ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৫৬:৩৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

মেক্সিকোর চিত্রশিল্পী ও নারীবাদী ফ্রিদা কাহলো: জীবন ও শিল্প

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫৮ এএম, ৩ মে ২০২৬ রবিবার

মেক্সিকোর চিত্রশিল্পী ও নারীবাদী ফ্রিদা কাহলো

মেক্সিকোর চিত্রশিল্পী ও নারীবাদী ফ্রিদা কাহলো

বিশ্ব শিল্প-ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জীবন ও শিল্পকে আলাদা করে দেখা যায় না। তাদের ক্যানভাসে যেমন রঙের বিস্তার, তেমনি সেখানে জমা থাকে ব্যক্তিগত বেদনা, সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিবাদ ও আত্ম-অন্বেষণের দীর্ঘ ইতিহাস। মেক্সিকোর কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো তেমনই এক নাম। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি এক প্রতীক—প্রতিরোধের, আত্মমর্যাদার, নারীমুক্তির এবং আত্মপরিচয়ের সাহসী উচ্চারণের প্রতীক।

তার ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, যেন ক্যানভাসের ভেতর থেকে এক নারী সরাসরি দর্শকের চোখে চোখ রেখে কথা বলছেন। সেই কথায় আছে যন্ত্রণা, আবার আছে অদম্য শক্তি। আছে ব্যক্তিগত ক্ষত, আবার আছে সামাজিক প্রতিবাদ। নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোকে তিনি রূপ দিয়েছেন শিল্পে। আর সেই শিল্পই তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া পরিচিতি।

জন্ম ও শৈশব: বিপর্যয়ের সঙ্গে পরিচয়
ফ্রিদা কাহলো জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৭ সালের ৬ জুলাই, মেক্সিকোর কোয়োআকান-এ, পারিবারিক বাড়ি ‘ব্লু হাউস’-এ। তার পুরো নাম ছিল ম্যাগদালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলো ই কালদেরন।
তার বাবা গিয়ের্মো কাহলো ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত আলোকচিত্রী। মা মাতিল্দে কালদেরোন ই গনসালেস ছিলেন স্প্যানিশ ও আদিবাসী বংশোদ্ভূত। এই দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ফ্রিদার ব্যক্তিত্ব ও শিল্পবোধে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ছয় বছর বয়সে তিনি পোলিওতে আক্রান্ত হন। এর ফলে তার ডান পা কিছুটা চিকন হয়ে যায়। ছোটবেলায় এই শারীরিক দুর্বলতার কারণে সহপাঠীদের কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে তোলে।

দুর্ঘটনা: জীবন বদলে যাওয়ার মুহূর্ত
১৯২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভয়াবহ এক বাস দুর্ঘটনার শিকার হন ফ্রিদা। একটি ট্রাম বাসটিকে ধাক্কা দিলে লোহার একটি দণ্ড তার শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। মেরুদণ্ড, পাঁজর, কোমর, পা—শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সারা জীবনে তাকে ৩০টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল।
দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য হন তিনি। এই সময়ই তার বাবা তাকে রঙ-তুলি এনে দেন। বিছানার ওপরে আয়না বসানো হয়, যাতে শুয়ে থেকেই নিজের মুখ দেখতে পারেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার যাত্রা।
পরে তিনি বলেছিলেন, “আমি নিজেকেই আঁকি, কারণ আমি একাই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।”

শিল্পজীবনের শুরু: যন্ত্রণা থেকে সৃজন
ফ্রিদা কাহলোর অধিকাংশ ছবিই আত্মপ্রতিকৃতি। তবে এগুলো নিছক নিজের মুখ আঁকা নয়; বরং নিজের ভেতরের অনুভূতি, শারীরিক কষ্ট, মানসিক টানাপোড়েন এবং অস্তিত্বের প্রশ্নকে প্রকাশ করার এক শক্তিশালী ভাষা।
তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে— The Two Fridas (দ্য টু ফ্রিদাস), Self-Portrait with Thorn Necklace and Hummingbird (সেলফ পোর্ট্রেট উইথ থর্ন নেকলেস অ্যান্ড হামিংবার্ড), The Broken Column (দ্য ব্রোকেন কলাম), Henry Ford Hospital (হেনরি ফোর্ড হসপিটাল), Without Hope (উইদাউট হোপ)।তার ছবিতে দেখা যায় রক্ত, ভাঙা শরীর, কাঁটা, অশ্রু, পশুপাখি, উদ্ভিদ ও মেক্সিকান লোকজ প্রতীক। এগুলো কেবল নান্দনিক উপাদান নয়; বরং তার জীবনের রূপক।

দিয়েগো রিভেরা: প্রেম, দ্বন্দ্ব ও সহযাত্রা
১৯২৯ সালে তিনি বিখ্যাত মেক্সিকান চিত্রশিল্পী Diego Rivera-কে বিয়ে করেন। তাদের সম্পর্ক ছিল প্রবল প্রেম, তীব্র দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্মিলনের এক জটিল অধ্যায়। দিয়েগো ছিলেন বয়সে তার চেয়ে ২০ বছরের বড়। ফ্রিদার প্রতিভাকে তিনি প্রথম থেকেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবে তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ঝড়ো।
ফ্রিদা একবার বলেছিলেন, “আমার জীবনে দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। একটি বাস দুর্ঘটনা, আরেকটি দিয়েগো।”

মাতৃত্বহীনতার বেদনা
ফ্রিদা মা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণে তার শরীর সন্তান ধারণের উপযুক্ত ছিল না। একাধিক গর্ভপাত তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। এই ব্যক্তিগত শোক তার শিল্পে গভীরভাবে ফুটে ওঠে।

রাজনীতি ও চিন্তাচেতনা
ফ্রিদা কাহলো শুধু শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। তিনি মেক্সিকো সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণিবৈষম্য এবং নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার বাড়িতে একসময় আশ্রয় নিয়েছিলেন লিওন ট্রটস্কি।

নারীবাদী ফ্রিদা
আজকের দিনে ফ্রিদা কাহলোকে নারীবাদের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কারণ তিনি সমাজের চাপানো সৌন্দর্যের মানদণ্ড মানেননি। তার ঘন ভুরু, গোঁফের রেখা, নিজস্ব পোশাক, স্বাধীন জীবনযাপন—সবকিছু দিয়ে তিনি প্রচলিত নারীত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি নিজের শরীর, যন্ত্রণা, যৌনতা ও হতাশাকে অকপটে শিল্পে তুলে ধরেছেন।

মেক্সিকান সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা
ফ্রিদার পোশাক, অলংকার, চুলের বিন্যাস—সবকিছুতেই ছিল মেক্সিকান ঐতিহ্যের ছাপ। তিনি স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতিকে গর্বের সঙ্গে ধারণ করতেন। তার ছবিতে মেক্সিকোর রং, প্রকৃতি, লোকজ প্রতীক, প্রাণী ও আচার-অনুষ্ঠানের উপস্থিতি স্পষ্ট।

শেষ জীবন
জীবনের শেষদিকে তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তবুও তিনি আঁকা থামাননি। ১৯৫৩ সালে মেক্সিকোতে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। চিকিৎসকের নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে সেখানে পৌঁছান এবং বিছানায় শুয়েই অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান। এ যেন শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসার সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ।
১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল— “আমি আনন্দের সঙ্গে বিদায় নিচ্ছি। আশা করি আর ফিরতে হবে না।”

মৃত্যুর পরও অমর
আজ তার বাড়ি ফ্রিদা কাহলো জাদুঘর বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় শিল্প-স্থাপনা। তার জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘ফ্রিদা’ নামে চলচ্চিত্র। বিশ্বজুড়ে শিল্পী, লেখক, নারীবাদী চিন্তক ও তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার নাম।

শিল্পের ভাষায় এক অনন্ত প্রতিরোধ
ফ্রিদা কাহলোর জীবন আমাদের শেখায়—ব্যথা কখনও কখনও শিল্পে রূপ নেয়, আর সেই শিল্প হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা। তিনি নিজের ক্ষত লুকাননি। বরং তাকে রূপ দিয়েছেন রঙে, রেখায়, প্রতীকে। এই কারণেই ফ্রিদা শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি এক জীবন্ত উচ্চারণ— যেখানে শিল্প মানে সত্য বলা, আর সত্য মানে সাহসী হয়ে ওঠা।

আইরীন নিয়াজী মান্না: শিশুসাহিত্যিক, লেখক ও সাংবাদিক। সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম।