ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০২, ডিসেম্বর ২০২১ ৪:১৮:২৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ভারত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত স্থগিত ব্রাজিলে করোনার নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ শনাক্ত ২৩ দেশে ছড়িয়েছে ওমিক্রন,৭০ দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা কাল শুরু এক দিনে করোনায় শনাক্ত ২৮২, মৃত্যু ২

পরচুলা তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ময়মনসিংহের নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৪৩ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০২১ শনিবার

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

চুল ঝরে পড়লে নারী-পুরুষ উভয়েরই সৌন্দর্যের ছন্দপতন ঘটে। হারানো সৌন্দর্যের প্রতীক ফেরাতে টাক মাথায় ব্যবহার করা হয় পরচুলা। আর এই পরচুলাই দিনে দিনে জায়গা বাড়িয়ে নিচ্ছে বাজারে। চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পরচুলা তৈরির জন্য এখাতে শিল্পও গড়ে উঠেছে। সম্ভাবনাময় এই ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ঘটেছে ময়মনসিংহ জেলাজুড়ে।

ময়মনসিংহের জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম ঘুরে এই ক্ষুদ্র শিল্পের কাজ করতে দেখা গেছে গৃহিণী, কিশোরীসহ বেকার নারীদের। পরচুলা তৈরি করে সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন অনেক নারী। বেকার নারীরা পরচুলা শিল্পে কাজ করে মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। কেউ আবার নেতৃত্ব দিয়ে ২০-২২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের মাথার চুল বড় হলে কেটে ফেলা হয়। এই চুল আগে আবর্জনার আকারে ফেলে দেওয়া হতো। এখন সেই চুল রপ্তানিতে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। দিন দিন বিদেশের বাজারে চুলের চাহিদাও বাড়ছে। মানুষের কেটে ফেলা চুল দিয়েই এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে।

চাহিদা অনুসারে তিন প্রকারের পরচুলা তৈরি হচ্ছে দেশে। বড় পরচুলা তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। আকারভেদে এ ধরনের প্রতিটি পরচুলা তৈরির মজুরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। তবে করোনা মহামারির কারণে পরচুলা তৈরির মজুরি কমেছে।

গফরগাঁও বড়াইল এলাকায় এক গ্রামের প্রায় তিনশ নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সেখানকারই পরচুলা শিল্পী আকলিমা আক্তার (২৯)। স্বামী দিনমজুর নিজাম উদ্দিন। টানাপোড়েনের সংসারে স্বামীর একার আয়ে নুন আনতে পানতা ফুরায় দশা। সংসারের অভাব অনটন দূর করতে তাই এক বছর আগে পরচুলা তৈরির কাজ শেখেন আকলিমা। এখন পরচুলা শিল্পী বনে গেছেন তিনি।


গফরগাঁও পাচুয়ার সাবের খাঁ বাড়িতে নারী জাগরণের ব্যানারে প্রায় ৩০০-৪০০ নারী পরচুলা তৈরির কাজ করছেন। এখানে নানা ধরনের পরচুলা তৈরি হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছোট চুলের ক্যাপ। বাংলাদেশে এই ক্যাপের চাহিদা অনেক। সাধারণত যেসব ছেলেদের মাথায় চুল নেই তারা এটা ব্যবহার করেন। ছোট চুলের ক্যাপের চাহিদা ভারতেও বাড়ছে।

পরচুলা দিয়ে সাইড স্কালও তৈরি হয়। সাধারণত যেসব পুরুষের মাথায় চুল নেই তারা সাইড স্কাল ব্যবহার করেন। এই পরচুলার চাহিদা অস্ট্রেলিয়ায় বেশি। এখানে মনোক্যাপও তৈরির করছেন নারীরা। যেসব পুরুষের পেছনে চুল আছে কিন্তু সামনে নেই তারা মনোক্যাপ ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ ও ভারতে এই পরচুলার চাহিদা তুঙ্গে।

এছাড়া নারীর চুল দিয়ে বড় পরচুলাও তৈরি হয়। সাধারণত নারীরা এই পরচুলা ব্যবহার করেন। নারীরা বিয়ের অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যানুসারে বা অভিনয়ের সময় এই পরচুলা পরিধান করে থাকেন। চীনে এই পরচুলার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

গফরগাঁও আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী স্বর্ণা আক্তার। পরচুলার কাজ করে তিনি মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা আয় করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি নিজেকে পরচুলা শিল্পে নিয়োজিত রেখেছেন।

পরচুলা শিল্পী স্বর্ণা আক্তার বলেন, গত ৭ থেকে ৮ বছর পরচুলা শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছি। তবে পরিচালনার কাজে জড়িত গত এক বছর। লেখাপড়া করছি, পাশাপাশি দায়িত্বও পালন করছি। আমি এখন লিডার। সেই হিসেবে ১৫ হাজার টাকা পাই। এছাড়া হাতে কাজও করি। সব মিলিয়ে ২০-২২ হাজার টাকা আয় করতে পারি। এখন আমি আলতাফ গোলন্দাজ ডিগ্রি কলেজের শেষ বর্ষের পরীক্ষার্থী।

স্বর্ণা আরও বলেন, আমাদের মূল অফিসে ৬০-৭০ জন নারী বসে বসে কাজ করেন। এছাড়া অনেকে অফিসে কাজ করতে পারেন না, সংসারে নানা কাজ থাকে। ফলে তারা সংসারের কাজের ফাঁকে বাসায় বসে পরচুলা তৈরি করেন। এছাড়া শাখা অফিস আছে। শাখা অফিস ও বাসায় বসে অনেকে কাজ করেন। সব মিলিয়ে তিনশ থেকে চারশ মেয়ে আমার অধীনে কাজ করেন। আমার বড় আপুও একজন লিডার। পুরো ময়মনসিংহজুড়ে ১৫০০ থেকে ১৮০০ নারী পরচুলা শিল্পে জড়িত বলে মনে করেন স্বর্ণা।

স্বর্ণার অধীনে কাজ করেন আরেক পরচুলা শিল্পী শাহানা খাতুন। শাহানা খাতুনের স্বামী মিনজারুল ইসলাম চার বছর আগে সৌদি আরব গেছেন। শাহানা  বলেন, সংসারের কাজের ফাঁকে পরচুলা বানিয়ে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসারে চলে যায়। স্বামী কবে সৌদি থেকে টাকা পাঠাবেন, সেই আসায় আর বসে থাকি না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চুলের ব্যবসা। গ্রাম ও শহরের মেয়েরা আচড়ানোর সময় ঝরে পড়া চুল জমা করে রাখেন। তাদের কাছ থেকে এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা চুল সংগ্রহ করেন। গ্রামীণ ও শহরের নারীদের কাছ থেকে প্রতি কেজি চুল দুই থেকে চার হাজার টাকা দরে কেনা হয়। এরপর প্রক্রিয়াজাত করে চুল গ্রেড অনুসারে প্রতি কেজি সাত থেকে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এসব চুল ফড়িয়াদের কাছ থেকে বিভিন্ন কোম্পানি কিনে নিয়ে পরচুলা তৈরির কাজে ব্যবহার করে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দুই কোটি ২৪ লাখ ডলারের চুল ও পরচুলা রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এক কোটি ৪৬ লাখ ডলারের চুল ও পরচুলা রপ্তানি হয়েছিল। করোনার কারণে পরচুলা রপ্তানি কমে যায়। তবে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আবারও চাঙ্গা হচ্ছে পরচুলার বাজার। বিগত পাঁচ অর্থবছরে চুল রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ১০ কোটি ডলার। প্রতি অর্থবছরে চুলের রপ্তানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।