ীক বিস্তার ঘটেছে। সূচীকর্ম আজ আর কোন সৌখিন কাজ নয়, উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নারীদের মনে স্বাবলম্বী হওয়ার আতœবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছে। অনেক নারীই ব্যবসায়িক সাফল্য বয়ে এনে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং আরও অনেক নারী ভবিষ্যতে স্বচ্ছল হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। নকশিকাঁথা বুনিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জামালপুর শহরের কাচারীপাড়ার আঞ্জুমান আরা আলম। বিএড পাস করে তিনি চাকুরি নামক সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে মাত্র দেড় হাজার টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে সূচীকর্মে ব্যবসায় শুরু করেন। আজ তিনি বিশাল এক কর্মযজ্ঞের নজির স্থাপন করেছেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে গড়ে তুলেছেন কমিউনিটি অ্যাকশন ম্যানেজমেন্ট পার্টফর্ম(ক্যাম্প) নামে একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে আঞ্জুমান আরার ক্যাম্পে নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছে অন্তত ৭শ’ নারীকর্মী। তারা মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা রোজগার করছে। আঞ্জু’র মতো আরও অনেক নারীই সূচীকর্মের ব্যবসায় সাফল্য বয়ে এনেছেন। এদের প্রচেষ্টায় জামালপুরে গড়ে উঠেছে প্রায় ২শ’ হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রওজা কারুশিল্প, কারুনীড়, প্রত্যয় ক্রাফট্, রঙধনু, দোলনচাঁপা, সূচীকা, শতদল, তরঙ্গ, উত্তরণ, মহিলা কল্যাণ সমিতি, দ্বীপ্ত কুটির, বুনন, স্বর্ণালী হস্তশিল্প, হৃদি হস্তশিল্প, ইলাহ হস্তশিল্প, প্রতিক, জাগরণ, সৃজন, আনিকা, মিমন ও মাহিম হস্তশিল্প প্রভৃতি। সত্তরের দশকে জামালপুরের হস্তশিল্প প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এই শিল্পটিকে আশির দশকে পুণরুদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে ব্র্যাক। ব্র্যাকের আয়শা আবেদ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জামালপুরে প্রথম বিত্তহীন দরিদ্র নারীদের সূচীকর্মের প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জামালপুর পৌর এলাকার উত্তর কাচারীপাড়ার দরিদ্র পারুল ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে স্বউদ্যোগে সূচীকর্মের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে পারুল নিজেই ২শ’ নারীকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগিয়েছেন। তার ওখানে সূচীকর্মের কাজ করে নারীকর্মীরা মাসে একেকজন ৫শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন। তবে প্রত্যয় ক্রাফটের পরিচালক মোর্শেদা হুদা প্রথম দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশে জামালপুরের নকশিকাঁথা ও হস্তশিল্পের পরিচয় তুলে। তিনি অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ভারত ও দুবাইয়ে বাণিজ্যমেলা ও প্রদর্শনিতে অংশ নেন। সারা জেলায় এখন কমপক্ষে ১০ হাজার নারী কর্মী সূচীকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। যাদের অধিকাংশই বিত্তহীন দরিদ্র। সূচীকর্ম তাদের উপার্জনের অবলম্বন হয়ে দাড়িয়েছে। এসব নারীকর্মী অত্যন্ত দক্ষ হাতে আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে নকশিকাঁথায়। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যকে। দেশে-বিদেশে নকশিকাঁথাসহ হস্তশিল্পের চাহিদা পূরণ করছে জামালপুরের সূচীকর্মীরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা জামালপুরে এসে কর্মীদের বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে নকশিকাঁথা বুনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু নকশিকাঁথাই নয়, তার সঙ্গে যাচ্ছে, থ্রী-পিস, শাড়ি, ওড়না, চাদর, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ওয়ালম্যাট, কুশনকভার, মাথার ব্যান্ড, পার্স, ফ্লোর কুশন ইত্যাদি। জামালপুরে বেড়াতে এসেও অনেকে প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার জন্য নকশিকাঁথা এবং হাতের কারুকাজ করা পোশাক কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে এসব রফতানি হচ্ছে, ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে। জামালপুর শহর ছাড়াও ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বড় বিপনণ কেন্দ্রেও পাওয়া যাচ্ছে জামালপুরের নকশিকাঁথা। জামালপুরে একটি নকশিকাঁথা বিক্রি হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। দেশের বড় বড় মার্কেটের বিপনণ কেন্দ্রে অথবা শো-রুমে সেই কাঁথা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে। একটি কাঁথা বুনতে ৪ জন নারীকর্মীর অন্তত: ২০ দিন সময় লাগে। তারা মজুরি পান প্রতি কাঁথার জন্য ৮৫০ থেকে ১৪০০ টাকা। কাঁথা বুনতে মোট খরচ পড়ে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা। সাদা কাঁথার জন্য মার্কিন অফ হোয়াইট এবং রঙ্গিন কাঁথার জন্য থাই কটন কাপড় ব্যবহার করা হয়। নকশিকাঁথা শিল্পকে ঘিরে অত্যাবশ্যকীয় উপকরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে জামালপুর শহরে। এসব ব্যবসায় অনেকের বেকারত্ব ঘুচিয়েছে। নকশিকাঁথাসহ সূচীকর্মের নানা রকম হস্তপণ্যের ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ও সম্ভাবনা নিয়ে জামালপুরের নারীরা খুবই আশাবাদী। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকে সাফল্য বয়ে আনতে পারছেন না। অনেকেই প্রতারিত হয়ে পুঁজি খোয়াচ্ছে। আবার অনেক নারীকর্মীর অভিযোগ, তারা শ্রমের ন্যায় মজুরি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যস্বত্বভোগীদের   দৌরাত্ন্য রয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। সরকারি উদ্যোগ-সহায়তার প্রয়োজনিয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ক্যাম্পের পরিচালক আঞ্জুমান আরা আলম বলেন, ‘সরকার উদ্যোগ নিলে গার্মেন্টস শিল্পের পাশাপাশি হস্তশিল্পেরও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব।’ তিনি হস্তশিল্পের পণ্যকে রফতানি পণ্যের তালিকাভূক্ত করার দাবি জানান। এদিকে হস্তশিল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকায় ঢাকাস্থ জামালপুর সমিতিও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সমিতির উদ্যোগে জামালপুরে কারুপলী গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ৭ অক্টোবর’২০১৩