ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৭:০৭:২৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে আইন

আপডেট: ০৩:৫৯ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০১৪ বুধবার

জাহাঙ্গীর আলম সরকার : নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে আশির দশকের শুরু থেকে বিশেষ আইন প্রণয়ন শুরু হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা কঠোরভাবে দমনের জন্য ১৯৮৩ সালে একটি আ্জইন জারি করা হয়। কিন্তু এই আইন নারী নির্যাতন কমাতে তেমন একটা সফলতা পায়নি। ফলে প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় আরও কঠোর আইনি কাঠামোর। ১৯৯৫ সালে পাস হয় নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন। এর ফলে নারী নির্যাতন কিছুটা হ্রাস পেলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। অবশেষে সেই আইনটি বাতিলক্রমে ২০০০ সালের 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন' প্রণয়ন করা হয়। আইনটিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন করে আইনটিকে আরো শক্তিশালী করা হয়। বর্তমানের আইনটি এত বেশি শক্তিশালী যে অনেক সময় এর অপব্যবহার হচ্ছে। সম্প্রতি নারী নির্যাতন যে বেড়ে চলেছে, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান তার প্রমাণ। নির্যাতন বাড়লে মামলাও বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে এ আইনটিকে পুরুষদের হয়রানি করতে অপপ্রয়োগ যে করা হচ্ছে তারও ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। দেখা গেছে, যে পরিমাণ মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয় তার মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি মামলা দায়ের করা হয় মিথ্যা, ভুয়া ও অসত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ফলে শেষ অবধি এসব মামলার অনেকগুলোই প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় যদি নারাজি করা হয়, নারীর প্রতি সহানুভূতির জায়গা থেকে সে নারাজি অধিকাংশ সময় গ্রহণ করে থাকেন আদালত। যদিও থানা-পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, অসত্য ঘটনার ওপর মামলা করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে এমন কিছু বিচারকও আছেন, যারা বিচার প্রক্রিয়ায় আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখযোগ্য। মাাস ছয় আগে জয়গুন নামের এক মহিলা তার প্রতিবেশী মকবুলকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ৯(৪) ধারায় ধর্ষণের চেষ্টার মামলা করেন। নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় দায়ের করা মামলায় কর্তৃপক্ষ সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, 'ঘটনার দিন দুপুর অনুমান ১:০০ ঘটিকার সময় বাদিনী তার বাড়ি-সংলগ্ন তিস্তা বাজারের দক্ষিণ পাশে বসে ধান শুকাচ্ছিল এবং আসামী মকবুলের স্ত্রীসহ আরও অনেকে পাশে বসে কথা বলছিল। এমতাবস্থায় আসামী মকবুল হোসেন তিস্তা বাজারের মোড়ের দোকানে কেনাকাটা করে বাড়িতে যাওয়ার পথে বাদিনী তাকে দেখে হাসি-ঠাট্টা করে। তখন মকবুল হোসেনের স্ত্রী বাদিনীর কাছে তার স্বামীকে দেখে হাসি-ঠাট্টা করার কারণ জানতে চাইলে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া বাঁধে। এক পর্যায়ে মকবুল হোসেনও বাদিনীকে গালিগালাজ আরম্ভ করে। পরবর্তীতে বাজারের লোকজন এসে তাদের ঝগড়া ভেঙ্গে দেয়। উক্ত ঘটনার জের ধরে সেদিন সন্ধ্য বেলায় মাগরিবের নামাজের পূর্বে অর্থাৎ বিকাল ৫টার সময় মকবুল হোসেন বাই-সাইকেলযোগে বাদিনীর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে 'সুটিবাড়ী' হাটে যাওয়ার পথে বাদিনীর সঙ্গে দেখা হলে মকবুল হোসেনকে লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং উভয়ের মধ্যে পুনরায় ঝগড়াঝাটি সৃষ্টি হয়। ঘটনাচক্রে বাদিনী মকবুল হোসেনের বাই-সাইকেল টেনে ধরলে মকবুল বাদিনীকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে উক্ত ঘটনার বিষয়ে বাদিনী তার স্বামীসহ রাত অনুমান ৭টার সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে গিয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ প্রদান করে এবং ঘটে যাওয়া ঝগড়াঝাটি ও মারপিটের বিচার প্রত্যাশা করে। চেয়ারম্যান সাহেব বিষয়টি লিখিতভাবে পরিষদে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ প্রদান করেন। কিন্তু জয়গুন তা না করে মকবুল হোসেনকে হয়রানি করার জন্য সামান্য ঝগড়াঝাটির প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে মনগড়া ঘটনা সাজিয়ে বিজ্ঞ আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯(৪)খ ধারার অধীনে মকবুলকে আসামি করে নীলফামারী জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়ের করেন। ডিমলা থানার এসআই মো. এরশাদ আলী তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলেন যে, তদন্তকালে বাদিনীর অভিযোগে বর্ণিত ঘটনাটি অর্থাৎ রাত ৯টার সময় তাদের বাড়িতে কোনো প্রকারের ঘটনা ঘটেনি। আসামী মকবুল হোসেন কর্তৃক বাদিনীকে ধর্ষণের চেষ্টা করার কোনো ঘটনাও ঘটেনি। তদন্তুকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য, প্রমাণ, পারিপাশ্বর্িকতা ও ঘটনাপ্রবাহে বাদিনীর আনীত ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন/২০০৩) আইনের ৯(৪)খ ধারার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য নয় বলে প্রতীয়মান হয়। পরবর্তীতে বাদিনী দালালের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এ পরিস্থিতিতে তিনি নারাজি আবেদন করবেন। অতপর বাদিনী নীলফামারী জেলা জজ কোর্টে আসেন এবং একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে এ ঘটনাটি দিয়ে আর কীভাবে মকবুলকে হয়রানি করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জয়গুন সে মতে একটি নারাজি দায়ের করেন। শুরু হলো আদালত পাড়ায় দুই পক্ষের দৌড়ঝাঁপ। আসামি মকবুল হোসেন খোজ নিয়ে জানতে পারেন নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ সকল মামলার নারাজি মঞ্জুর করা হয়। সে ক্ষেত্রে নারাজি গ্রহণ হলে বিচার প্রক্রিয়ায় পুনঃপ্রবেশ করতে হবে। কথিত আসামি মকবুল পরবর্তীতে আইনি ঝামেলা এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে বাদিনীর দালালদের সঙ্গে মামলা তুলে নেয়ার বিষয়ে আলোচনায় বসেন। অবশেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে আসামি-বাদীনীর সঙ্গে সমোঝাতায় উপনীত হন। দালালেরা টাকা গ্রহণের পর বাদিনীকে বলেন মামলা তুলে নেয়ার জন্য। সে মতে বাদিনী পরবর্তী তারিখে আদালতে এসে বিচারকের সামনে বলেন, আসামির বিরুদ্ধে তিনি আর নারাজি করবেন না। এমনকি আসামির বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগও নেই। যে অভিযোগটি ছিলো তা সম্পূর্ণই ভুল বোঝাবুঝি। ব্যাস, সকল অভিযোগের অবসান ঘটল, মামলাও সমাপ্ত হলো। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। এধরনের একটি শক্ত আইন প্রণয়ন সত্ত্বেও এখনও নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত আমাদের দেশের সাধারণ নারীরা। অন্যদিকে এই আইনের অপব্যবহার করে এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ পুরুষদের হয়রানি করছে। আদালতের বিচার-প্রক্রিয়ায় সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল পক্ষের সীমাহীন অনিয়মের জাঁতাকলে পরে বিচারপ্রার্থীরা অহর্নিশ যন্ত্রণার দহনে জ্বলছে। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ০৫.১১.২০১৪