ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১৩:২০:০১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
উত্তাল দিল্লি, বিশেষ ঘোষণা মোদির টানা বৃষ্টিতে তছনছ কৃষি-অর্থনীতি ৪ অঞ্চলে‘অতি ভারী’বৃষ্টির পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা চারদিন পর বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা

সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা

আপডেট: ০৮:১৯ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ শুক্রবার

সুমি খান: চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন আশৈশব আমার আদর্শ। মনে পড়ে, সেই কিশোরীবেলা থেকেই দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত মোনাজাতউদ্দিনের রিপোর্ট নিয়ে বাবা-মায়ের উচ্ছ্বসিত মন্তব্য শুনতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, একদিন আমিও এরকম করে রিপোর্ট করবো, দেশের প্রত্যন্ত জনপদের মানুষের সুখ-দু:খের কথা তুলে ধরবো পত্রিকার পাতায়। তখনো বুঝিনি, আমি এই সমাজের কাছে প্রথমত: ‘মেয়েমানুষ’-মোনাজাতউদ্দিনের মতো চারণ সাংবাদিক হবার বাস্তবতা আমার নেই। ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু লেখালেখি। চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণে লিখলাম নারী অধিকার, মানবাধিকার, কালো মানুষের অধিকার নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের বিপ্লবের গণজাগরণের কবি বেঞ্জামিন মলয়ঁসেকে ১৯৮৫ সালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। সে সময়ে স্কুলে পড়ি। মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না বিপ্লবের কবি মলয়ঁসের ফাঁসির আদেশ। লিখলাম,“বেঞ্জামিন মলয়ঁসে:মৃত্যুহীন প্রাণ”। এর আগে রাজধানীতে সোগেরা মোর্শেদ নামে একজনকে সম্ভবত: হত্যা করা হয়েছিলো, এর প্রতিবাদে একটি লেখা দিয়েছিলাম। বলা প্রয়োজন, এই লেখাটি আমাকে লিখে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলেক্স আলীম। চিন্তাশীল অনুভূতিকে কাজে লাগানোর এর চেয়ে মোক্ষম উপায় আর কী হতে পারে! যাই হোক দৈনিক পূর্বকোণের জুবলী রোড সিগনেট প্রেস অফিসে গিয়ে এক নারী সহসম্পাদকের হাতে  দিয়ে এলাম লেখাটি। তিনি লিখাটি চিঠিপত্র কলামে ছেপে দিলেন। আমার মতো এক কিশোরীর আবেগঘন প্রতিবাদী লেখাটি কলাম হিসেবে ছাপার যোগ্য মনে করেননি হয়তো। মনে কিছুটা কষ্ট পেলাম। পূর্বকোণে আর লেখা দিলাম না; আজাদীতে লিখতে থাকলাম। বেঞ্জামিন মলয়ঁসে, ফরাসী বিপ্লবে নারীর অবদান, শ্রমজীবি নারীর শ্রমের অধিকার নিয়ে লিখতে থাকি। একসময়ে দৈনিক পূর্বকোণে লিখতে শুরু করি। সাংবাদিক আবুল মোমেনের হাতে লেখা দিয়ে আসতাম। ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আমার ভাশুরের প্রোমোশান উপলক্ষে বাড়িতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে এলেন অনেকে। তাদের মধ্যে দৈনিক ভৈারের কাগজের তৎকালীন চট্টগ্রাম ব্যুরোচীফ আবুল মোমেন অন্যতম। তাকে বললাম, “মোমেন ভাই, জে এম সেনের মতো দেশনেতার নামে চট্টগ্রামের একমাত্র এভেনিউ জানতে পারলাম বাবার কাছে। আমি বাবাকে সাথে নিয়ে দেখেছি, দু’য়েকটি হিন্দু মালিকানাধীন দোকান ছাড়া অধিকাংশ দোকানের সাইনবোর্ডেই তার এই নামটি লেখা নেই। এভাবে জে এম সেনের কর্ম, নাম হারিয়ে যাচ্ছে। আমি কি একটা রিপোর্ট করতে পারি, যদি অনুমতি দেন?” আবুল মোমেন তার স্বভাবসুলভ স্মিত হেসে বললেন. “করো”। তার কাছে কৃতজ্ঞ আমি তিনি আমাকে রিপোর্টিংয়ের  সুযোগ করে দিয়েছিলেন সেদিন। আমার অসাধারণ উদ্যমী আর সাহসী বাবা সাইফুদ্দিন খান আমাকে নিয়ে প্রতিটা দোকান মালিক এবং  কর্মচারিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। শেখালেন মানুষের সাথে মিশে কী করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কোতোয়ালী, লালদীঘি, আন্দরকিল্লা এসব জায়গা বাবার শৈশব, কৈশোর, ভাষা আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি মিছিলের পায়ে পায়ে চেনা। চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থেকে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত প্রতিটি দোকানে কথা বললাম। এই এলাকার একমাত্র পেট্রোলপাম্পের মুসলমান মালিক (নামটি মনে করতে পারছি না, তিনি বেঁচে নেই) জানালেন, এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অংশ হিসেবে কী করে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের অন্যতম সেনানী ব্যরিস্টার যাত্রা মোহন সেন অর্থাৎ জে এম সেনের নাম মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র থেকে সাইনবোর্ডে তার নাম লেখা হয় না। অথচ চট্টগ্রামে তখন পর্যন্ত সেটাই একমাত্র এভেনিউ ছিল। যাই হোক জে এম সেনের ইতিহাস এবং জে এম সেন এভেনিউর ইতিহাস তুলে ধরলাম। একটি জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজের চলমান চট্টগ্রামে ১৯৯৩ সালের সম্ভবত: জুন মাসে প্রকাশিত হলো লেখাটি। এরপর নারী বানিজ্যব্যক্তিত্ব, শহীদ পরিবারসহ নানা বিষয় নিয়ে অব্যাহত থাকলো লেখালেখি। বিশ্বজিৎ চৌধুরী বিল করতেন একটা লেখাতে ১০০ টাকা। এসব নিয়ে কোনো কথা বলা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। তাই রিপোর্টিং অব্যাহত রাখলাম। বসে থাকতাম রিপোর্টিংয়ের প্ল্যান আর আইডিয়া পাওয়ার জন্যে। না, সে আশার গুঁড়ে বালি। নিজেই ভাবতে থাকি কী করা যায়! বাবার কাছে শুনেছি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬২ সাল বাবার প্রথম কারাজীবন কেটেছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে। এর পর আরো অনেকবার বাবা গ্রেফতার হয়েছেন। এখনো দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পংকজ ভট্টাচার্যের লেখায় তার কিছুটা পাওয়া যায়। কারাগার থেকেই বাবা বি.কম পাশ করেছেন।  দেশের শীর্ষ অনেক রাজনীতিকের মতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথেও তার কারাগারে দেখা হয়েছে বলে শুনেছি। রাজবন্দী হিসেবে তারা বেশ সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ছিলেন বলেই মনে হতো বাবার প্রাণোচ্ছ্বল গল্পে। তাই কারাগার নিয়ে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। একদিন বললাম, কারাগার নিয়ে আমি একটা রিপোর্ট করতে চাই। বিশ্বজিৎ চৌধুরী সাথে সাথে বলে উঠলেন, “কারাগারে আপনাকে ঢুকতে দেবে কেন? রিপোর্ট করতে চাইলেই তো আর করতে দেবে না”। সামান্য একজন কন্ট্রিবিউটর হয়েও কোথা থেকে মনের জোর পেলাম জানি না। জবাবে কিছুটা দৃঢ়তার সাথে বললাম, “আমি করে আনতে পারবো”। গেলাম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। জেল সুপারের রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বন্দীরা কুয়া থেকে পানি নিয়ে গোসল করছে, হেঁটে বেড়াচ্ছে। বাবার কাছে নাশতার টেবিলে বা খাওয়ার টেবিলে  শোনা গল্পগুলো মনে পড়লো। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার এবং জেল সুপার অনেক তথ্য দিলেন। সেসব নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করলাম। বিশ্বজিৎ চৌধুরী চলমান চট্টগ্রামের কাভার ষ্টোরী করলেন। বক্স করে চট্টগ্রাম কারাগারের ইতিহাস আলাদা করে দিলেন। সেটাতে আমার স্বামী আবদুল আলীমের নাম দিলেন। সেদিন প্রথম জানতে পারলাম এবং কিছুটা ধাক্কাও খেলাম, আমার কাজ অন্যের নামে প্রকাশ হতে পারে। এভাবে কেটে গেলো দিন। ১৯৯৩ সাল থেকেই প্রগতিশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোতে চাকরির চেষ্টা করেছি। ভোরের কাগজের কাজগুলোর জন্যে ব্যাপক প্রশংসা কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিতো শতগুণ। কিন্তু চাকরি দেবার আগ্রহ দেখায় না নীতিনির্ধারকেরা। নারীনেত্রী মালেকা বেগমকে সেই শৈশব থেকে দেখেছি মায়ের সাথে পথে প্রান্তরে নারী আন্দোলনের কাজে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অন্য সব কেন্দ্রীয় নেত্রীদের মতো মালেকা বেগমও সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে চট্টগ্রামে গেলে আমাদের বাসাতেই থাকতেন। আমার মা নূরজাহান খান ব্যাংকার ছিলেন। কোনরকমে অফিস পিরিয়ড শেষ হতে না হতেই মালেকা খালাম্মাকে সাথে নিয়ে মা বেরিয়ে পড়তেন। হেঁটে হেঁটে সারা শহরের নারীদের সংগঠিত করতেন। মালেকা খালাম্মার পায়ের চটির দিকে দেখতাম ধুলো- ময়লা মাখামাখি। রাজনৈতিক গল্প, একাত্তরের গল্প, সাংগঠনিক, পারিবারিক গল্প, আড্ডা হৈচৈ করে মা এবং মালেকা খালাম্মা ঘুমাতে যেতেন অনেক দেরিতে। মনে পড়ছে, এসব করে ও মা আমাদের দেখা শোনা, মেহমান দের জন্যে উপাদেয় রান্না, কোনটাই বাদ দিতেন না। বাবা বেশ উৎসাহের সাথে অনেক বাজার করে আনতেন মেহমানদের জন্যে। ১৯৮৫ সালে প্রথম বান্দরবান যাই । মালেকা খালাম্মা নিয়ে যান আমাদের। মালেকা খালাম্মার ছেলে সাশা, আমরা তিন ভাই বোন আর মা। খুব আনন্দ করেছিলাম। ১৯৯৩ সালের পর যখন  ভোরের কাগজ বা প্রথম আলোর কোন প্রোগ্রামে আসতেন মালেকা খালাম্মা বা মতি চাচা (প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান), তখন তারা হোটেলে থাকতেন। দেখা সাক্ষাতে কুশল বিনিময় হতো। ১৯৯৫ সালের পর কোন একদিন আমার আমার মা মালেকা খালাম্মার সাথে দেখা হবার পর বলেছিলেন, আমাকে ভোরের কাগজের সাথে যুক্ত করতে। আমি দেখেছি, তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলতেন, “এটা তো মোমেনই পারে নূরজাহান আপা।” এরপর একদিন মা আবুল মোমেনকে বললেন, “মোমেন ভাই, সুমিতো আপনাদের সাথেই কাজ করছে অনেক দিন। আপনারা নতুন ভাবে পত্রিকা শুরু করছেন। ওকে কি আপনাদের কাজের সাথে নিতে পারেন? ওতো কাজ করে।” আবুল মোমেন হেসে বললেন, “কাজ একটু বেশীই করে, কিন্তু এই মুহুর্তে তো সম্ভব না, দেখা যাক্ কী করা যায়।” মাকে এভাবে বারবার বিব্রত হতে দেখে আমার খুব কষ্ট হলো। প্রথম আলো বাজারে এলো।  একদিন আমিই আগ্রহ প্রকাশ করলাম। আবুল মোমেন বললেন, “চট্টগ্রামে মেয়েদের সাংবাদিকতা করার পরিবেশ নেই। তুমি ফ্রিল্যান্স করছো, করে যাও।” বুঝলাম আমাকে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে। একটি কথা প্রসঙ্গক্রমে আনা প্রয়োজন। আমার বড়ো চাচা ডা. কামাল এ খান চট্টগ্রামের আন্দোলন, সংগ্রাম, ক্রীড়া জগৎ, সংস্কৃতিক জগতের নিবেদিতপ্রাণ প্রচারবিমুখ অসাধারণ এক ত্যাগী সংগঠক ছিলেন। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের চট্টগ্রাম সফর মানেই আয়োজক এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আমাদের বাপ্পু ডা. কামাল এ খান। প্রসঙ্গত: বলতে হয়, তার মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রগবেষক ওয়াহিদুল হক শিল্পকলা একাডেমীতে বলেছিলেন, “ডা. কামাল এ খানের নামে মেলা হওয়া উচিত এমন নিস্প্রাণ শোকসভা নয়।” আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বাপ্পুর প্রসঙ্গ আনবার কারণ হলো, ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলো দু’টি পত্রিকার নীতিনির্ধারক এবং সংবাদকর্মীরা শুরুর সময়ে চট্টগ্রামে প্রথম কিছুদিন অফিস হিসেবে বাপ্পুর চেম্বারেই বসেছেন। কথাটা এজন্যেই বলছি, বাপ্পু মারা যাবার পর প্রথম আলোতে তার মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করার জন্যে আমাকে বেশ অনেক বার ফোন করতে হয়েছে ঢাকায়। বাপ্পুর পারিবারিক বন্ধু এবং তার অনেক অনুগ্রহের পাত্র হলেও এই মানুষটির ত্যাগ এবং তিতিক্ষার কথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দায়িত্বশীলতা থেকে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি সংগঠক এবং সাংবাদিকেরা অনেক দূরে। ডি. কামাল এ খানের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশেও ভীষণ হীনমন্যতার প্রকাশ দেখলাম তাদের। সাংবাদিকদের পেশাদারীত্ব আর দায়বদ্ধতার এমন অভাব কাছে থেকে দেখতে হয়েছে আমাকে বার বার। গোষ্ঠী চিন্তা আর ব্যক্তিকেন্দ্রীকতা এবং স্বার্থপরতার উর্ধে উঠে একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবাধিকার সংগঠকের স্মৃতির প্রতি সামান্যতম দায়িত্বশীলতার পরিচয় ও দিতে পারলেন না কেউ। আমাদের দুর্ভাগ্য। যাই হোক কাজ করার পরিবেশ পাবো ভেবে এক সময়ে ঢাকায় এলাম। দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদকের কাছে গেলাম। বললাম, “আমি মোনাজাত উদ্দিনের মতো কাজ তুলে আনতে চাই প্রত্যন্ত জনপদ থেকে।” সম্পাদক আহমেদুল কবীর চাচা তখন গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি। বাবা তার ভীষণ স্নেহভাজন অনুজ। তিনি নিয়মিত বাবাকে ফোন করতেন ল্যান্ড ফোনে। আমি রিসিভ করলে তার ভরাট কন্ঠ শুনে শ্রদ্ধায় নত হয়ে যেতাম। তাকে আমার চাকরির কথা বলতে পারলাম না কেন যেন। বাবাকেও বলিনি। তখন মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বার্তা সম্পাদক। বললেন, “সুমি, আমি আসলে বুঝতে পারছি না আপনাকে কোথায় দেবো। দেখি, কী করা যায়। আপনার বায়োডাটা থাকলো আমার কাছে।” কিছুই হলো না। ১৯৯৯ সালে যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান জসীম চৌধুরী সবুজ আমাকে বললেন, “আপনি তো ভালো লিখেন, আমাদের পত্রিকায় আসেন।” অ্যাপয়েন্টমেন্ট হলো ফিচার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। আরো একজনের একই সাথে অ্যাপয়েন্ট হলো, তাদের কারো আগে কোন রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতা নেই। তারা পুরুষ বলেই তাদের রিপোর্টার হিসেবেই চাকরি হলো। নভেম্বর ১৯৯৯ থেকে নভেম্বর ২০০০। এর মধ্যে শিক্ষা বোর্ড এবং নারী নির্যাতন ইস্যুতে অনেক আলোচিত রিপোর্ট করেছি আমি। অনেক রিপোর্ট বাস্কেটেও ফেলে দেয়া হতো। এরকম একটি ঘটনা এসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছিলো স্ত্রীকে। অপরাধী স্বামীর ছবি জোগাড় করেছি অনেক কষ্টে। দেখলাম সেই ছবিটি ব্যুরোচীফ তার টেবিলের পাশে বাস্কেটে ফেলে দিলেন। অপরাধ কী? এখনো জানি না। একবছরের মাথায় আমাকে যুগান্তর ছাড়তে বাধ্য করা হলো। এর কারণটি এর আগে আরেকটি লেখায় আমি দিয়েছিলাম। তবু এখানে বলতে হচ্ছে-এক কিশোরী  গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণ করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। সেই রিপোর্ট করে আমি সাংবাদিক সমাজের চোখে অপরাধ করেছিলাম। ধর্ষণকারীর ছোটভাই এবং ভাগ্নী জামাই তখন প্রভাবশালী সাংবাদিক। প্রেসক্লাবে আমার বিচার বসলো আবুল মোমেন এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের নেতৃত্বে। যাই হোক, সে সময়ে সাপ্তাহিক ২০০০এর চট্টগ্রাম প্রতিনিধির দায়িত্ব পেলাম। প্রথম সারির পত্রিকার সাংবাদিকেরাও অপেক্ষায় থাকতো আমি সপ্তাহশেষে কী রিপোর্ট দিচ্ছি। দিন রাত খাটনি আর পরিশ্রম করে সপ্তাহের কাভার স্টোরী করতাম। চট্টগ্রাম থেকে একমাসে ৩/৪টা কাভার স্টোরী আমার থাকতো। আমি কাজ করার আগে চট্টগ্রামে পত্রিকার সার্কুলেশন ৭৫/একশ’ কপি  ছিল। আমার রিপোর্ট প্রকাশ হতে শুরু করলো আর ৫/৭ হাজার কপি পর্যন্ত সার্কুলেশন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, জাপানসহ অনেক দেশে সাপ্তাহিক ২০০০এর সার্কুলেশন। পাঠকদের অনেক চিঠি পাই। অস্ত্র, চোরাচালান, জঙ্গীবাদ, জামাত শিবিরের সন্ত্রাস নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে থাকি। তরুণ প্রধান প্রতিবেদক গোলাম মোর্তোজা এবং আরো অপেক্ষাকৃত তরুণ নির্বাহী সম্পাদক মোহসিউল আদনান প্রচন্ড সম্মান করেন এবং সহযোগিতা করেন। সাপ্তাহিক ২০০০ চট্টগ্রাম অফিস করা হয় আমাদের বাসারই একটি ছোট্টরুমে। ২০০২এর ২৮ নভেম্বর বিকেল ৪টায় আমার অফিস থেকে কোতোয়ালী থানার ওসি রুহুল আমিন সিদ্দিকী এবং এসআই ইয়াসমিন বেগমের নেতৃত্বে একটি দল এসে আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আমার ছোট ছেলেটার গায়ে সেদিন প্রচন্ড জ্বর। কনভেন্টে প্লেগ্রুপে পড়ে। একা একা পুলিশের গাড়ির পেছনে রাস্তায় চলে যায়, দু’চোখে জলের ধারা। তার মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, কারণ কিছুই বুঝতে পারছে না। আমার বাবা দুপুর বেলা একটু বিশ্রামে ছিলেন। অসুস্থ শরীরে লুঙ্গী পরা অবস্থায় পুলিশের জীপের পেছন পেছন সিএমপি হেডকোয়ার্টারে ছুটে যান। এসি ডিবির রুমে আমাকে দেখে তৎকালীন এসি ডিবি শফিকুর রহমানকে বাবা বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করলেন, “আমি তো পাকিস্তান সরকারের সময়ে অনেক জেল খেটেছি, নির্যাতন সয়েছি। এখন স্বাধীন দেশ। আমার মেয়েটাকে কেন ধরে আনলেন?” তিনি বললেন, তিনি কিছুই জানেন না। মোর্তোজা ভাইকে মোবাইল ফোনে জানালাম। আমার হাতে তখনো মোবাইল ছিল, এরপরেই সীজ করে নেয়। মোর্তোজা ভাইয়ের কাছে এসি ডিবি অস্বীকার করলেন তার রুমে আমার অবস্থানের কথা। সাড়ে ১১ ঘন্টায় দফায় দফায় ইন্টারোগেশান হয়। সিদ্ধান্ত ছিল রাতেই আমাকে ঢাকায় জয়েন্ট ইন্টারোগেশান সেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। রাত সাড়ে তিনটায় আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তার দু’দিন আগে সাংবাদিক সালিম সামাদ, প্রিসিলা রাজ, চ্যানেল ফোরের জাইবা মালিক এবং লিও পোল্ডো গ্রেফতার হন ঢাকা এবং বেনাপোল সীমান্ত থেকে। তাদের সাথে আমার কোন চেনা পরিচয় না থাকলেও তাদের সাথে আমাকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। সালিম ভাই পরে বলেছিলেন, ওনাদের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো তারা যদি সুমি খানকে তাদের কাজের সহযোগী হিসেবে বলেন, তাদের মুক্তি দেয়া হবে। তখন সালিম ভাইয়ের সাথে আমার কোন পরিচয় ছিল না। তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিস চৌধুরী বিবিসি এবং অন্যান্য মিডিয়াতে বলেন, “সুমি খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। এবার ছেড়ে দিলেও তাকে আবার ধরা হবে।” পরদিন জানতে পারি আমাকে ছেড়ে দেবার পেছনে আমার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, মাহফুজ আনাম, মতিয়া চৌধুরী এবং মালেকা বেগম, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ অনেকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। মালেকা খালাম্মা আম্মুকে বলেছেন, “নূরজাহান আপা, আপনি এখন সুমির মা শুধু নন, আপনি মহিলা পরিষদ নেত্রী। একটা মেয়েকে কিছুতেই রাতে থানায় রাখতে দেবেন না।” আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাকে বললেন, “আমি আইজিকে বলেছি, সুমি কেন্দ্রের সমন্বয়কারী। ওকে ১৯৯৫ সাল থেকে আমি চিনি। যদি ওর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ তোমরা প্রমাণ করতে না পারো, তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে না, মনে রেখো।” ২০০৪ সালের ২৭ এপ্রিল আমি একটি রিপোর্ট নিয়ে রাতের বেলা রিক্সায় করে এস এ পরিবহনে যাবার পথে অন্ধকার রাস্তায় সন্ত্রাসীরা আক্রমন করে। আমি অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলাম। এলাকার ছেলেরা আমাকে সেন্টার পয়েন্ট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সাংবাদিকেরা জানতে পেরে আমার বাসায় খবর দেয়। এর আগে থেকেই আমাকে বেশ কয়েকটা চিঠিতে মৃত্যুপরোয়ানা জারি করে হুমকি দেয়া হয়। আমি মুখে এবং হাতে বেশ আহত হই। আমার বড়ো ছেলে অতুলন ভয়ে আমার দিকে তাকাতো না। আমার ছোট ছেলে গহন তার ছোট ছোট মাটির পুতুলগুলো এনে আমার মাথার কাছে বসে বসে আমাকে খেলতে বলতো, যেন এতে আমার মন ভালো হয়ে যায়। এর মধ্যে ৩ মে ২০০৪ প্রেস ফ্রিডম ডে। হঠাৎ দেখি সালিম সামাদ আমাকে দেখতে চট্টগ্রাম চলে গেছেন। সেদিন ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি। সব অনুষ্ঠান ফেলে তিনি বললেন চট্টগ্রামে আমার বোন আক্রান্ত হয়েছে, তাকে আমার দেখে আসতে হবে। সেদিনই প্রথম তার সাথে পরিচয় এবং আপন বড়ো ভাই হিসেবেই তাকে বিপদের সময়ে চট্টগ্রামে পাশে পেলাম। সেই থেকে আজো আমার এই ভাইটির প্রতি আমার এবং আমার পরিবারের প্রত্যেকের বিনম্র শ্রদ্ধা। আক্রমনে আমার সামনের কয়েকটা দাঁত ভেঙ্গে গেছে, চোখের উপর ক্ষত, হাতের আঙ্গুল সোজা করতে পারতাম না। ভেবেছিলাম আর কখনো লিখতে পারবো না। দাঁতের চিকিৎসা চট্টগ্রামে করলাম। হাতের আর নার্ভের চিকিৎসা মাদ্রাজে করলাম। ধীরে ধীরে আমার আঙ্গুল স্বাভাবিক হয়ে আসে। একরকম পুনর্জন্ম হলো বলা যায়। জামাতের শীর্ষসন্ত্রাসী পরবর্তীতে বিএনপি নেতা আহমেদুল হক চৌধুরী আহমদ্যা জামাত সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ৯০ দিন সময় বেঁধে দিলেন, হয় শাহজাহান চৌধুরী থাকবে, নয়তো আহমদুল থাকবে। এসময় আমি চট্টগ্রামের ত্রাস আহমেদুর ইন্টারভিউ নেবার চেষ্টা করি। একজন সিনিয়র সাংবাদিকের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ হয়। আমাকে সময় দিয়েছিলেন সন্ধ্যা ৭টায়, আহমদু আসেন সাড়ে সাতটার দিকে। চট্টগ্রামের এক কাবাব হাউজের ভেতরে একটি টেবিলে বসলাম ভয়ংকর এ সন্ত্রাসীর ইন্টারভিউ নিতে। খোলামেলা আলাপে বললেন, ফুলকুড়ি আসরের মাধ্যমে তাকে কিভাবে ছাত্র শিবিরের রাজনীতি এবং অস্ত্র হাতে তুলে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির খুনের হোলিখেলায় নামিয়েছেন জামায়াত সাংসদ শাজহাজান চৌধুরী। তার কয়েকটি খুনের বর্ণনাও দিলেন। গয়েশ্বর রায়ের হাতে ফুলের মালা দিয়ে বিএনপিতে যোগদানের কয়েকটি ছবিও তিনি আমাকে দিলেন। সাপ্তাহিক ২০০০ টপ কভার ষ্টোরি করলো। মার মার কাট কাট সার্কুলেশন। আমার বাবা ভীষণ গর্ববোধ করলেন এই রিপোর্টের জন্যে। বিএনপি নেতা এবং সংগঠক জামালউদ্দিন অপহরণ হলেন ২০০৩ সালের ২৬ জুলাই। তিন বছর পর তার কঙ্কাল উদ্ধার করা হয় ফটিকছড়ির জঙ্গল থেকে। এই তিন বছর নানা রকমের গল্প। আমার এক অজানা সোর্সের মাধ্যমে আমি সঠিক তথ্যগুলো পেয়ে যেতাম। সেসব প্রকাশ হবার পর প্রমাণিত হতো তার সত্যতা। জামালউদ্দিনের নব্বই বছর বয়সী মা শুধু আমাকেই ইন্টারভিউ দিলেন। বললেন, “আমাদের রাখালের ছেলে সরওয়ার জামাল নিজাম এমপি আমার ছেলেকে খুন করেছে”। আমি ধারাবাহিক ভাবে জামালউদ্দিন অপহরণ এবং হত্যা নিয়ে রিপোর্ট করতে থাকি। এসময় চিকিৎসা করতে মাদ্রাজ গেছি, সরওয়ার জামাল নিজাম সাপ্তাহিক ২০০০ অফিসে ফোন করে মোর্তোজা ভাইকে বললেন, আপনাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি কী করে চট্টগ্রামে চলাফেরা করে আমি দেখে নেবো। এবার গোলাম মোর্তোজা বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন। সেখানে তিনি আশংকা প্রকাশ করে বললেন এভাবে প্রকাশ্যে আমাদের প্রতিবেদককে হুমকি দেবার কারণে আমরা তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। আমার কাজ থেমে থাকেনি। কিছুটা শংকা ছিল সন্তানদের নিয়ে। আমি চেষ্টা করতাম তাদের স্কুলে যাওয়া এড়িয়ে চলতে যাতে তাদের উপর হুমকি না আসে। ২০০৫ সালে তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করি। সৎ সাংবাদিকতা এবং প্রেস ফ্রিডম এর জন্যে বিশ্বের একজনকেই এই পুরস্কার দেয়া হয়। ইনডেক্স গার্ডিয়ান হুগো ইয়ং অ্যাওয়ার্ড। লন্ডনের সিটি হলে ২০০৫এর ৪ মার্চ আমাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। এরপরই নিউইয়র্ক থেকে পেলাম ইন্টারন্যাশনাল উইমেন মিডিয়া ফাউন্ডেশনের আই ডব্লিউ এম এফ ‘কারেজ অ্যাওয়ার্ড’। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিষ্ট সিপিজে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি তার আগেই। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পর অফিসের কারো কারো আচরণ ভীষণ বৈরি হয়ে গেলো। কাজ করা কঠিন হয়ে গেলো। ‘সিপিজে অ্যাওয়ার্ড’ নিতে অস্বীকার করলাম। বললাম তোমরা এই পুরস্কারের ঘোষণা দিও না। আমাকে কাজ করতে দাও। আমি কখনো কোথাও পুরস্কারের জন্যে আবেদন করিনি। পাঠকের স্বীকৃতিই আমার পুরস্কার। ‘আইডব্লিউ এমএফ কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ নিতে গেছি যখন তখন সিপিজে থেকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করে তারা একটি চেক দিয়ে আসে আমাকে। এসব নিয়ে পরে বিস্তারিত লেখবার ইচ্ছে আছে । এর আগে ডেমোক্রেসি ওয়াচ থেকে আমার কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায়। আমি দিতে অস্বীকার করি। পরে তারা ভীষণভাবে চেপে ধরে মানবাধিকার রিপোর্ট পাঠাতে বলে। সেদিন শেষ সময়। তাড়াহুড়ো করে জামালউদ্দিন অপহরণ মামলায় পুলিশ কাস্টডিতে নিহত ফটিকছড়ির কাশেম চেয়ারম্যানের ক্যাশিয়ার অমর কর (সম্ভবত, নামটা এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না) এর উপর সাপ্তাহিক ২০০০ য়ে  প্রকাশিত  রিপোর্ট পাঠাই। প্রথম আলো, ভোরের কাগজসহ সব পত্রিকার ‘বাঘা বাঘা’ রিপোর্টার তাদের রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন। দৈনিক পত্রিকার একজন রিপোর্টারতো অমর করের উপর প্রকাশিত তার রিপোর্টটিই পাঠিয়েছিলেন। পরে ডেমোক্রেসি ওয়াচ থেকে ফোন করে জানানো হলো চট্টগ্রাম বিভাগে শ্রেষ্ঠ মানবাধিকার রিপোর্ট অ্যাওয়ার্ড আমি পেয়েছি। ঢাকায় এসে এই রিপোর্ট নিতে গিয়ে পরিচয় হলো বিখ্যাত রিপোর্টার গৌরাঙ্গ নন্দীর সাথে। খুলনার শ্রেষ্ঠ রিপোর্টারের পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। পরে ডেমোক্রেসি ওয়াচের এহসান ভাই ফোন করে বললেন, “সুমি আপা, আপনি যে কিসের মধ্যে কাজ করছেন, আমরা কিছুটা বুঝতে পারছি।” আমি একটু অবাক হলাম তার কথা শুনে। বললেন, চট্টগ্রামের রিপোর্টারদের যা বকা আমাদের শুনতে হলো! তারা বলছে, “চট্টগ্রামে সুমি খান ছাড়া আর রিপোর্টার নাই আপনাদের চেনা? মেয়েমানুষ বলেই তাকে পুরস্কারটা দিতে হলো?” এহসান ভাই আরো বললেন, তাকে কিভাবে বিব্রত করা হয়েছে আক্রমনাতœক প্রশ্ন করে এবং ‘মেয়েমানুষ’কে পুরষ্কার দেবার মনগড়া অভিযোগে দায়ী করে। আমি মনে মনে এতো কষ্ট পেলাম, এতো হতাশ হলাম! কারো সাথে প্রতিযোগিতায়তো নামিনি। কারো কোন কাজেও ডিসটার্ব করিনি কখনো। নিভৃতে আমার কাজ আমি করে গেছি। তবু কেন তারা আমার উপর এতো ক্ষুব্ধ? আমি যখন হুগো ইয়ং অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করতে লন্ডনে, তখন সাংবাদিক গোলাম সরওয়ার এবং মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু দৈনিক সমকাল চট্টগ্রাম অফিসের টীম গোছাচ্ছেন। তারা আমার খোঁজ করলেন, আমার মায়ের কাছে লন্ডনে যোগাযোগের নম্বর চাইলেন। তখনো মাকে আমার হোটেলের নম্বর পাঠাতে পারিনি বলে মা তাদের আমার নম্বর দিতে পারলেন না। পরে দেশে আসার পর তারা আবার যোগাযোগ করেন আমার সাথে। এর মধ্যে আইডব্লিউএমএফ থেকে আমার তিনটি রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হলো নাইমুল ইসলাম খানের মাধ্যমে। আমার কোন ধারণা ছিল না আইডব্লিউএমএফ সম্পর্কে। এদের কোন পুরস্কার আছে সেটাও জানতাম না আমি। নাইম ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার কোন্ রিপোর্ট দেবো। আলোচিত কভার ষ্টোরি ‘সাতকানিয়া জামায়াতের রামরাজত্ব’, সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যার পর র‌্যাবের ক্রসফায়ার থেকে জামাত শিবিরের সন্ত্রাসীদের সুরক্ষা নিয়ে করা কভার ষ্টোরি এবং প্রপার ম্যাজিষ্ট্রেসির মাধ্যমে কোকো-১,২,৩,৪ জাহাজের জরিমানা করে ম্যাজিষ্ট্রেট মুনীর চৌধুরীর সাহসিকতার উপর প্রকাশিত রিপোর্ট ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিতে বললেন। আইডব্লিউএমএফ কারেজ অ্যাওয়ার্ডের বিজয়ী হিসেবে রিপোর্টার বিভাগে আমার নাম ঘোষণা করা হলো। নিউইয়র্ক থেকে টেলিফোন পেয়ে জানালাম নাইম ভাইকে। আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন নাইম ভাই। নাইমুল ইসলাম খান আমাদের সময়ে বেশ বড়ো করে এই সংবাদ প্রকাশ করলেন। দেশের অন্যান্য সব পত্রিকায় আমার এ পুরস্কারের সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রথম আলোতে প্রকাশ হলো না। এ নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ ছিল না। মুহম্মদ জাহাঙ্গীর এর একটি লেখা দেখলাম প্রথম আলোতে প্রকাশিত হলো, যেখানে তিনি এই সংবাদ না প্রকাশের জন্যে প্রথম আলোর কড়া সমালোচনা করেছেন। অন্য নারী সাংবাদিকদের প্রসঙ্গ এনে বলেছেন, তারা হলে নিশ্চয়ই ফলাও করে এ সংবাদ প্রকাশিত হতো। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সাথে তখন আমার পরিচয় ছিল না। পরে তার সাথে এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয়। তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি অন্তত একটি প্রতিবাদ তো একজন করেছেন! যাই হোক, এসবের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছিলাম ক্লান্তিহীন। এর মধ্যে ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের ‘গুলশান’ বলে পরিচিত খুলশী থানার সামনে তখনকার মূল্যে একশ’ কোটি টাকা, বর্তমান ৩শ’ সত্তর কোটি টাকা মূল্যমানের ২১৮ কাঠার একটি প্লট দখল করলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী ফাইয়াজ, তার মাকে সাথে নিয়ে। সে সময়ে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাকা চৌধুরীর গুডস হিলে সকাল বিকাল সালাম দিয়ে তাদের চাকরি রক্ষা করতো। ভুয়া পাওয়ার অব এটর্নী বানিয়ে পুলিশ আর সন্ত্রাসী নিয়ে রাতারাতি বাড়িটি দখল করে আনসার বাহিনী বসিয়ে দেয়া হলো। সেই জমির মালিক নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী ৫০ বছর ধরে। তার নামেই এই জমির দলিল। নিয়মিত ট্যাক্স দিয়েছেন, অনেক যতœ আর পরিচর্যা করে নানান ফল ফলাদি আর সেগুন মেহগিনির গাছ লাগিয়েছেন। একটি ছয়তালা আবাসিক ভবন, পেছনে এবং পাশে অনেক বৃক্ষরাজির ছায়াসুনিবিড় এই বাড়ির তিন ছেলেমেয়ে মার্কিন প্রবাসী। ছোট মেয়ে ডা. সাবরিনা সিদ্দিকী চট্টগ্রামে প্র্যাকটিস করছেন। তাদের সম্পত্তির সংবাদ সংগ্রহ করতে সব সাংবাদিকরাই গেলেন। আমি তো সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রতিনিধি মাত্র। প্রত্যেক সময়েই শুনতে হতো অন্যরা দৈনিকে, তাদের তাড়া আছে, আমার কি দরকার স্পটে গিয়ে রিপোর্ট করার! তাদের কাছে শুনে লিখে দিলেই তো পারি। সিনিয়রদের মুখের উপর সাধারণত: জবাব দিতাম না। একবার বলেছিলাম, আপনাদের অবজারভেশান আপনাদের মতো হবে, আমারটা আমার মতো হবে। হয়তো খারাপ হতে পারে, তবু আমি তো নিজে দেখে জেনে আসবো। বারবার স্পটে গেলাম। ছোট্ট একটা ক্যামেরা ছিল আমার, এটা দিয়েই অনেক আলোচিত ছবি তুলেছি। টিনশেড কয়েকটি বাড়ি ছিল, গার্লস হোষ্টেল হিসেবে ভাড়া দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম সিদ্দিকীর বড় মেয়ে। বাড়ির সামনেই গভর্ণমেন্ট উইমেন্স কলেজ। এ কলেজে অধ্যাপনা করতেন তিনি। ফাইয়াজের সন্ত্রাসী বাহিনী সেসব টিনশেড ঘর  গুড়িয়ে দিয়ে মাটিতে লাল শাকের গাছ পুঁতে দেয়। আনসার ক্যাম্প করে তাদের গোসলের পানির ট্যাংক বানানো হলো। সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে মেইন রোডের সাথে নতুন প্রবেশ পথ করে দেয়ালে রং করা হলো। আমি দেখলাম সিমেন্ট, ইট সুড়কি দিয়ে কাজ করছে। দ্রুত কিছু ছবি তুলে ফেললাম। নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী এবং তার স্ত্রী দু’জনেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন  কাছাকাছি একটি বাসা ভাড়া নিয়ে তাদের রাখলেন ছেলেমেয়েরা। সিএমপির ডিসি নর্থ তখন আব্দুল্লাহেল বাকী। তার ইন্টারভিউ নিলাম। প্রশ্ন করলাম এভাবে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কেউ নিরীহ জনগণকে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে কিনা। তিনি নতুন করে তদন্ত করলেন এবং ঢাকায় পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেন সাপ্তাহিক ২০০০এর সুমি খান এই বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট করছেন। আমার ছবিগুলো দিয়ে সাপ্তাহিক ২০০০এর জন্যে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বৃহস্পতিবার পাঠিয়ে দিলাম। গোলাম মোর্তোজা রিপোর্টটি পেয়ে বললেন, “আচ্ছা, সুমি আপা, চট্টগ্রামের সব সাংবাদিকতো এই ঘটনা জানে। কেউ আপনার মতো করে এই ঘটনাটা তুলে ধরলো না কেন?” বললাম, “আমি কী করে জানবো মোর্তাজা ভাই, আমার কাজটা আমি করেছি।” তখন সাপ্তাহিক ২০০০ শনিবার পেষ্টিং হতো, সোমবার বাজারে পাওয়া যেতো। কোন এক শনিবার বিকেলে (তারিখটা এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না) ফাইয়াজকে ফোন করলাম অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য নেবার জন্যে। তিনি হেসে উড়িয়ে দিলেন তার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ। বললেন “আমি আমার অসুস্থ্য মাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়া-আসায় ব্যস্ত। কারা এসব বলে?” আমি তার কমেন্ট টেলিফোনে জানিয়ে দিলাম মোর্তোজা ভাইকে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে তিনটা সিএনজি থ্রি হুইলারে করে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী এলো আমাদের বাসায়। আমার মায়ের তিনটা কুকুর খাঁচার ভেতর থেকে এক সাথে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আমি দোতলা থেকে বেরিয়ে দেখলাম উঠোনে মোল্লা বেশধারী কালো চশমা পরা জাকির হোসেনসহ সেই মুখগুলো, যাদের নজরুল সিদ্দিকীর বাড়ি দখল করার সময়ে দেখেছি। নিচে নেমে এলাম। যাতে তারা বাসায় ঢুকে আমার পরিবারের সদস্যদের আক্রমন না করে।  সেই জমির ভুয়া পাওয়ার অব এটর্নী দাবিদার জামাতি নেতা জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি হলাম। একদম নির্বিকার ভাবে বললাম, “আপনারা কার কাছে, কেন এসেছেন?” তারা জিজ্ঞস করলো সাপ্তাহিক ২০০০ অফিস কোনটা। দেখালাম, সিঁড়ির গোড়ায় অফিস তখন তালাবদ্ধ। তারা কিছুটা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ভেবেছিলো আমি তখন রিপোর্ট লিখছি। আমাকে স্তব্ধ করে রিপোর্ট আটকাবে। এখন তাদের করণীয় কী? আমি জানতে চাইলাম। বললাম, “আপনাদের বক্তব্য থাকলে বলেন আমি ঢাকায় জানিয়ে দেই।” সে সময় আমার সাথে ক্যামেরা ছিল না যে তাদের ছবি তুলে রাখবো। আমার মায়ের অ্যালসেশিয়ানের ঘেউ ঘেউ থামানোর জন্য খাঁচার সামনে গেলো, তাদের মোবাইলে ছবি তুললো। বাড়ির পেছন দিকে হেঁটে রেইকি করে এলো। এরই মধ্যে বাবা  ছুটে বেরিয়ে এলো। আমাকে ডেকে নিলো, যাতে আমি সামনে না যাই, বাবা সামনে যাবেন, কথা বলবেন তাদের সাথে। জাকির হোসেন গ্রাম্য টাউটের মতো করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বাবাকে বললো, “আপনার মেয়ে নাকি? বিয়েশাদী দেবেন না।” আমি তাদের কথা বলতে বলতে গেটের বাইরে নিয়ে গেলাম। বললাম, “আবারো বলছি, আপনাদের কথা থাকলে বলে যান, ঢাকায় জানিয়ে দেবো”। তারা তখনো বুঝতে পারেনি আমার রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে এবং প্রকাশ হতে চলেছে। পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখলাম কোন এক তারেক বা একজনের নামে রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়েছে। আমার নাম দেয়া হয়নি। এরপরও সবাই বুঝতে পেরেছে কার রিপোর্ট। অনেক ফোন কল পেলাম। পুলিশ কমিশনার বদলে গেলো আনসার তুলে নেয়া হলো। নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী তার পরিবার নিয়ে আবার সেই বাড়িতে উঠলেন। আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। তার পুত্র হাবিব সিদ্দিকীর পাঠানো একটি মেইল এ প্রসঙ্গে তুলে ধরলাম।   