ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১২:২১:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

ভাষা আন্দোলনে নারী সৈনিক

আপডেট: ০৮:৪৪ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার

০৪দিলরুবা খান : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ দেশের নারী কখনোই কোনো সংকটে নিশ্চুপ হয়ে ঘরের কোণে আবদ্ধ থাকেনি। যদিও তার জীবন নানা সংস্কারের জালে ঘেরা। তবু সব বাধা তুচ্ছ করে সমাজের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে এসে দাঁড়িয়েছে পুরুষের পাশে। তাকে প্রেরণা জুগিয়েছে, সাহস দিয়েছে, বিজয়ী করেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীর এ বিজয় লক্ষ্মীরূপ দেখেই তো লিখেছিলেন কোনো কালে একা হয়নি ক জয়ী পুরুষের তরবারি/প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়ী লক্ষ্মী নারী। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন জাতীয় আন্দোলন। এই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে। তবে এর শেকড় ছিল চলি্লশের দশকেই। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায়। দ্বিতীয় এবং অনেক বেশি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে। ক্রমেই এই আন্দোলনের দাবি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে এ আন্দোলন বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও দেশের আপামর জনগণ, নারী-পুরুষের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা দলমত নির্বিশেষে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিশেষ করে মেয়েদের ছিল সক্রিয় সহযোগিতা। পঞ্চাশের দশকে রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্রদের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও একুশের ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তারা বিক্ষোভ মিছিলে এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশে যোগ দেন। আহত ছাত্রদের চিকিৎসার সাহায্যার্থে প্রতিকূল পরিবেশেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে আনেন। ছাত্রদের পুলিশি নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে তাদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখেন। আবার বন্দি ছাত্রদের জন্য খাবার সংগ্রহ করেন। পোস্টার লেখেন। শুধু তাই নয়, শহীদ মিনার গড়ার জন্য প্রায় সারারাত ধরে ইট বহন করেছিলেন। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য গৃহিণীরাও তাদের অলঙ্কার খুলে দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কারাবরণও জুটেছিল কারো কারো ভাগ্যে। তখন সবার একটাই লক্ষ্য ছিল_ মাতৃভাষার সম্মান আদায় করা। ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সঠিক তথ্য নেই। শুধু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু তথ্য জানা যায়। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি বেগম সুফিয়া কামাল। অনেক কর্মীর সঙ্গে তার ছিল নিবিড় যোগাযোগ। '৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ভাষাকন্যা নাদেরা বেগম পুলিশের ঘেরাও থেকে আত্মগোপন করেছিলেন। সে সময় তিনি সুফিয়া কামালের বাসায় ছিলেন বোনের মেয়ের পরিচয়ে। নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দিয়েছিলেন জাহানারা। মুনীর চৌধুরীর বোন নাদেরা বেগম পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে বেড়াবেন, তাকে আশ্রয় দেবেন না সুফিয়া কামাল তা কি হয়? হাটখোলার তারাবাগের বাসায় লুকিয়ে রেখেছিলেন তাকে। কিছুদিন থাকার পর বহু লোকের আনাগোনায় কে যেন তাকে চিনে ফেলে। নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে চলে যেতে হয় তাকে। পরে পুলিশ তাকে বন্দি করে। কারাগারে অন্য রাজবন্দিদের সঙ্গে তিনি কঠোর নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হন। তা সত্ত্বেও স্বৈরশাসকরা তার মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। তার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ের জন্য সে সময় তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তিনি যেভাবে তার কর্মকা- চালিয়ে যান তা ছিল ঠিক আরব্য উপনাসের মতোই রোমাঞ্চকর। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন মমতাজ বেগম। তিনি নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী। সরকার ও সমাজের সব রকম রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন খান এবং ডা. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শহীদদের রক্ত-শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্য আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন। ফলে তিনি কারাবরণ করেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, কারাগার থেকে বন্ড সই করে মুক্তিলাভে অস্বীকৃতি জানানোয় মমতাজ বেগমের স্বামী তাকে তালাক দেন। এ জন্য তার সাজানো সংসার ভেঙে যায়। নারায়ণগঞ্জের ছাত্রী ইলা বকশী এবং বেনু ধরও কারাবন্দি হন। খুলনার স্কুলছাত্রী হামিদা খাতুন নারীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রচেষ্টায় লাঞ্ছিত হন। ভাষা আন্দোলনে সিলেটের নারীদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রাখার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল যোবেদা খাতুন চৌধুরীর। তার সহযোগিতায় ছিলেন শাহেরা বানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেসা, সৈয়দা নজিবুন্নেসা খাতুন, প্রধান শিক্ষয়িত্রী রাবেয়া খাতুন প্রমুখ। সিলেটের ছাত্রী সালেহাকে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য স্কুল থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। বলাবাহুল্য তার জীবনে আর পড়াশোনা হয়নি। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ভাষাসৈনিক গাজীউল হক একটি লেখায় ২১ ফেব্রুয়ারির সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ঐতিহাসিক ছাত্রসভায় উপস্থিত মেয়েদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি সাফিয়া খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন নাহারসহ আরো অনেকের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৫২ জন মেয়ের কথা বলেছেন। স্কুলপড়ুয়া এক ছাত্রী ছিল জাহান আরা লাইজু, গাজীউল হক তার কথা স্মরণ করে বলেছেন, লাইজু সাইকেল চালাতে জানত এবং সাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের নেতাকর্মীদের কাছে প্রয়োজনীয় বার্তা পেঁৗছে দিত। সাফিয়া খাতুন এবং রওশন আরা বাচ্চু অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। রওশন আরা বাচ্চু শুধু রাজনীতিসচেতন বা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেই তার দায়িত্ব শেষ করেননি, তিনি সেই অগি্নঝরা দিনকে বর্ণমালায় সাজিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের জানা-অজানা ঘটনা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে আহমদ রফিক তার 'একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস' গ্রন্থটিতে উল্লেখ করেছেন_ 'মেয়েরাও যে পিছিয়ে নেই আন্দোলনের এই দুর্বল সময়ে, তা দেখা গেল। ১২ নং অভয় দাস লেনে ২৬ ফেব্রুয়ারি নারীদের বিপুল এক সমাবেশের ব্যবস্থা হলো। রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি ইত্যাদি বাহক থাকা সত্ত্বেও বহু দূর থেকে পায়ে হেঁটে বৃদ্ধা ও বয়সী নারীরা পর্যন্ত এ সভায় যোগদান করেন। সরকারের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার সংরক্ষণ ও সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিষয়টি সে সময় লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলায় একক যোগ্যতা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। সে সময় সাপ্তাহিক 'বেগম' পত্রিকা বয়সে নবীন এবং একমাত্র মহিলা পত্রিকা হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য পঞ্চাশের দশকের সামাজিক পটভূমিকায় প্রত্যক্ষ ভাষা আন্দোলনে পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ আনুপাতিক হারে কম ছিল কিন্তু তখনকার সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এ আংশগ্রহণ অবশ্যই স্বীকৃতির দাবিদার। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা একাডেমী আলোচনা সভা, সেমিনারসহ নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অথচ ভাষা আন্দোলনে নারী সৈনিকদের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় না। তাদের স্বীকৃতির কথা উপেক্ষিতই থেকে যায়। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষাশহীদ, ভাষাসৈনিকদের সঙ্গে ভাষাকন্যাদেরও সমান মর্যাদায় স্মরণ করা হোক এই হোক প্রার্থনা। ২১.০২.২০১৫