ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৩:৫০:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন : অগ্রগতি সামান্য

আপডেট: ০৬:০৪ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৪ বুধবার

SAM_1543_sঅনু সরকার, উইমেননিউজ২৪.কম ঢাকা : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইন ও নীতিমালা ফাইলপত্রেই আটকে আছে। উপরন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখা সত্ত্বেও সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য উপেক্ষিত। পাশাপাশি দেশের শ্রমশক্তি সম্পন্ন জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও এই বিশাল জনসংখ্যাকে ব্যবহারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। দেশের শীর্ষস্থানীয় নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং অভিজ্ঞমহল মনে করছেন ‘অন্দর মহল কনসেপ্ট’ ভেঙ্গে পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের নারীরা প্রতিযোগীতায় নেমে আসছে নিজেদের তাগিদেই। নেত্রীবৃন্দ বলেন, পঞ্চম পাঁচশালা পরিকল্পনায় নারীর উন্নয়নবিষয়ক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং কার্যকরী কৌশল প্রতিষ্ঠা করা, ভূমি, পুঁজি, প্রযুক্তিসহ সকল অর্থনৈতিক সম্পদে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য, দক্ষতা এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে জেন্ডার পার্থক্য কমিয়ে আনা ও নারীর কাজকে দৃশ্যমান করা এবং স্বীকৃতি দেয়া। পেশার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সকল সহিংসতা নির্মূল করাসহ বেশ কিছু নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম উইমেননিউজকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর ভূমিকা যে কোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অর্থনীতিতে কখনই তাদের কাজের মূল্যায়ন সঠিকভাবে করা হয়নি এবং অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে নারীর অ-আর্থিক কাজগুলোকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে ধরা হয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে যদিও নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন অনেকাংশে জাতীয় নীতিতে মূল্যায়ন পাচ্ছে এরপরও তার অগ্রগতি সামান্য। একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অবদানকে উপেক্ষা করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক অবকাঠামো কখনই চিন্তা করা যায় না। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি ও তাদের ক্ষমতায়ন দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ থেকে জানা যায়, দেশে ১০৮৫-৮৬ তে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার উৎপাদনমুখী কর্মক্ষেত্রে ছিলো ৯.৯ যা ১৯৯০-৯১-এ এসে দাড়িয়েছে ১৪.১ ভাগ, ২০০০ সাল নাগাদ যে হার পৌঁছেছে তার ৩ ভাগে। শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সালে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৫৬.৭ মিলিয়ন (৫৪.১ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৩৯.৫ মিলিয়ন (৩৭.৯ শতাংশ)। নারীর সংখ্যা ছিল ১৭.২ মিলিয়ন (১৬,২ শতাংশ)। শহরে মোট শ্রমশক্তি ছিল ১৩.৩ মিলিয়ন (১২.৪ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৯.৩ মিলিয়ন (৮.৮ শতাংশ), নারীর সংখ্যা ছিল ৪.৯ মিলিয়ন (৩.৬ শতাংশ)। গ্রামে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৪৩.৪ মিলিয়ন (৪১.৭ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৩০.২ মিলিয়ন (২৯.১ শতাংশ), নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৩.৩ মিলিয়ন (২.৬ শতাংশ)। সংশিষ্টরা জানায় গত দু’দশক ধরে স্থানীয় ও উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ অধিকহারে দেখা যাচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। বাংলাদেশের মোট ৮ মিলিয়ন নারীর শতকরা ৪০ জন বসবাস করে গ্রামে। যাদের অধিকাংশই কাজ খোঁজ করছে। এক জরিপে দেখা যায় শ্রমজীবী নারীর শতকরা ৭৮.৮ ভাগ কৃষি ও মাছ ধরার কাজ করে। শতকরা ৪০ জন বিনা পারিশ্রমিকে পারিবারিক শ্রমে নিয়োজিত। শতকরা ২৫.৩ ভাগ সাধারণ কর্মী। শতকরা ১৮ ভাগ দিন মুজুর এবং ২২.৩ ভাগ গৃহ কর্মে নিয়োজিত আছে। মোট জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের অবস্থা হিসেব করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ নারী কর্মরত রয়েছে পারিবারিক এবং অবৈতনিক শ্রমে। তবে নিয়োগ কর্তা হিসেবে নারীর সংখ্যা খুবই কম। কৃষি, মৎস ও গৃহপালিত পশু পালন সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পারিবারিক শ্রমে নারীর অবদান স্বীকৃত নয়। পুরুষের তুলনায় নারী অধিক সময়ের এবং শ্রমের কাজ করলেও সার্বিকভাবে এ কাজের মূল্যায়ন নেই। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের এক গবেষণায় জানা যায়, নারী বিনা পারিশ্রমিক ও কম পারিশ্রমিকে যে পরিমাণ শ্রম দান করে, তা টাকার অঙ্কে জিডিপির শতকরা ৪৮ ভাগ। এই চিত্র নারীর অর্থনৈতিক অবদানের কথা উল্লেখ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপে অর্থনীতির মূল মূল খাতে নারীর অংশগ্রহণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ৪০.৫১ শতাংশ, নারীর অংশগ্রহণ ৫৩.২ শতাংশ। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ১২.৫৯ শতাংশ, নারীর অংশগ্রহণ ১৬.৯৬ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায় পুরুষ ১৬.৫৪ শতাংশ, নারী ৫.৪৩ শতাংশ। যোগাযোগ খাতে পুরুষ ১০.৭৪ শতাংশ, নারী ০.৪ শতাংশ। ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্সে পুরুষ ১.২২ শতাংশ, নারী ১.৩৭ শতাংশ। জনপ্রশাসন ও ডিফেন্সে পুরুষ ২.১৮ শতাংশ, নারী ১.০২ শতাংশ। শিক্ষা-বিনোদনে পুরুষ ৩.২১ শতাংশ, নারী ৪.৭ শতাংশ। কমিউনিটি ও সেবা খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ৪.১৩ শতাংশ এবং নারীর অংশগ্রহণ ১০.৭৮ শতাংশ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে শিশু রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবার পালনসহ একজন নারী প্রতি দিন ১৪ থেকে ১৫ ঘন্টা কাজ করে থাকে। চাকরি ক্ষেত্রে দেখা যায় নারীরা বেশির ভাগ শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নার্সিং পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণীর ক্ষেত্রে কর্মকর্তা পর্যায়ে নারীর সংখ্যা শতকরা ৭ জন মাত্র। দেশে শিল্পক্ষেত্রে বিশেষত নির্মান কাজে প্রচুর নারী শ্রমিক রয়েছে। উৎপাদন সেক্টর ও রফতানীকারক শিল্প যেমন পোশাক, ইলেক্ট্রনিক ও চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পেও নারী শ্রমিকের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সেক্টরগুলোতে কাজের খোজে শহরমুখি গ্রামীণ নারীর সংখ্যাই বেশি। স্থানীয়ভাবে কাপড়, জুতা, প্রসাধন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানেও সমানহারে নারী শ্রমিক রয়েছে। অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৪ সালে পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানায় ২৫ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছে। যার শতকরা হার মোট শ্রমিকের ৯০ ভাগ। ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সার্ভিস সেক্টরে বিপুল সংখ্যক নারী বিনা বেতনে পরিবারভিত্তিক কুটির শিল্পে কর্মরত রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযুক্ত হওয়ার কারণে নারী কর্মী স্থানান্তরিত হয়ে গেছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে। এই সেক্টরে মোট কর্মীর শতকরা ২৪ ভাগ নারী। সংশিষ্ট মহল থেকে জানা গেছে শহরাঞ্চলে উৎপাদনমুখী কারখানা, পোশাক শিল্প, রফতানীমুখি শিল্প চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, চামরা শিল্প, খাদ্য ও কোমল পানীয় তৈরির কারখানায় বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী কর্মরত আছে। এই সব কারখানায় বেশি সংখ্যক নারী শ্রমিক নিয়োগের কারণ, নারীরা এসব কাজে দক্ষ। তাছাড়া কম বেতনে অদক্ষ নারীকর্মী নিয়োগ করা সম্ভব। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর। কিন্তু বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী কর্ম পরিবেশ ও বেতন দেয়া হচ্ছে না নারী শ্রমিকদের। পোশাক, নির্মাণ ও অন্যান্য উৎপাদন কারখানায় মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে নারী শ্রম দিচ্ছে বেশি কিন্তু পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় পারিশ্রমিক পাচ্ছে কম। বেশির ভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় প্রসূতিকালীন ছুটি দেয়া হয় না। অথচ নারীর কর্মজীবনে ৬ মাস করে প্রসূতিকালীন ছুটি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোতে অনুমোদিত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এই সনদ অনুমোদন করেছে। অথচ অআনুষ্ঠানিক ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশগুলোতেই এখন পর্যন্ত নারীর প্রসূতিকালীন ছুটি সম্পূর্ণ মানা হয় না। বাংলাদেশ শ্রম আইনে শর্ত থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ কর্মস্থলে নারীর পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা, শৌচাগার এবং শিশু রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা নেই। রফতানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীকর্মীর ট্রেড ইউনিয়ন করা নিষেধ। পোশাক শিল্প কারখানা, যেখানে বেশিরভাগ শিপমেন্ট হয় রাতে এবং শতকরা ৯০ ভাগই নারী কর্মী সেখানে নারী কর্মীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি একটি বড় ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। নারীনেত্রী শিরীন আখতার উইমেননিউজকে বলেন, নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি মানে দেশের সার্বিক উন্নতি। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোতে এবং জাতীয় বাজেটে নারী উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জাতীয় বাজেটে যে প্রকল্পগুলো নারীদের জন্য রাখা হয় সেখানে তাকে শুধু দুস্থ ও বিত্তহীন নারী হিসেবে না দেখে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, নারী উন্নয়ন এবং তার ক্ষমতায়নের জন্য একদিকে যেমন দরকার সহযোগী নীতিমালা অন্যদিকে সেই নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। আনুষ্ঠানিক খাতেও আয়বর্ধক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু শিক্ষার হার বাড়ালেই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে। ১১.১২.২০১৪