ঢাকা, রবিবার ২৭, নভেম্বর ২০২২ ৯:১৫:৩৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
আ. লীগের নারীবিষয়ক সম্পাদক হলেন জাহানারা বেগম আ. লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হলেন রিমি চুমকিকে সভাপতি এবং শিলাকে জিএস করে মহিলা লীগের নতুন কমিটি আগামী নির্বাচনের আগে কোনো সংলাপ না করার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু, ভর্তি ৪৬২ জন ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু, হাসপাতলে ৪৬২ উন্নয়ন না দেখতে পেলে চোখের ডাক্তার দেখান: প্রধানমন্ত্রী

শহিদ কবি মেহেরুন নেসা স্মরণে কিছু কথা

দিলরুবা খান | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:৫৮ পিএম, ২৭ মার্চ ২০২২ রবিবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নিষ্ঠুরতম  শিকার হয়ে প্রথম নারী শহিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন কবি মেহেরুন নেসা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগের যুগের কবিদের মধ্যে জীবন চেতনা ও রূপকল্পের দিক থেকে মেহেরুন নেসা বিশেষ শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। একজন বুদ্ধিজীবী, সচেতন কবি ও কর্মী- এই তিন রূপেই তার বিকাশ। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩১ বছর। কিন্তু এই পুরো সময়টুকু তাকে কাটাতে হয়েছে কঠিন সংগ্রামের মধ্যে। 

কবি মেহেরুন নেসা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৪০ সালের ২০ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ধর্মভীরু, জ্ঞানপিপাসু এবং সাহিত্য রসিক। তাই তার ছেলেমেয়েদের প্রত্যেকেই ছিলেন সাহিত্যপিপাসু। সবাই কিছু না কিছু কবিতা গান বা গল্প লিখতে পারতেন। 

দেশ বিভাগের পর মেহেরুন নেসার পরিবার কপর্দকহীন অবস্থায় ঢাকায় চলে আসেন। এটি ১৯৫০ সালের কথা। মিরপুরের একটি বাসায় এসে ওঠেন তারা। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, দুইভাইয়ের পড়াশোনা এবং মাকে নিয়ে সংসারের সব দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নেন মেহেরুন নেসা। পরিবারকে বাঁচাতে সে সময় বাংলা একাডেমিতে কপিরাইটিং-এর কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু কবিতা আর কপি রাইটিং-এর পারিশ্রমিক দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি ফিলিপস রেডিও কোম্পানিতে রেডিও এসেমব্লিং-এর কাজ নেন। 

আজ ২৭ মার্চ  শহিদ কবি মেহেরুন নেসার মৃত্যু দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকে তার নিজের বাড়িতে অবাঙালিদের হাতে প্রাণ হারাতে হয় তাকে।  তখন তার সাথে ছিলেন বৃদ্ধা মা ও দুটি ভাই। তারা কেউই সেদিন বাঁচতে পারেননি। নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে জীবন বলি  দিয়েছিলেন তারাও। 

মেহেরুন নেসার অপরাধ ছিল, তিনি বাঙালি, বাংলায় কথা বলতেন। শুধু তাই নয়-তিনি কবি ছিলেন এবং সাহসী, সচেতন বিবেক সম্পন্ন। তিনি দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন, প্রগতিশীল আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য। অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় মিটিং মিছিল, স্লোগান দিয়ে এগিয়ে যেতে তার এতটুকু বুক কাঁপতো না।  

মেহেরুন নেসা দেশ চেতনায় উদবুব্ধ হয়ে অনেক কবিতা লিখেছিলেন। সেসব কবিতা মিরপুরের অবাঙালি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। 

১৯৬৫ সালে মিরপুরের ভেতরে অবাঙালিদের অপতৎপরতা   লক্ষ্য করা যায়। তারা দারুণভাবে বাঙালি বিদ্বেষী ছিল। তাদের  বৈরিতা ছিল বাঙালিদের সাথে। কোনো বাঙালিকে ওরা সুস্থ  সুন্দরভাবে বাঁচতে দিতে চাইত না।কোনো বাঙালি এক ঝাঁকা ডিম  নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে চাইলে রাস্তাতেই তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতো। কোনো বাঙালি শাক সবজির ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বাজারে গেলে একইভাবে ধাক্কা মেরে ফেলে নষ্ট করে দেয়া হতো সবকিছু।কোনো বাঙালি ছোট্ট মুদির দোকান নিয়ে বসলে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হতো সে দোকান। অবাঙালিদের এই অত্যাচার অবিচারের মাত্রা কিছুতেই চোখ বুজে মেনে নিতে চাইল না  মিরপুরের বাঙালি তরুণেরা। ওরা  অ্যাকশন কমিটি  গঠন করল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কবি মেহেরুন নেসা সেই কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অবাঙালিদের অত্যাচার অবিচারের মাত্রা যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যেতো তখন নির্ভয়ে   তার মোকাবিলা করতেন তিনি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গন্ধুর গগণভেদী ভাষণের উচ্চারণে অবাঙালিরা মিরপুরে পরিকল্পনার মাধ্যমে বাঙালি নিধনে মেতে উঠে। ভেতরে ভেতরে অবাঙালিরা তাদের বাড়ির ছাদে ওয়ারলেস ফিট করে সব খবর নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে পাচার করত। 

২৩ মার্চ, ১৯৭১ সালে তিনি নিজ বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। ও দিন রাতেই স্বাধীন পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে মিরপুরে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্য মারামারি-কাটাকাটি শুরু হয়। ২৪ মার্চ রাতে মেহেরুন নেসা, তার ভাই, কবি কাজী রোজী এবং অ্যাকশন কমিটির কয়েকজন সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে যান। তারা কিছু আদেশ-উপদেশ নিয়ে ফিরে আসেন মিরপুরে। ২৫ মার্চ মেহেরুন নেসার বাড়িতে খবর দেয়া হয়, মিরপুর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্য। কিন্ত মেহেরুন নেসা কোথাও না গিয়ে বাড়িতেই রয়ে গেলেন মা আর ভাইদের নিয়ে। ২৭ মার্চ সকাল ১১টায় কয়েকজন অবাঙালি তাদের বাসায় হামলা চালায়। তারা মাথায় লাল পট্টি বেধে 'লড়ায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর' বলে অমানবিকভাবে, পৈশাচিকভাবে মেহেরুন নেসা আর তার দুইভাইকে একসাথে বেঁধে ছুরি দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। মেহেরুন নেসাকে হত্যার পর তার কাটা মুণ্ডু ঘরের ফ্যানে ঝুলিয়ে রাখে নরপিচাসগুলো।  বৃদ্ধ মায়ের চোখের সামনেই ওই বিভৎস ঘটনা ঘটায় জানোয়ারের দল। তারপর হত্যা করে মাকেও। সেদিন এ তিন তরুণ-তরুণীর তীব্র চিৎকার আর তাদের বৃদ্ধ মায়ের করুণ আর্তনাদে মিরপুরের কালো আকাশ শিউরে উঠেছিল। ঘরের ভেতর বন্দি থেকে প্রতিবেশিরা আতঙ্কে কানে হাত চাপা দিয়েছিল সেদিন। মেহেরুন নেসাদের রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসতে কেউ সাহস পায়নি। আর্ত চিৎকারে ক্লান্ত হয়ে এক সময় হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল তিনজনের। পাশে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ মা চোখের সামনে দেখেছেন তিলে তিলে সন্তানের শেষ হয়ে যাওয়া! 

মেহেরুন নেসা ঊনসত্তরের  গণআন্দোলনে, সত্তরের মিছিলে,  একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে আগুনের শিখা হয়ে জ্বলেছেন। ঊনসত্তরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তার অবিনাশী কবিতা- 'প্রভু নয় বন্ধুকে'  প্রশ্নের শাণিত তরবারি হয়ে তার কবিতা আয়ুবশাহীর প্রশাসনের  ভিত্তিকে চিরে চিরে দেখতে চেয়েছিল। শুধু এই কবিতাই নয়, আরো অনেক স্বরচিত কবিতা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আগুনের ফুলকির মতো। 
দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য মেহেরুন নেসা শহিদ হয়েছেন। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ায়, মাতৃভাষাকে ভালোবাসার অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি প্রাণ দিয়েছেন হিংস্র ঘাতকের ছুরির ফলায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তিনি পাননি কোনো স্বীকৃতি। তার নামে  কোনো ছাত্রীনিবাস কিংবা সড়কের নামফলক নেই। এমনকি তার স্মৃতি স্মরণে হয় না কোনো স্মৃতিচারণ কিংবা আলোচন সভা।

তারপরও বলবো, শহিদ কবি বুদ্ধিজীবী  মেহেরুন নেসা হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন, তিনি থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে চির ভাস্মর  হয়ে।