ঢাকা, শুক্রবার ০৩, জুলাই ২০২৬ ২১:২৮:৫২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর প্রাণহানী নারী উন্নয়নে সরকার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে: পানিসম্পদমন্ত্রী ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৫৯৫ এফডিসিতে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে শিল্পী সমিতির নির্বাচন নাটকীয় ম্যাচে প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে শেষ ষোলোতে পর্তুগাল অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

আজও বাল্যবিয়ের অন্ধকারে বাংলাদেশ

জোসেফ সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:০৭ পিএম, ৩ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

আইন আছে, অভিযান আছে—তবু থামছে না অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাদের বিয়ে; দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

মাত্র ১৫ কিংবা ১৬ বছর বয়স। হাতে থাকার কথা বই-খাতা, স্কুলব্যাগ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই বয়সেই অনেক কিশোরীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, পড়াশোনার ইতি এবং জীবনের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া—এ যেন বাংলাদেশের হাজারো কিশোরীর নিত্য বাস্তবতা।

আইনগতভাবে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো গোপনে কিংবা সামাজিক চাপে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা, সামাজিক কুসংস্কার এবং শিক্ষার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। বিশ্বে বাল্যবিবাহের হারেও বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম উচ্চ, অষ্টম।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও সংকট এখনো গভীর। সর্বশেষ তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হওয়া মেয়েদের হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় এ হার শহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

কেন থামছে না বাল্যবিবাহ?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাল্যবিবাহের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ একে টিকিয়ে রেখেছে।

দারিদ্র্য অনেক পরিবারের কাছে মেয়ের বিয়েকে অর্থনৈতিক বোঝা কমানোর উপায় হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, মেয়েকে বেশি দিন বাড়িতে রাখলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাধ্যমিকের আগেই স্কুল ছেড়ে দেওয়া কিশোরীদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সংকটও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

স্বপ্ন থেমে যায় বিয়ের পিঁড়িতে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি শিশু অধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম গুরুতর উদাহরণ।

অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হওয়া অধিকাংশ কিশোরীই পড়াশোনা শেষ করতে পারে না। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।

সাধারণ মানুষের মত

রাজশাহীর এক অভিভাবক বলেন, "গ্রামে এখনো অনেকেই মনে করেন, মেয়ের বয়স বাড়লে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। তাই সুযোগ পেলেই কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন।"

বরিশালের এক কলেজশিক্ষক বলেন, "অনেক মেধাবী ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এতে শুধু একটি মেয়ের নয়, পুরো সমাজের ক্ষতি হয়।"

ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, "আইন আছে, কিন্তু আইন মানানোর ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।"

বিশেষজ্ঞদের মত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহ কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। কিশোরীদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি সমানভাবে জরুরি।

নারী ও শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইমাম, শিক্ষক, কাজি এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বাল্যবিবাহ নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রতিটি বিয়ে নিবন্ধনের আগে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের বক্তব্য

নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কিশোরী ক্লাব, সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্থানীয় প্রশাসনের অভিযান এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে বন্ধও করা হয়েছে। তবে সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

সম্মিলিত উদ্যোগই পারে পরিবর্তন আনতে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। প্রতিটি মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং গণমাধ্যম—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

একটি কন্যাশিশুর বিয়ে যতটা ব্যক্তিগত ঘটনা মনে হয়, বাস্তবে তা একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। কারণ একটি মেয়ের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে একটি পরিবারের সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া, একটি সমাজের অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়া। তাই বাল্যবিবাহ রোধে এখনই আরও কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা, শিক্ষা এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।