Ms. Shumi Khan The Shaptahik 2000 Chittagong, Bangladesh   Dear Ms. Khan,   My sister Dr. Sabrina Abedin and her husband Ainul Abedin (Naushad) promptly sent the piece on your interview and investigative reporting from Mr. Tareq Hasan Sajal: (http://www.shaptahik2000.com/shonkha/2005/20050527/pp20050527B.pdf). Soon thereafter I wanted to thank you personally for the courage in journalism that you and your associates have shown. Then came the good news about restoration of ownership rights to our property at Khulshi, Chittagong. This could not have happened without the coverage that your Weekly had provided on our property. Without any further delay, on behalf of the Siddiqui family let me take this opportunity in thanking you from the core of my heart. Your courageous reporting epitomizes journalism at its best and showed the world that you are neither afraid nor shy from performing your civic and moral duties. It was a superb job. It showed the power of pen over pistol, and of bravery over bullets. No words of anyone from our extended family - living in Bangladesh and the United States - would ever be able to express our sincere gratitude to you and your Weekly for what you have achieved for us. You helped us gain ownership to our once-robbed property. No small task, by any measure, given the fact that the odds were too much to discount. How often could one succeed in restoring oneÕs legitimate rights in the face of a powerful politician like the one we were faced against? Truly, April 9 was like a nightmare to our family, wrecking havoc to our innocence, questioning goodness of human beings, let alone providence. We asked: how could this crime happen, why us, and whoÕs there to redress it? Is this going to be forgotten like many such untold stories of victims? But, you and your associates in the Weekly 2000 made the difference. They did not allow it to be forgotten in the subconscious of Bangladesh. You made it a national issue by exposing the crime. In that process, you energized and motivated the very people who could make the difference.  It obligated the police force to act. And they did. Soon thereafter, Mr. Abdullahel Baki, the Deputy Police Commissioner – Chittagong-North – investigated firsthand our case, and made the necessary recommendations in his report to ease our pains. And eventually the CMP got involved and did what we have always hoped they ought to do in a civil society that is not mortgaged to criminals and mafia-bosses. Your Weekly stopped the tears in our eyes, and rejuvenated our faith. Like many others, we can now dream once again. When I visited Bangladesh between April 16 and May 9, I frantically searched for a Òhuman beingÓ in the midst of so many of our people – mostly high-placed government officials and was not sure if I had found one. But, now I know there are such honorable beings that are willing to do what is right and just. They are like the torchbearers in the darkest alley of our exhausting journey. This is such a wonderful feeling! I shared your weekly piece and our story with our expatriate professional community living in North America.  They all are grateful for the helping hand you had provided to one of their own in times of distress. They feel reassured. On behalf of the expatriate community now living in the United States and Canada, let me convey once again my sincerest appreciation and gratitude to you for the courage and truth in journalism that you and your Weekly 2000 had shown. Without such timely involvement and coverage, I don't know how much more suffering was out there for our family to endure. I also pray and hope that we have witnessed the last of such painful experiences involving our properties in Khulshi, Chittagong. With best regards,   Habib Siddiqui, Ph.D. Philadelphia, USA [email protected]   এক সময়ে টের পেলাম, আমি পেশাগত ভাবে আরো বিপন্ন হয়ে যাচ্ছি। ২০০৪ সাল থেকেই শাহাদাত চৌধুরী খুব অসুস্থ ছিলেন, অফিসে আসতে পারতেন না। ২০০৫ সালে মারা যান