ঢাকা, শুক্রবার ০১, মার্চ ২০২৪ ২০:২৫:১১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
বেইলি রোডে ভবনের আগুনে দগ্ধ কেউই শঙ্কামুক্ত নন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না থাকায় বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে স্বামীকে ফোন করে বাঁচার আর্তনাদ, পরে সন্তানসহ মিলল লাশ বেইলি রোডের আগুনে ভিকারুননিসার শিক্ষক ও তার মেয়ের মৃত্যু বেইলি রোডে ভয়াবহ আগুনে নিহত বেড়ে ৪৫ বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক বেইলি রোডে আগুন : ২৫ মরদেহ হস্তান্তর

যুদ্ধশিশু ও এতিম দেখিয়ে শিশু পাচার: পুরনো ঘটনার তদন্ত দেশে

সৌমিত্র শুভ্র, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৩১ পিএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২৪ সোমবার

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে যুদ্ধশিশু ও অনাথদের বিদেশে পুনর্বাসনের সময়ে এমন অনেক শিশুকে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যাওয়া হয় যারা আদতে যুদ্ধশিশু বা অনাথ ছিলই না। বাবা-মাকে না জানিয়ে কিংবা তাদের অমতে সন্তানদের দত্তক হিসেবে পাঠিয়ে দেয়ার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে সেই সব ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।

দরিদ্র বাবা-মাকে সন্তানদের বোর্ডিং স্কুলে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে ওই শিশুদের দত্তক হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো বলে অভিযোগ উঠেছিল।

সেই সময় বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ থেকে শিশুদের দত্তক নেবার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন লঙ্ঘন করা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়ার পর ২০২১ সালে বিদেশ থেকে শিশুদের দত্তক নেওয়া পুরোপুরি স্থগিত করে দেয় নেদারল্যান্ডস সরকার।

কনা ভেরহেউলের কাহিনি
"বছরের পর বছর মা আমাকে খুঁজে ফিরেছেন। আমাকে যেখানে হারিয়েছেন সেখানে আর থাকেননি তিনি। কিন্তু, মৃত্যুর আগে আগে সেই জায়গায় আবার এসেছিলেন।"

"আমার বোনদের বলেছিলেন, যদি মেয়েটা ফিরে আসে, এখানেই আসবে সে।"

"তার তিন মাস পরে মারা যান আমার মা।"

বিবিসি বাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন কনা ভেরহেউল। ডাচ নাগরিক তিনি।

কিন্তু জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে তিনি জেনেছেন তার আসল বাবা-মায়ের পরিচয়। জেনেছেন তার নিজের নাম ছিল নাসিমা।

তারপর, নিজের শেকড়ের কাছে পৌঁছেছেন যত দিনে, তার মা আর তখন বেঁচে নেই।

“আমি তবু ভাগ্যবান, নিজের পরিবারকে ফিরে পেয়েছি। আর কাউকে যেন এসবের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। তাতে জীবনটা নড়বড়ে হয়ে যায়।”

তবে বোন-ভাগ্নিদের কাছ থেকে কনা জেনেছেন, তার মা তাকে দত্তক দেননি। ত্যাগ করেননি সন্তানকে। তার সম্মতিই ছিল না দত্তকের ব্যাপারে।

দত্তকের কাগজপত্রে গরমিল:
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ঢাকার টঙ্গী এলাকার একাধিক নারীকে প্রলোভন দেখানো হয়েছিলো তাদের সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের।

তবে সেটা বাংলাদেশেই ভালো থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে। কিন্তু সন্তানদের পাঠানোর কয়েকদিন পর খোঁজ নিতে গিয়ে অভিভাবকরা আর তাদের দেখা পাননি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, টঙ্গীর স্থানীয়রা টেরি ডেস হোমস্ নামে একটি এনজিও-র দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। তবে এনজিও-টি দাবি করে দত্তক ব্যবস্থাপনা তাদের কাজ নয়।

বিবিসি বাংলাকে কনা ভেরহেউল বলেন, “দেখি দত্তকের কাগজপত্র সবই আছে, কিন্তু সেগুলো দিয়ে ফেলে আসা স্বজনদের খুঁজে পাওয়া যায় না কেন!”

“তার মানে তথ্যে কোথাও গরমিল আছে। হয়তো ইচ্ছে করেই বানোয়াট তথ্য দেয়া হয়েছে!”, যোগ করেন তিনি।

কিন্তু কনা ভেরহেউল ও তার সঙ্গীরা থামেননি। তাদের অন্বেষণ চালিয়ে গেছেন।

এক পর্যায়ে তারা খোঁজ পান, কোনও কোনও মা-ও তাদের হারানো সন্তানকে খুঁজে ফিরছেন।

পরিবারকে তারা কীভাবে খুঁজে বের করছেন?
সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কারও পরিবারকে খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়।

এ দুরূহ কাজটিই করার লক্ষ্যেই কনা ভেরহেউল গড়ে তোলেন শাপলা কমিউনিটি।

মিজ ভেরহেউল বলছিলেন, এই প্রতিষ্ঠানটির মাঠ-কর্মীরা গ্রামেগঞ্জে ঘুরে সেই সত্তর দশকে দত্তকের নামে সন্তান হারানো কেউ আছে কি না, তাদের খুঁজে বেড়ান।

“এমন কাউকে পাওয়া গেলে তার সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব তথ্য জানার চেষ্টা করা হয়।"

"নেদারল্যান্ডসে যারা আছেন তাদের কাছ থেকেও যত রকমের তথ্য নেওয়া সম্ভব জোগাড় করি আমরা। তারপর মিলিয়ে দেখতে থাকি।"

"কিন্তু শুধু এই সব তথ্যের ওপর নির্ভর করেই থাকা যায় না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডিএনএ টেস্ট করতে হয়।”

“কারণ একমাত্র এভাবেই পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়, মানুষটা আমার স্বজন কি না”, বলছিলেন তিনি।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৪০জন মানুষ তাদের পরিবারকে খুঁজে পেয়েছেন। মিলিত হয়েছেন তাদের সাথে।

আরও ১৫০ জন আছেন অপেক্ষমান তালিকায়। একদিন হয়তো তারাও তাদের পরিবারকে খুঁজে পাবেন, এমনটাই আশা শাপলা কমিউনিটির প্রতিষ্ঠাতার।

কনা ভেরহেউলের কথায়, “তাদের সন্তানরা ঠিক আছে, এটা অন্তত জানুক বাবা-মায়েরা, এইই আমাদের লক্ষ্য!”

‘ডিএনএ স্যাম্পল দিয়ে এসেছি'
“আমি ডিএনএ স্যাম্পল দিয়ে এসেছি। ফলফলটা জানার জন্য অপেক্ষা করছি।”

বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রেনু ডি ব্রুইনা। পঞ্চাশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে যার ঠিকানা হয়েছিলো নেদারল্যান্ডস।

তখন, তার নামের পাশে লেখা ছিলো 'এতিম'। অথচ, রেনু এখনো বাবা-মাকে খুঁজে চলেছেন।

“আমি আমার পরিবারের সন্ধানে গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। টঙ্গীতে খুঁজেছি, সিঙ্গাইরে খুঁজেছি।"

"একজনকে পেলাম যে হয়তো আমার বোন হতে পারে। তার সঙ্গে ডিএনএ টেস্টের ফল মেলে কিনা সেই অপেক্ষা এখন”, বলছিলেন মিজ ডি ব্রুইনা।

“দ্রুত ফলাফলটা জানা দরকার। যত দেরি হবে বাবা-মায়েদের এতদিন পর বেঁচে না থাকার আশঙ্কাটা ততই বাড়বে। যেন বেঁচে থাকতে থাকতেই তাদের খুঁজে পাই”, এটাই এখন প্রত্যাশা তার।

উন্নত জীবনের সুবিধাই সব নয়:
দত্তক হিসেবে গৃহীত হওয়াটা কোনও ভালো জীবনের নিশ্চয়তা দেয় না বলে মনে করেন মিজ ভেরহেউল। বলেন, “সব শিশুর কপালে স্নেহশীল বাবা-মা জোটে না।”

“এটা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের মতো। দু’জন অপরিচিতি মানুষের সাথে একটা শিশুকে থাকতে পাঠিয়ে দেওয়া।"

"তাদের একটা সংসার আর আর্থিক সামর্থ্য থাকাই যেখানে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়, শিশুটির প্রতি তাদের কোনো ভালোবাসা থাক বা না থাক।”

ফলে তার মতে, যত সুখেই বড় হোন না কেন, একটা গভীর বেদনার উপলব্ধি থেকেই যায়।

সেই উপলব্ধির তাড়নাতেই মিজ ভেরহেউল প্রতিষ্ঠা করেন শাপলা কমিউনিটি।

যার মাধ্যমে সত্তরের দশকের সেইসব শিশুদের পরিবার খুঁজে পেতে তারা সাহায্য করছেন, যারা দত্তকের নামে ‘পাচার’ হয়ে গিয়েছিলেন।

পুলিশের তদন্তের লক্ষ্য কী?:
সপ্তাহ তিনেক আগে বাংলাদেশে এই ঘটনার প্রথম পুলিশি তদন্তে প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কনা ভেরহেউলের সাক্ষাৎকার নেয় বাংলাদেশ পুলিশের ডিপ্লোম্যাটিক অ্যান্ড প্রোটোকল উইং অব দ্য স্পেশাল ব্রাঞ্চ।

বাহিনীটির স্পেশাল সুপারিনটেনডেন্ট মাশরুফ হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক মাস আগে এই তদন্তটি করার জন্য নথি পাঠানো হয়।

মি. মাশরুফ বলেন, “এটা একটা কষ্টদায়ক অধ্যায়, ফোর্সফুলি যারা অ্যাডপ্টেড হয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের একটা বড় কমিউনিটিও গড়ে উঠেছে, এই মানুষগুলো শেকড় খুঁজছেন।”

কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা আইন ভঙ্গের ঘটনা যদি ঘটে থাকে, সেটা যত আগেই হোক না কেন, পুরো বিষয়টাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে বলে জানাচ্ছেন তিনি।

কত শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছিল?:
বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, “কানাডার ইউনিসেফ কমিটির নির্বাহী পরিচালক অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও স্বাধীন বাংলাদেশে কয়েকবার সফর করেন।"

"এ সফরকালে ঢাকায় ইউনিসেফের কর্মকর্তা এবং লীগ অব রেডক্রস সোসাইটিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার কয়েকবার আলোচনা হয়।"

"এ আলোচনার পর তিনি অটোয়ায় সদরদপ্তরে যে প্রতিবেদন পেশ করেন, তাতে বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুর সংখ্যা দশ হাজারের মতো বলে উল্লেখ করা হয়।”

শাপলা কমিউনিটির তথ্য মতে, সত্তরের দশকে নেদারল্যান্ডসে ৫০০, ডেনমার্কে ১৭০, সুইডেনে ২০০ ও নরওয়েতে ১০০টির মতো শিশুকে বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছিলো।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডও কিছু শিশুর গন্তব্য হয় তখন।

“নেদ্যারল্যান্ডসে ওই সময় যে প্রায় ৫০০ শিশু এসেছে তদন্তটা শেষ হলে হয়তো আমরা জানতে পারতাম তার মধ্যে কয়জন যুদ্ধশিশু আর কয়জন তা নয়”, মন্তব্য মিজ ভেরহেউলের।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, জেনেভা-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল সার্ভিস, মন্ট্রিল-ভিত্তিক ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন এবং টরন্টো-ভিত্তিক কুয়ান-ইন ফাউন্ডেশন শিশুদের দত্তক ইস্যুতে কাজ করে।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক হোল্ট অ্যাডপশন প্রোগ্রাম ইন্ক এবং টেরি ডেস হোমস-এর মতো বিভিন্ন সংগঠনও সে সময় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এর মধ্যে টেরি ডেস হোমস্ নেদারল্যান্ডস্ ভিত্তিক সংগঠন।

টেরি ডেস হোমসের ভাষ্য:
সংস্থাটির তৎকালীন স্থানীয় পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষিতে তারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বিবৃতি দেয়।

তাতে বলা হয়, ১৯৭০-এর দশকে সালে বাংলাদেশে টেরি ডেস হোমস্ নেদারল্যান্ডস্ বা টিডিএইচএন জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে।

এছাড়া, যুদ্ধ ও দুর্যোগে বিপর্যস্ত দেশটির জন্য জরুরি আশ্রয় অবকাঠামো নির্মাণেও ভূমিকা রাখে তারা।

এই সংস্থার চাকরির পাশাপাশি স্থানীয় পরিচালক তখন ব্যুরো ইন্টারল্যান্ডেলিজকে অ্যাডপ্টিয়ে বা বিআইএ’র হয়েও কাজ করতেন। শিশুদের দত্তকের বিষয়টি দেখভাল করতো বিআইএ।

এ ব্যাপারে টিডিএইচ অবগত থাকলেও দত্তকের ব্যাপারে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল না সংস্থাটি দাবি করেছে।

'চল্লিশ বছর পর এসে ধরে ধরে প্রতিটি ঘটনা তুলে ধরা কঠিন' বলে জানালেও তারা এটা নিশ্চিত হয়েছেন, যে তাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর তার ক্ষমতার কোনও অপব্যবহার করেননি।

নেদারল্যান্ডসে নিষেধাজ্ঞা:
নেদারল্যান্ডসের কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে পাঁচটি দেশ থেকে শিশু দত্তক নেওয়া সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।

তালিকার বাকি দেশগুলো হলো ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং শ্রীলঙ্কা।

১৯৬৭ সাল হতে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এসব দেশ থেকে যেসব শিশুকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল, সেখানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

ভুল তথ্য দেওয়া, কাগজপত্র জালিয়াতি-সহ অনেকগুলো অভিযোগের তদন্ত করে জৌস্ত্রা কমিশন। তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকদিন আগে নেদারল্যান্ডসের সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তখন বাংলাদেশকে বিপুল সংখ্যক অভিভাবকহীন এতিম শিশু, পরিত্যক্ত শিশু আর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এমন নারীদের গর্ভে জন্ম নেয়া যুদ্ধ-শিশুর পুনর্বাসনে হিমশিম খেতে হয়।

স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে হাজারের ওপর শিশুকে বিদেশিরা দত্তক নিয়ে গিয়েছিল।