ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৮:৪২:৩৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল: বেহাল অবস্থা নারী ও শিশু রোগীদের

আপডেট: ১০:৫৬ এএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ শনিবার

images 2অনু সরকার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা: দৃশ্য : এক, সকাল : ৮.৩০ মিনিট, গাইনি বিভাগ। লাইনে দাড়ানো রোগী আর ডাক্তারের সহকারীর সঙ্গে চলছে প্রচন্ড কথা কাটাকাটি। তিন ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকা রোগীকে পেছনে রেখে টাকার বিনিময়ে লাইনের পেছনের এক রোগীকে ঢোকানো হয়েছে ডাক্তারের রুমে। এ নিয়ে অপেক্ষমার সকলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সহকারী আর রোগীর অভিভাবকের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীদের আগমণ এবং উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা। ভেতরে ডাক্তাররা নির্বিকার বসে পান চিবাচ্ছেন। দৃশ্য : দুই, সকাল : ৯টা, শিশু বিভাগ : প্রায় ৫০জন মা তাদের শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে প্রচন্ড গরমের মধ্যে অপেক্ষা করছেন। প্রচন্ড গরমে সবাই ঘামছেন। মাথার ওপর নেই পর্যাপ্ত ফ্যান। নেই প্রয়োজনীয় বসার জায়গা। শিশুদের কান্না নোংরা দূগন্ধযুক্ত রুমে দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা সকলের। অনেকক্ষণ ধরেই বিভাগের সামনে কোন সহকারীকে দেখা গেলো না। ভেতরে ডাক্তাররা আড্ডায় ব্যস্ত। দৃশ্য : তিন, সকাল : সাড়ে নয়টা, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগ : ভোর ছয়টা থেকে লাইন ধরে দাড়িয়ে আছে শত শত রোগী। চরম অসুস্থ্য রোগীরা লাইনে দাড়িয়ে কাতরাচ্ছে। বসার কোন ব্যবস্থা নেই। মাথার ওপর নেই ফ্যান। কিন্তু তখনও ডাক্তারের দেখা নেই। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এলেন বটে। তবে তার সহকারী উজ্জ্বল অপেক্ষমান রোগীদেরকে উপেক্ষা করে উৎকচ গ্রহণের মাধ্যমে পেছনের সাড়ির তিনজন মহিলা রোগীকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। ভোর থেকে দাড়িয়ে থাকা রোগীরা ক্ষোভে ফেঁটে পড়লো। দই পক্ষের মধ্যে লেগে গেলো প্রচন্ড বাকবিতন্ডা। সিরিয়াল ভাঙ্গার দায়ে সহকারীর বিরুদ্ধে ডাক্তারের কাছে অভিযোগ করলেও তিনি তা কানেই তুললেন না। দৃশ্য : চার, সকাল : দশটা, মেডিসিন বিভাগ : রোগীর ভীড়ে বিভাগের সামনে তিল ধারনের জায়গা নেই। মাত্র একজন ডাক্তারের পক্ষে রোগী সামলানো কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। তার মধ্যে চলছে ডাক্তারদের সহকারীদের টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল ভেঙ্গে রোগী ঢোকানোর খেলা। দৃশ্য : পাঁচ, সকাল : সাড়ে দশটা, বক্ষ ব্যাধি বিভাগ : রুমের সামনে রোগীর অভাব নেই। ভেতরে ডাক্তার আছেন, কিন্তু রোগীদের ডাকা হচ্ছে না। অপেক্ষা করে করে গরমে রোগীরা আরও অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে। অথচ ডাক্তার সাহেব মোবাইল ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। শেষ দৃশ্য : বেলা ১২টা, আউটডোর : আউটডোরের অধিকাংশ বিভাগেই ডাক্তার নেই। প্রতিটি রুমের সামনে ফাইল হাতে অসহায় ভঙ্গিতে অনেক রোগী দাড়িয়ে আছে। যদি আসে ডাক্তার, সে অপেক্ষায় ...। এভাবেই প্রতিদিন চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আউটডোরে (বর্হিবিভাগ) সাধারণ মানুষের চিকিৎসা। চিকিৎসা নিতে গেয়ে প্রতিনিয়তই নাজেহাল হচ্ছেন রোগীরা। বেহাল অবস্থা নারী ও শিশু রোগীদের। দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর  রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামগত সুবিধা থাকালেও রোগীরা পাচ্ছেন না যথেষ্ট চিকিৎসা সুবিধা। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য মাসের পর মাস সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় রোগীদেরকে। তাছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারিদের দৌরাতœ চরম আকার ধারন করায় তাদের হাতে হাসপাতাল এক প্রকার জিম্মিই। অন্যদিকে হাসপাতালের প্রশাসন দায়সারা ভাবে চলার কারণে আউটডোরসহ সর্বত্রই চলছে চরম অব্যবস্থা। সরজমিনে ঘুরে এবং কথা বলে জানা গেছে, আউটডোরে প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখার সময়। ডাক্তারা দেখাতে বিশ টাকা দিয়ে রোগীকে টিকিট কাটতে হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগী দেখা হয়। অবশ্য প্রশাসনের দাবি এ সংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজার। এদিকে আউটডোরে ঘুরে সর্বত্রই নানা অব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে। পুরো আউটডোর জুড়েই নোংরা আর দূর্গন্ধময় পরিবেশ। ডাক্তারের রুম থেকে শুরু করে সামনের রোগীদের অপেক্ষার জায়গা, করিডোর, বারান্দা, এমন কি হাটার প্যাসেজ সবই এমন নোংরা যে নাকে কাপড় দিয়ে চলতে হয়। দেয়ালগুলোতে রঙের ছোঁয়া পরেনি দীর্ঘ দিন। দেয়ালের যেখানে সেখানে পানের পিক ও চুনের দাগ। কখনওই এগুলো পরিস্কার করা হয় না। দুয়েক জায়গায় ‘বিনবক্স’ থাকলেও তাতে উপচে পড়ছে বালি, রক্তমাখা তুলা, ইঞ্জেকশসেন সিরিঞ্জ ও ভাঙ্গা কাঁচের শিশি, সিগারেটের পাফ আর পানের পিক। এগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রোগ-জীবানু। তবু কর্তৃপক্ষ তা পরিস্কার করার প্রয়োজনই মনে করে না। রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ঝাড়– দেওয়া হয় না নিয়মিত। পরে থাকা কাগজ ও ময়লা পরিস্কার করা হয় না দিনের পর দিন। হাসপাতাল থেকে রোগীদের ওষুধ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। ঘুরে দেখা গেছে, আউটডোরে রোগীদের জন্য বসার কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা রোগীদেরকে দাড়িয়ে থাকতে হয়। কোন কোন রুমের সামনে দু-চারটা চেয়ার থাকলেও তার অধিকাংশই ভাঙ্গা। প্রচন্ড গরম থাকলেও নেই কোন ফ্যানের ব্যবস্থা। রোগীরা অভিযোগ করে বলেছেন, এখানে তাদের জন্য টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ সময় তাদেরকে আশেপশের বিভিন্ন অফিসে যেয়ে বাথরুমের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এক্ষেত্রে মহিলা রোগীদের পড়তে হয় বিপাকে। সংশ্লিষ্ট সুত্রে আরো জানা গেছে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৯শ রোগীর চিকিৎসা করা হয়। এসব রোগীর অনেকেই ভর্তি হওয়ার মত গুরুতর অসুস্থ থাকলেও ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করে সিট নাই বলে তাদেরকে বিদায় করে দেওয়া হয়। প্রেসক্রিপসনে সিল দেওয়া হয় ‘দু:খিত, বিছানা খালি নাই’। পরবর্তিতে এসব রোগীদেরকে মাসের পর মাস সিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার কখনো কখনো সিট খালি হলে নার্স বা কর্মচারিরা গোপনে তাদের আতিœয়-স্বজনদের ভর্তি করে ফেলে। ফলে বিপাকে পড়তে হয় অপেক্ষমান রোগীকে। কোনো কোনো সময় তারা ভর্তির জন্য রোগীদের কাছ থেকে টাকাও নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। তবে কেবিন পাওয়ার ক্ষেত্রে ওপরের কারো তদ্বির থাকতেই হয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বহির্বিভাগেও অনেক বিভাগের অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্টরা নিয়মিত আসেন না। ফলে এবিভাগে চিকিৎসক কম থাকাতে অধিকাংশ সময়ই রোগীদেরকে চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যেতে হয়। এখানে প্রায় প্রতিটি রুমে চিকিৎসকদের সামনে ২৫/৩০জন করে রোগী ভিড় করে থাকে। চিকিৎসকরা জানান এতো বেশি ভিড়ের কারনে অধিকাংশ সময়ই ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে জরুরী বিভাগেরও অবস্থা আরো করুণ। এখানে প্রতিদিন গড়ে ১শ জন রোগী জরুরী চিকিৎসার জন্য আসেন। এখান থেকেও ভর্তি হতে হাজার ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয় রোগীকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এবিভাগ থেকে রোগীদেরকে ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এদিকে আউটডোরে অপেক্ষমান একাধিক রোগী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ করে চিকিৎসক, নার্স, আয়া ও সহকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব রোগীরা বলেছেন, ডাক্তারা তাদেরকে ঠিকমত সময় নিয়ে দেখেন না। তাদের সমস্যার কথা না শুনেই দুয়েক মিনিটের মধ্যে ওষুধ দিয়ে বিদায় করে দেন। তারা আরো জানান, অধিকাংশ ডিউটি চিকিৎসক সময়মত ডিউটিতে আসেন না। সিনিয়র চিকিৎসকের দেখা মেলা কঠিন। সিনিয়র চিকিৎসকরা আউটডোরে কমই আসেন। সকাল এগারটার পর তাদের অনেককেই আউটডোরে খুঁজে পাওয়া যায় না। রোগীরা বলেছেন, চিকিৎসক থেকে শুরু করে সুইপার পর্যন্ত সকলের ব্যবহার খারাপ। তারা অভিযোগ করে বলেছেন চিকিৎসকরা রোগীদেরকে মানুষ মনে করে না। ০৬.০৯.২০১৪