তিনি। সাপ্তাহিক ২০০০ অফিস থেকে বেরুতেই গলির মুখে পারভেজ চৌধুরী এবং স্বীকৃতি বড়ুয়া ডেকে বললেন, একদিন এনটিভির সন্ধ্যায় প্রোগ্রামে অতিথি হতে হবে আমাকে। পরদিন আমি অফিসে গিয়ে এই প্রোগ্রামের কথা বলার সাথে সাথে সাপ্তাহিক ২০০০এর কোন একজন আমাকে প্রচন্ড মানসিক চাপে ফেললেন। বললেন আমি যেন তার অনুমতি না নিয়ে দেশী-বিদেশী কারো সাথে কোন ইন্টারভিউ না দেই। যতোক্ষণ অনুমতি পাবো না ততোক্ষণ আমার কারো সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো একরকম। জবাবে কিছু বললাম না। সেই দিনই গোলাম সরওয়ার এবং মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর সাথে দেখা করলাম। মঞ্জু ভাই হেসে বললেন, “তোমাকে আরো নয় মাস আগে জয়েন করতে বলেছি। যারা জয়েন করেছে তারা এই নয়মাস ড্যামি পিরিয়ডেও বেতন পেলো। তুমিও পেতে। এর পরের মাস থেকেই চাকরি হয়ে গেলো। মনের মধ্যে সব বেদনা চেপে রেখে এনটিভির ‘আজকের সন্ধ্যায়’ অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকারে প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। প্রোগ্রামের রেকর্ডিং শেষে সাপ্তাহিক ২০০০ অফিসে এসে বললাম আপনাদের সবার নাম বলেছি আমার কৃতজ্ঞতায়। একই সাথে জানালাম, আমি সমকালে জয়েন করছি। মোর্তোজা ভাই বেশ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কে আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে। বললাম, সরওয়ার ভাই আর মঞ্জু ভাই। বললেন “হ্যাঁ, দৈনিক পত্রিকাগুলোতে যে নারী সাংবাদিকরা আছেন, নারী পাতা করছেন, এমন কী করছে উল্লেখ করার মতো? আপনি কাজ করেন নিশ্চয়ই ভালো কিছু করতে পারবেন। আমাকে প্রথম ঢাকায় থেকে নারী পাতার দায়িত্ব নেয়া এবং অন্যান্য রিপোর্ট করার কথা বললেও হঠাৎ মঞ্জু ভাই বললেন চট্টগ্রাম অফিসে জয়েন করতে। বললেন, “সুমি, আপনি আমাদের চট্টগ্রাম অফিসটা গুছিয়ে দিয়ে আসেন, প্লীজ।” বললাম, “কিন্তু চট্টগ্রামে যাদের আপনারা নিয়েছেন তারা আমাকে কোন কাজ করতে দেবে না মঞ্জু ভাই।” মঞ্জু ভাই মানলেন না। সাপ্তাহিক পত্রিকার ৫ হাজার টাকা বেতন থেকে ১৮ হাজার ৫শ’ টাকা বেতনে সিনিয়র রিপোর্টার পদে ঢাকায় জয়েন করে চট্টগ্রামে চলে যেতে হলো। আমাকে চট্টগ্রামের আরেক সিনিয়র রিপোর্টার কাজী মনসুর ফোন করলেন। তার ভয়, আমাকে না আবার তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেয়া হয়। তবে আমাকে বললেন, আপনি চট্টগ্রামে এসে আমার সাথে একটু আগ্রাবাদে বসেন, হেলাইল্যাকে (ব্যুরো চীফ হেলাল উদ্দিন চৌধুরী) বের করে দিতে হবে যেমনে হোক।” এ ধরণের অরুচিকর অশালীন কথায় আমি অভ্যস্ত না। বললাম, “দ্যাখেন ভাই, আমি তো কাজ করতে যাবো। রাজনীতি করতে যাবো না। আমার পক্ষে আপনার সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব না।” সেই অসুস্থ্য, অন্যায় চর্চায় যোগ না দেয়াই আমার কাল হলো। এরপর যতো রকমের নোংরামী সম্ভব সব করেছে মনসুর। সাথে নীরব সহায়ক হয়েছিলেন ব্যুরো চীফ হেলাল উদ্দিন চৌধুরী। এক সময়ে আমাকে ছাড়তে হলো সমকাল। পরে সমকালের ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কোনভাবে কনভিন্স করে হেলাল উদ্দীন চৌধুরীকে বের করে দিতে সক্ষম হলেন মনসুর। বিস্ময় জাগে মনে, সাংবাদিকতা কি এখন কালো টাকা, নোংরামীর লড়াইয়ের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে! একদিন হঠাৎ জয়ন্ত আচার্যের টেলিফোন পেলাম, বললেন আলমগীর ভাই চাইছেন আমি তার সাথে বিডিনিউজ আর একাত্তরে কাজ করি। আমি আলমগীর ভাইকে তখন চিনতাম না। একটু অবাকই হলাম। যাই হোক আমার চাহিদা মতোই ২৫ হাজার টাকা বেতনে সমকাল ছেড়ে বিডিনিউজ এবং সাপ্তাহিক একাত্তরের রিজিওনাল এডিটর হিসেবে যোগ দিলাম ২০০৬ সালে। এ পর্যন্ত এক মুহুর্তের জন্যেও কর্মহীন থাকিনি। আলমগীর হোসেনের সাথে পরিচয় হলো। সংবাদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ, তার মেধা এবং প্রচন্ড পরিশ্রমী আচরণ তার প্রতি আমাকে অনেক শ্রদ্ধাশীল করে তুললো। কিন্তু তিনি বিডিনিউজ বিক্রি করে দিলেন। একাত্তরও বন্ধ হয়ে গেলো। আমার ছয় মাসের বেতন পাওনা রয়ে গেলো। শুনলাম জয়ন্ত’দা বিজ্ঞাপনের টাকা থেকে তার পাওনা টাকা নিয়ে নিয়েছেন। আমার আর প্রাপ্য বেতন কপালে জুটলো না। ২০০৬এর ডিসেম্বর থেকে একুশে টেলিভিশনের সাথে কাজ শুরু করি। আমাকে চেয়ারম্যান সালাম সাহেব একদিন ডেকে বললেন, “আপনার রিপোর্টিংয়ের অনেক গল্প শুনেছি। আপনাকে সিক্রেট ক্যামেরা দেবো, সাহসী কিছু রিপোর্ট করে আনতে পারবেন তো? কিন্তু আপনাদের সাংবাদিক নেতা যিনি এখানে আছেন, তিনি আপনাকে একেবারেই চাইছেন না। আপনার সিভি নিচ্ছেনই না। কেন বলেন তো?” মাথা নিচু হয়ে গেলো। মাথা তুলে তাকিয়ে বললাম, “সেটা তিনিই ভালো জানবেন স্যার, আমার যে জানা নেই!” এর কিছু দিন পর শাহ আলমগীর জয়েন করলেন। ইটিভি চেয়ারম্যান বললেন, শাহ আলমগীরকে আপনার সিভি দেয়া হলো, তিনি দেখছেন আপনি কাজ শুরু করে দেন। জানুয়ারী থেকে অফিস করলাম। সম্ভবত: ১৯ মে ২০০৭ ব্যাকডেটে ১৫ মে তারিখে আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিতে বাধ্য হয় এইচ আর প্রধান রুহুল আমিন। আমার সিভি সাতবার হারালো, আটবার দিতে হলো। এ ধরণের ঘটনা ঢাকায় বারবার আমাকে আঘাত করেছে। আমার কাজ ঠেকানোর জন্যে, কাজকে সবসময় মূল্যায়ন করা হয় না আমাদের এ পেশায়। সেসব পরে অন্য কোন দিন বলা যাবে। আমি নারী। আমি সততার সঙ্গে কাজ নিয়ে এগিয়ে যাবো। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও এভাবে সকল সংকট পায়ে দ’লে এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর! শুভ কামনা থাকলো সকল সাংবাদিক সহকর্মীর প্রতি। লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার