ঢাকা, মঙ্গলবার ২৮, জুলাই ২০২৬ ১৪:০৯:৫৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ছয় মাসে ৮৬ শিশু হ*ত্যা, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৩৬ জন হাইকোর্টে একদিনে ৭ হাজার ৮৫৩ মামলা নিষ্পত্তির রেকর্ড হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষ দশে বাংলাদেশ গ্যাসের ঘাটতিতে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প সংকট রেকর্ড ভাঙতে পারে ইউরোপের দাবানল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল ১০ আগস্ট

মহাশ্বেতা দেবী:নিপীড়িত মানুষের এক অকুতোভয় কণ্ঠস্বর

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৪৬ এএম, ২৮ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

আজ (২৮ জুলাই) বাংলা সাহিত্য ও সমাজসচেতনতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, খ্যাতিমান কথাশিল্পী মহাশ্বেতা দেবী-এর প্রয়াণ দিবস। ২০১৬ সালের এই দিনে তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছিল এক নির্ভীক লেখককে, আর সমাজ হারিয়েছিল নিপীড়িত মানুষের এক অকুতোভয় কণ্ঠস্বর।

তিনি একবার নিজের জীবন সম্পর্কে লিখেছিলেন-
"যাঁরা মনে করেন এক জীবনে আমার অনেকবার জন্মান্তর ঘটে গেছে, তাঁদের কথা আমি মানি না। আমি মনে করি ১৪.১.১৯২৬ সালে ঢাকার জিন্দাবাহার লেনের মামার বাড়িতে যে-শিশু জন্মেছিল, তার জীবনের পরিণতি খুবই যৌক্তিক। অন্যরকম হতে পারত না।"
এই আত্মকথনেই ফুটে ওঠে তাঁর জীবনের দর্শন—সংগ্রাম, দায়বদ্ধতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।
ঢাকায় জন্ম, বিশ্বজোড়া পরিচিতি
মহাশ্বেতা দেবী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে। তাঁর বাবা ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক মনীশ ঘটক, আর মা লেখিকা ও সমাজকর্মী ধারিত্রী দেবী। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হন।

তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেন এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সাহিত্য ও সমাজকর্মই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত।

মহাশ্বেতা দেবী বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়; এটি অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেরও শক্তিশালী মাধ্যম। তাই তাঁর গল্প-উপন্যাসে বারবার উঠে এসেছে আদিবাসী, দলিত, ভূমিহীন কৃষক, শ্রমিক ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম।
তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, অথচ গভীর। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ তাঁর সাহিত্যকে করেছে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।

মহাশ্বেতা দেবীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে-
• হাজার চুরাশির মা
• অরণ্যের অধিকার
• রুদালি
• দ্রৌপদী
• অগ্নিগর্ভ
• চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর
• স্তন্যদায়িনী
• বায়েন
এই রচনাগুলো শুধু সাহিত্যিক সাফল্যই অর্জন করেনি, বরং সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রশ্নকে নতুনভাবে ভাবতে পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করেছে।

মহাশ্বেতা দেবী শুধু লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মাঠপর্যায়ের কর্মী। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মধ্য ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তিনি লোধা, শবর, খেরিয়া-শবরসহ বিভিন্ন অবহেলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকার এবং মানবাধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন। সরকারি অবহেলা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি নির্ভয়ে কলম ধরেছেন এবং প্রয়োজন হলে সরাসরি আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন।

তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তি ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
• সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
• জ্ঞানপীঠ পুরস্কার
• র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার
• পদ্মশ্রী
• পদ্মবিভূষণ
তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নিপীড়িত মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা।

তিনি বলতেন, একজন লেখকের দায়িত্ব সমাজের অন্ধকার জায়গাগুলোকে আলোকিত করা। তাঁর কলমে ইতিহাস, রাজনীতি, শোষণ ও মানুষের প্রতিরোধ একাকার হয়ে গেছে।
তিনি বিশ্বাস করতেন-
"যে মানুষের কথা কেউ লেখে না, লেখকের দায়িত্ব সেই মানুষের কথাই লেখা।"
এই দর্শনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

আজকের বিশ্বেও যখন বৈষম্য, বঞ্চনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, তখন মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর রচনায় আমরা শিখি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবতা, আর সাহিত্য তখনই অর্থবহ, যখন তা সমাজের নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মহান কথাশিল্পীকে, যিনি কলমকে কেবল সৃষ্টির হাতিয়ার নয়, ন্যায়বিচারের অস্ত্রেও পরিণত করেছিলেন। বাংলা সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন মহাশ্বেতা দেবীর নাম উচ্চারিত হবে সংগ্রাম, মানবতা এবং সাহসের প্রতীক হিসেবে।