ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১৩:১৯:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
উত্তাল দিল্লি, বিশেষ ঘোষণা মোদির টানা বৃষ্টিতে তছনছ কৃষি-অর্থনীতি ৪ অঞ্চলে‘অতি ভারী’বৃষ্টির পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা চারদিন পর বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা

তেলাপোকা

আপডেট: ১০:২২ এএম, ২৫ অক্টোবর ২০১৩ শুক্রবার

Telapokaজসীম আল ফাহিম আমার পড়ার ঘরে অনেকক্ষণ ধরে বড়সড় একটি তেলাপোকা ওড়াউড়ি করছে। তেলাপোকার ওড়াউড়িটা তেমন কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা হলো তেলাপোকাটা এদিক ওদিক উড়ে আমার শরীরে এসে বসতে চায়। আমি তেলাপোকাকে ভয় পাই না। তবু উড়ে এসে বারবার আমার শরীরের ওপর হামলে পড়লে কার ভালো লাগবে? ব্যাপারটা নয় কি? শুধু কি তাই। সে বারবার আমার কানের কাছে এসে পনপন করে বলে, জীবন মানে কি কেবল বেঁচে থাকা? ওর এমন প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হই। হ্যাঁ-না কিছুই বলি না। বলব কেন? আমি একজন মানুষ। আর সে সামান্য একটা পতঙ্গ। মানুষ হয়ে পতঙ্গের কথা শোনার কথা না। তবু আমি শুনতে পাচ্ছি। শুনতে পাচ্ছি বলেই আমাকে সামান্য একটা পতঙ্গের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে নাকি? কিন্তু তেলাপোকাটা দেখছি একেবারে নাছোড়। প্রশ্নের জবাব যেন দিতেই হবে। না দিলে আমাকে সে জ্বালাপালা করা থামাবে না। কী করি এখন! শেষে বললাম, না। জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়। তেলাপোকাটা এবার ওড়াউড়ি থামিয়ে আমার সামনে দেয়ালের ওপর গিয়ে বসল। তারপর মিহি কণ্ঠে বলল, তাহলে জীবন মানে কি? আমি বললাম, জীবনের অনেক মানে হতে পারে। তবে আমি মনে করি সুখ-দুঃখ, শোক-জরা, হাসি-আনন্দ, আশা-হতাশা, স্বপ্ন এসবের সমষ্টিই জীবন। আমার জবাব শুনে তেলাপোকাটা হিহি করে হেসে উঠল। ওর হাসি শুনে মনে হল, আমার কথা সে মানতে পারছে না। আমাকে উপহাস করছে। সামান্য একটা তেলাপোকা আমাকে উপহাস করছে ভেবে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মুখ খিঁচিয়ে বললাম, গাধার মতো হাসছিস কেন? না হলে নেই। যা ভাগ। তেলাপোকাটা এবার আরও জোরে হেসে উঠল। ওর এমন হাসিতে আমার খুব রাগ হল। শেষে কি করি-বলি, তবে রে বেটা হাঁদারাম। দাঁড়া। মজা দেখাচ্ছি......। আমার ধমক শুনে তেলাপোকাটা দিগি¦দিক ছুটতে শুরু করল। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। সামান্য একটু উড়ে গিয়েই মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেল। আমিও নিজের শরীরের তাল ঠিক রাখতে পারলাম না। ওর ওপর এসে আছড়ে পড়লাম। আমার বাম পা-টা তেলাপোকাটার ওপর এসে পড়ল। সেই সঙ্গে ‘পুশ’ করে একটা শব্দ হল। পা তুলে দেখলাম চ্যাপ্টা হয়ে গেছে বেচারা। তেলাপোকার এমন দশা দেখে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ওর জন্য খুব মায়া হল। আমি তো ইচ্ছে করে ওকে মারতে চাইনি। তাড়া করেছিলাম মাত্র। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর ওপর পা পড়ে গেছে। এখন আমি কী করব? ভাবলাম মরে গেছে তো গেছেই। মৃত জিনিসকে তো আমি আর জীবিত করে দিতে পারব না। তবু নিজেকে খুব অপরাধি মনে হল। সে রাতে আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারলাম না। আশ্চর্য এক স্বপ্ন দেখে মাঝরাতে জেগে উঠলাম। তেলাপোকাটা স্বপ্নে আমাকে বলছে, জীবন সম্পর্কে তোমার ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।জীবন মানে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। স্বপ্নটা দেখে আমি রীতিমত ‘থ’ হয়ে গেলাম। ভেবে দেখলাম, ও তো ঠিক কথাই বলছে। কিন্তু ওর তো এসব কথা জানার কথা না। পরে বিছানায় একটু এপাশ ওপাশ করতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। কিছু সময় পর আবারও একটি স্বপ্ন দেখলাম। এবার দেখলাম, তেলাপোকাটা চিৎ হয়ে বাইরে পড়ে আছে। ওর পাগুলো কিলবিল করে নড়ছে। কিছু একটা ধরতে চেষ্টা করছে বেচারা। কিন্তু ধরতে পারছে না। ধরতে পারলে হয়ত স্বাভাবিক হতে পারত। এমন অবস্থায় আমাকে দেখে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে। মরতে পারছি না। আমাকে মেরে ফেল। মুক্তি দাও। স্বপ্নটা দেখে এবার আমি লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, বিষয় কি? তেলাপোকাটা কি এখনও বাইরে পড়ে আছে নাকি? ও কী এখনও মরেনি? ভেবে দোর খুলে আমি বাইরে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘটনা সত্যি। তেলাপোকাটা ঠিক ঠিক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। একটু একটু নড়াচড়া করছে। তবে অবস্থা বিশেষ ভালো না। ওর চারপাশ ঘিরে আছে একঝাঁক লাল পিঁপড়া। পিঁপড়ারা কামড়ে ওকে দুর্বল করতে চাচ্ছে। পিঁপড়ার কামড় খেয়ে তেলাপোকাটা মিহি সুরে বাবা গো, মা গো, মরে গেলাম গো, বাঁচাও গো বলে চিৎকার করছে। এপাশ ওপাশ করছে। ডিগবাজি খেতে চেষ্টা করছে। কিন্তু পিঁপড়াদের কামড় কিছুতেই থামছে না। আমি এগিয়ে গিয়ে তেলাপোকাটার কাছাকাছি বসলাম। খুঁটিয়ে দেখলাম ওকে। মনে হল উপুড় করে দিলেই বুঝি সে বেঁচে যাবে। উড়ে যেতে পারবে। ভেবে আমি ওকে উপুড় করে দিলাম। উপুড় করে দিতেই পিঁপড়াগুলো কিছুটা সরে গেল। কিন্তু তবু সে উড়তে পারছে না। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমি ফুঁ দিয়ে পিঁপড়াগুলোকে অরও দূরে সরিয়ে দিলাম। তেলাপোকাটা কোনও কথা বলতে পারছে না। শুধুই কোঁকাচ্ছে। উহ্ আহ্ করছে। বুঝলাম ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাবলাম, এভাবে বেঁচে খাকার কোনও মানে হয়? এর নাম তো জীবন নয়। এভাবে বেঁেচে থেকে শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছে বেচারা। ওর এখন বাঁচা মরা সমান কথা। ভাবতেই আমার দ্বিতীয় স্বপ্নটির কথা মনে পড়ে গেল। আমার কানে স্পষ্ট বাজতে লাগল, খুব কষ্ট হচ্ছে। মরতে পারছি না। আমাকে মেরে ফেল। মুক্তি দাও। আমি তখন পায়ের জুতো দিয়ে ওকে চেপে ধরে মেরেই ফেললাম। ওকে কষ্টময় জীবন থেকে মুক্তি দিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনটা বিষণœতায় ভরে গেল। এ আমি কী করলাম! মুমুর্ষু একটি প্রাণীকে মেরে ফেললাম! তেলাপোকাটার জন্য আমার খুব কান্না পেল। দুচোখ জলে ভরে উঠল। সামান্য একটা তেলাপোকার জন্য আমি অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলাম। কান্নাকাটির একপর্যায়ে হঠাৎ আমি চেয়ে দেখলাম, হাজার হাজার পিঁপড়া এসে তেলাপোকাটিকে ঘিরে ধরেছে। যে যেভাবে পারছে উল¬াস করে তেলাপোকার প্রাণহীন শরীরটাকে কামড়ে খাচ্ছে। তৃপ্তি করে খাচ্ছে। কেউ কেউ বলছে, এমন একটা খাবার আমাদের জোগাড় করে দেওয়ার জন্য স্রষ্টাকে ধন্যবাদ। লাখো কোটি শোকর। পিঁপড়াদের উল¬াস দেখে এবং প্রার্থনা শুনে সহসা আমার কান্না থেমে গেল। আশ্চর্য এক মুগ্ধতায় ভরে উঠল আমার মন। মনে হল মুমুর্ষু তেলাপোকাটিকে মেরে আমি কোন অন্যায় করিনি। ওকে মেরে ওর কষ্টময় জীবন থেকে আমি মুক্তি দিয়ে দিয়েছি। আমি আসলে নিজ থেকে কাজটি করিনি। স্রষ্টার প্রতিনিধি হয়ে এ কাজ করেছি। একটা প্রাণের বিনিময়ে হাজারটা প্রাণের ক্ষুধা নিবারণ করেছি। হাজারটা প্রাণকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।