ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ৩:২৩:২৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সারা দেশে অবাধে শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ নিবন্ধন নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ দফা সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ ইরানের পরিস্থিতি খারাপ হলে কঠোর হবে তুরস্ক

নির্বাচনে নারী প্রার্থী নেই ৩০ দলের

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:১৮ এএম, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ রবিবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই—নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। 

এই পরিসংখ্যান এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা তুলে ধরছে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও প্রার্থী তালিকায় তাদের উপস্থিতি নগণ্য। 

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন অর্থাৎ মাত্র ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে ৭২ জনকে বিভিন্ন দল মনোনীত করেছে, বাকিরা স্বতন্ত্র।

বড় ও ছোট বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও কেবল পুরুষ প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিয়েছে। এতে করে পুরো রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা মূলত প্রতীকী ও সীমিত—নারী অধিকারকর্মীদের এমন অভিযোগই আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

বিএনপিসহ কোনো দলই ১০ জনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেয়নি, যা অন্তর্ভুক্তির এসব উদ্যোগ কতটা সীমিত ও প্রতীকী—তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নারী প্রার্থী ছাড়াই ২৭৬টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। যদিও দলটির নেতারা প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, দলের নেতৃত্বের কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারী। এরপরই আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের ২৬৮টি মনোনয়নে কোনো নারী প্রার্থী নেই।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (৯৪), খেলাফত মজলিস (৬৮) ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টসহ (বিআইএফ) (২৭) অন্য দলগুলোও একইভাবে নারীদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পুরুষদের প্রার্থী করেছে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ২৪ জন, জনতার দল ২৩, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট ২০ ও বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮ জনকে প্রার্থী করেছে। তাদের মধ্যে কোনো নারী নেই।

জাতীয় পার্টি (জেপি) (১৩), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (১১), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (৯) ও বাংলাদেশ জাসদ (৯) নারীদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়েছে।

জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (৮), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (৮), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল (৭), জাকের পার্টি (৭), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি (৬) এবং গণফ্রন্টেরও (৬) কোনো নারী প্রার্থী নেই। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (সিরাজুল) (৫) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশেরও (৫) কোনো নারী প্রার্থী নেই

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা (৩), ইসলামী ঐক্য জোট (৩), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (৩), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি - বিজেপি (পার্থ) (৩) ও বাংলাদেশ উন্নয়ন পার্টির (২) মনোনয়নে নারী নেই।

তালিকায় নিচের দিকে থাকা গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ এবং বাংলাদেশ সমাধিকার পার্টি প্রত্যেকে মাত্র একজন করে প্রার্থী দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউই নারী নন।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখনো অনেক পুরুষতান্ত্রিক।

তিনি বলেন, 'নির্বাচন নারীবান্ধব নয়।' তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় রাজনৈতিক দলগুলো খুব অল্পসংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দেয়, আর ছোট দলগুলো তাদেরই অনুসরণ করে।

তিনি আরও বলেন, আর্থিক বাধা, সামাজিক মানসিকতা এবং তথাকথিত 'পেশিশক্তি'র অভাব নারীদের নির্বাচনে অংশ নিতে আরও নিরুৎসাহিত করে।

জেসমিন টুলী বলেন, 'যে নারীরা সামনে আসেন, তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন বা সক্রিয়তার মাধ্যমে উঠে আসা নারীর সংখ্যা খুবই কম।' 

তিনি যোগ করেন, দলগুলো নারীদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে বা দলীয় কমিটিতে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতেও ব্যর্থ হয়।

তিনি বলেন, 'আন্দোলনের সময় নারীরা দৃশ্যমান থাকেন, কিন্তু নির্বাচনের সময় তাদের কোণঠাসা করা হয়। দলগুলো চাইলে নারীদের আর্থিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু নীতিগত পর্যায়েও এমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।'

যে ২১টি দল নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, সেখানেও সংখ্যা খুব বেশি নয়। জাতীয় পার্টি (জি এম কাদের) ও সদ্য নিবন্ধিত বাসদ (মার্ক্সবাদী)—দুটি দলই ৯ জন করে নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একজন নারীর নেতৃত্বে থাকা বিএনপি ৩০০ আসনের জন্য ৩২৮ জন আগ্রহী প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলটি আবার বেশ কয়েকটি আসনে একাধিক নেতাকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে বলেছে।

জাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ ও এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল প্রত্যেকে তিন থেকে ছয়জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

নারীদের জোরালো অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দলগুলোও নারীর অন্তর্ভুক্তিতে সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের নেতাদের গড়া এনসিপি তাদের ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

১৯৭২ সালের 'গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)' অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ দলীয় কমিটির অন্তত ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে।

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের সভাপতি মুনিরা খান এই পরিস্থিতিকে 'ভীষণ হতাশাজনক' বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, 'নারীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং জনসংখ্যার অর্ধেক হলেও সংসদীয় মনোনয়নে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা সবসময় গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের এই চিত্র গভীরভাবে হতাশাজনক।'

একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলগুলোর কাঠামোয় নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার যে নিয়ম রয়েছে, তা আদৌ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় কি না।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক বলেন, নারীদের স্বল্প প্রতিনিধিত্বের এই চিত্র তাকে 'হতাশ করলেও বিস্মিত করেনি।'

তিনি বলেন, 'এই পরিস্থিতি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।'

এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা থেকেই কমিশন ৫০–৫০ প্রতিনিধিত্বের একটি মডেল প্রস্তাব করেছে বলে জানান শিরীন হক। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে একটি সাধারণ আসনের পাশাপাশি নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংসদের সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৬০০ হবে, যেখানে সংরক্ষিত আসনগুলোতে নারীরা নারীদের বিপক্ষেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।