ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ৩:২৩:২৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সারা দেশে অবাধে শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ নিবন্ধন নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ দফা সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ ইরানের পরিস্থিতি খারাপ হলে কঠোর হবে তুরস্ক

সীমানা নিয়ে আদালতের আদেশ, ভোটে বিপত্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৩৪ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

তপশিল ঘোষণার পরও সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে একাধিক রিট চলছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। 

তবে ইসি এবারের নির্বাচনে যে ৪৬ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছিল, এর ১৪টি নিয়ে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে আদেশ দিয়েছেন। পাবনা-১ এবং পাবনা-২ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেট আদালত স্থগিত করায় আসন দুটির ভোটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। 

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধান ও আইনে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না রাখা হলেও সর্বোচ্চ আদালত তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে তা শুনতে পারেন। কিন্তু যে বিষয়ে ইসিকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, তা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির কাছেই থাকা উচিত। নয়তো নির্বাচন বিঘ্নিত হতে পারে। অতীতে সীমানা নির্ধারণে ইসির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। আদালতে গেলেও ইসির সিদ্ধান্তই কার্যকর ছিল।

গত জুলাইয়ে নির্বাচন কমিশন ৩৯ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। এ নিয়ে আপত্তি এলে, তা নিয়ে পরের মাসে আপিল শুনানি করে ইসি। ৪ সেপ্টেম্বর সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেট জারি করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। এতে ৪৬টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আসে। 

এর মধ্যে বড় বদল আসে গাজীপুর এবং বাগেরহাট জেলার ৯টি আসনে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গাজীপুর জেলার আসন সংখ্যা পাঁচ থেকে বাড়িয়ে ছয়টি করেছিল ইসি। বাগেরহাট জেলায় আসন সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে তিনটি করা হয়। এ নিয়ে  করা রিটে হাইকোর্টের আদেশে ইসি গাজীপুর জেলায় পাঁচটি এবং বাগেরহাট জেলায় চারটি আসন পুনর্বহাল রেখে ১১ ডিসেম্বর সংশোধিত গেজেট জারি করে। 

ওই দিন তপশিল ঘোষণার পর হাইকোর্ট পৃথক মামলায় ফরিদপুর-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত ভাঙ্গা উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদকে ফরিদপুর-২ আসনে যুক্ত করে সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেট স্থগিত করেন। স্থগিত করেন পাবনা-১, পাবনা-২, কুমিল্লা-১ এবং কুমিল্লা-২ আসনের সীমানা নির্ধারণের গেজেট। কুমিল্লা-১ এবং কুমিল্লা-২ আসনে সীমানার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ গতকাল রোববার স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ। রংপুর, বরগুনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার চারটি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেট স্থগিত চেয়ে করা চারটি রিট শুনানির অপেক্ষায় আছে। 

সংবিধান ও আইনে কী বলা হয়েছে

পার্বত্য তিন জেলায় একটি করে আসন থাকবে। অন্যান্য জেলায় কমপক্ষে দুটি করে আসন থাকবে। বাকি জেলায় আসন সংখ্যা হবে জনসংখ্যা ও ভোটারের অনুপাতে। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। প্রতি আসনের গড় ভোটার সোয়া চার লাখ। 

সংবিধানের ১১৯ (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইসির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ। অর্থাৎ, ইসি ছাড়া আর কেউ সীমানা নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে না। ১২৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদের প্রণীত আইন অনুযায়ী ইসি নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে। এই অনুচ্ছেদ ১৯৭২ সালের পর আর পরিবর্তন হয়নি। 

সীমানা নির্ধারণ আইন-২০২১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনা করে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করবে। যাতে ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় থাকে এবং সর্বশেষ জনশুমারিতে উল্লিখিত জনসংখ্যার যতদূর সম্ভব গড়ের কাছাকাছি হবে। এ আইনের ৬(৪) ধারায় বলা হয়েছে, সীমানা নির্ধারণে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল বা বিচ্যুতি থাকিলে তাহা সংশোধন করিয়া ইসি গেজেটে প্রকাশ করিবে।

আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক জনশুমারির পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসি সীমানা নির্ধারণ করবে। ২০২২ সালে সর্বশেষ জনশুমারি হয়েছে। এর পর ২০২৪ সালে নির্বাচন হয়েছে। আর জনশুমারি না হলেও আইনের ৮(খ) ধারায় ইসিকে নির্বাচনের আগে সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। 

সংবিধান, আইনে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই

ইসি সংসদীয় আসনের যে সীমানা নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে আদালতে মামলা, রিট বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়নি সংবিধানে। সংবিধানের ১২৫(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানে যা বলা হয়েছে, তা সত্ত্বেও ১২৪ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত বা প্রণীত বলে বিবেচিত নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ, কিংবা অনুরূপ নির্বাচনী এলাকার জন্য আসন বণ্টন সম্পর্কিত যে কোনো আইনের বৈধতা সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’

সীমানা নির্ধারণ আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীনে করা সীমানা নির্ধারণ বা কোনো আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার গঠন বা কমিশন কর্তৃক বা কমিশনের কর্তৃত্বাধীনে গৃহীত কোনো কার্যধারা বা কৃত কোনো কাজকর্মের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’

১৯৭৩ সালের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনের সংসদীয় আসনের সীমানায় বড় পরিবর্তন হয়। ঢাকা জেলার আসন সংখ্যা ১৩ থেকে বৃদ্ধি করে ২০ করা হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর জেলায় একটি আসন বৃদ্ধি করা হয়। কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর জেলায় একটি করে আসন কমে। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত একটি আসনও কমে তখন। একইভাবে বরিশাল ও পিরোজপুরের কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত আসন কমলেও বরিশালে আসন বৃদ্ধি পায়। কমে পিরোজপুর থেকে।

২০০৮ সালেও আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট হয়েছিল। তবে সীমানা নির্ধারণ ইসির দায়িত্ব– এ কারণে আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

এবারের রিটের বিষয়ে একাধিক আইনজীবী এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তবে আদালতের বিচারাধীন বিষয় হওয়ায় তারা সংবাদমাধ্যমে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সংবিধান ও আইনের স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় সীমানা নির্ধারণে ইসির সিদ্ধান্তই বহাল রাখা উচিত। নইলে নির্বাচন বারবার ব্যাহত হবে। কারণ, নির্বাচনের আগে যদি কোনো আসনের পুনর্নির্ধারিত সীমানার গেজেট বাতিল হয়, তাহলে ওই আসন এবং আশপাশে যেসব আসন থেকে এলাকা সংযোজন বা বিয়োজন করা হয়েছে, সেগুলোরও নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এর তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বোধ করলে যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। সংবিধান ও আইনে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রহিত করা হলেও আদালত এ বিষয়ে রিট শুনতে পারেন বলে মনে করেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, যে কোনো বিষয়েই আদালত শুনানি করতে পারেন। কারণ, সাধারণ আইন হলো, যে কোনো ব্যক্তি আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন। কিন্তু সীমানা পুনর্নির্ধারণ মামলায় ইসিকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়ে তারপর আদেশ দেওয়া উচিত।

সংবিধানের ১২৫(গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তপশিল ঘোষণার পর কোনো আদালত নির্বাচনের বিষয়ে ইসিকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো আদেশ বা নির্দেশ প্রদান করবেন না। এই অনুচ্ছেদের উদাহরণ দিয়ে বদিউল আলম বলেছেন, ‘আদালতের এমন কিছু করা কাম্য নয়, যা নির্বাচনকে বিঘ্নিত করতে পারে। শুনানিতে ইসির অংশগ্রহণ থাকতে হবে।’

কুমিল্লা-১ ও ২ আসন পুনর্বহালের আদেশ স্থগিত 

কুমিল্লা-১ ও ২ আসনের সীমানা পরিবর্তন করে জারি করা ইসির গেজেট স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। ইসির করা পৃথক আবেদনে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক গতকাল রোববার এ আদেশ দেন। 

এর আগে এক রিটে গত ৮ জানুয়ারি কুমিল্লা-১ ও ২ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের গেজেট স্থগিতের রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। রায়ে আগের মতো দাউদকান্দি-তিতাস উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা-১ এবং হোমনা-মেঘনা উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা-২ আসন পুনর্বহালের আদেশ দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গেজেট প্রকাশে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ রায় কার্যকর করলে কুমিল্লা-১ ও ২ আসনেও নতুন করে তপশিল ঘোষণা করতে হবে। তবে চেম্বার জজ রায়টি স্থগিত করায় তা আপাতত করতে হচ্ছে না। আপিল বিভাগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। 

পাবনায় নির্বাচন স্থগিতে প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ 

পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়ার আংশিক) ও পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়ার আংশিক) আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিতে ক্ষোভ জানিয়েছেন প্রায় সব প্রার্থী। ইসির এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন চেয়ে পাবনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান মোমেন নির্বাচন কমিশনকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন। 

তিনি বলেন, আদালত নির্বাচন বন্ধের আদেশ দেননি। সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগরবাসীর ভোটাধিকার নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। 

স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ ফেসবুক পোস্টে লেখেন, একটি অশুভ কালো ছায়া ভর করেছে, যা গত ৫৪ বছরেও হয়নি।

পাবনা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী শামসুর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, আসন নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আসন নিয়ে শুধু নির্বাচন কমিশন ছিনিমিনি খেলেছে এমন নয়; পতিত, পরাজিত শক্তিও জড়িত। 

পাবনা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্তে এলাকায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই আসনের জামায়াতের প্রার্থী কে এম হেসাব উদ্দিন বলেন, নির্বাচন স্থগিতে ষড়যন্ত্র আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে।