ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১০:৪৮:৩৫ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা ভারতে ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন বাড়ছে, আন্দোলনে সংসদ অচ জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ

মিথ্যে নয়, সত্যি বলছি

আপডেট: ১২:৫৩ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৩ বৃহস্পতিবার

তাহমিনা সাথী শুভ্র ভেবে সারা কী করবে আর মাত্র ৩ দিন বাকি আছে। সেদিন মামা এসেছিল। তাকে বলেও বলতে পারে নি। তারপরও বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মামা বলল ভাগ্নে আজ আর কিছু শুনব না। তোমার যা যা লাগবে সবই পাবে। এবার একটু বেশিই পাবে। ব্যবসা এবার অনেক ভালো, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। শোন এবার যেখানে যেতে চাইবে সেখানেই নিয়ে যাব। চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, জাদুঘর বা নন্দন পার্ক, যেখানে যেতে চাইবে। কোন বাঁধা নেই। শিমু তো বিদায় নিচ্ছে। ওকে তো আর পাব না। শিমু তুইও চিন্তা করিস না। তোর জন্যও সারপ্রাইজ আছে। এত কথা শুনতে শুনতে শুভ্র আর কিছুই বলতে পারল না। বাবাকে যে বলবে সে সাহস তার নেই। মাকে বললেও মা অজুহাত দেখাবে। আপুর সাথে তো কথা বলাই যায় না। সে এখন মহাব্যস্ত। বান্ধবীদের সাথে আড্ডা আর পরামর্শ, ফোনে সারাক্ষণ কথা। তবে নতুন ভাইয়ার সাথে বলা যায়। কিন্তু সে তো নতুন। তাকে কিভাবে বলবে? তা যাই হোক, সিদ্ধান্ত তো একটা নিতেই হবে। ওকে আমি খুব পছন্দ করি। ও আমার বন্ধু। ওকে কথা দিয়েছি। কালই একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে। হয় চুরি, না হয় কিছু একটা তো করতে হবে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ হচ্ছে শুভ্র। ঘুম হচ্ছে না। ঘুমানোর চেষ্টা করে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল ওর বন্ধুটির মা মারা গেছে। স্বপ্ন দেখে তো শুভ্রের আর ঘুম আসল না। এভাবেই সকাল হল। শুভ্র বাসা থেকে বের হবে এমন সময় মা বলল কীরে খোকা কোথায় যাচ্ছিস। শুভ্র নিশ্চুপ। কিছুই বলল না। স্বপ্নটা মনে উঠতেই মাকে জড়িয়ে ধরল। মা বলল কীরে কী হয়েছে! শুভ্র বলতে যাবে এমন সময় বাসার বুয়া ডাকছে ‘ও আম্মা এদিকে আসেন দেইখ্যা যান; কে যেন শিমু আপারে নিয়ে গেছে। আপাতো বিছানায় নাই।’ শুভ্র সেদিকে ভ্রুক্ষেপ দিল না। ও বেরিয়ে পড়ল। শুভ্র ওর বন্ধুটির কাছে গেল। বন্ধুটির নাম তমাল। তমাল হোটেলে কাজ করে। আগে শুভ্রের স্কুলের সামনে বাদাম বিক্রি করত। তখন থেকেই শুভ্রের সাথে ওর পরিচয়। শুভ্র বাদাম না খেলেও ওর কাছ থেকে বাদাম কিনত। তমালকে ওর ভালো লাগে। তমালের চেহারা খুবই মায়াবী। তবে সারাদিনের পরিশ্রমে ওকে অনেক রোগা রোগা লাগে। একদিন শুভ্রের স্কুল আগেই ছুটি হয়ে গেল। শুভ্র ভাবল আজ তমালের জীবন কাহিনী শুনবে। ও কেন বাদাম বিক্রি করে? ওর কী লেখাপড়া করতে ইচ্ছে হয় না? অবশ্য বাদাম বিক্রি করে এমন আরও অনেক ছেলেই আছে কিন্তু কেন যেন ওর তমালকে খুব ভালো লাগে। শুভ্র বাসায় গেল না। তমাল স্কুলের গেটে বসে বাদাম বিক্রি করছে। শুভ্র বললÑতমাল আজ আমি তোমার সাথে গল্প করব। তোমার কথা শুনব। যদিও তোমার একটু ক্ষতি হবে। তবে একটা কাজ করতে পারি আমার কাছে কিছু টাকা আছে সেগুলো তোমাকে দিব। তুমি আরও বেশি বাদাম কিনে বিক্রি করবে। তমাল বলল তা লাগবে না। তয় আপনার বাসায় যাইতে দেরি হলে বকা দিবে না! শুভ্র বলল না আজ আমার আগেই ছুটি হয়েছে। আমি ঠিক সময়ে বাসায় চলে যাব। শুভ্র বলল জানো তমাল তোমার সাথে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। আমারও খুব ভালো লাগে, তমাল বলল। শুভ্র ক্লাস এইটে পড়ে। লেখাপড়ায় অনেক ভালো। ক্লাসে সব সময় প্রথম হয়। বই পড়তে অনেক ভালোবাসে। অবসর সময় পেলেই বই পড়ে। গোয়েন্দা কাহিনী, সায়েন্স ওয়ার্ল্ড, এনসাইক্লোপিডিয়া, জীবনী এসব পড়তে তার খুব ভালো লাগে। শুভ্র বড় হয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। তবে সেই সাথে মানুষের সেবায়ও নিজেকে বিলিয়ে দিতে চায়। চেষ্টাও করে আপ্রাণ। তমাল শুভ্রের এক বছরের ছোট হবে। শুভ্র তমালকে বলল, শোন তমাল আজ থেকে আমরা বন্ধু। তোমার সব কিছু আমাকে বলো। তুমি আমাকে তুমি করে বলবে। তমাল বলল আচ্ছা, তমাল তার জীবন কাহিনী শুরু করল। তমাল এর বাবা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তখন ও পড়ালেখা করত। ওদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। সেখানেই থাকত। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাকে ও আমার ছোট বোন তিতলীকে নিয়ে ঢাকায় আসে। এসে মিরপুর বস্তিতে ওঠে। মা ইট ভাঙ্গার কাজ শুরু করে আর একটা বাসায়ও কাজ নেয়। একদিন মাও খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মায়ের এপেন্ডিক্স ও কিডনীর সমস্যা দেখা দিয়েছে। অপারেশন করতে হবে। প্রথম মালিক কিছু টাকা দিলেও এখন আর দেয় না। মার ঔষধ ও চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে। ছোট বোনটা স্কুলে যেতে চায়। প্রতিদিন বায়না ধরে ব্যাগ এনে দাও, খাতা, কলম এনে দাও আমি স্কুলে যাব। আমারও ইস্কুলে পড়ার ইচ্ছা আছিল। কিন্তু কী করব, এখন ভাবছি বোনটারে স্কুলে পড়ামু। তয় এই টাকায় হয় না। আমার একটা চাকরি হইলে ভালো হইত। এই কথা বলে নিজেই হেসে ফেলে, বলে আমার চাকরি দেবে কে? আমি তো শিক্ষিত না। বয়সটাও তেমন না যে চাকুরী করবো। একথাগুলো বলে তমাল চুপ হয়ে গেল। শুভ্র ওর হাতটা তমালের হাতে রেখে বলল শোন দোস্ত আমরা আজ থেকে পাক্কা দোস্ত। শুধু দোস্ত না দুই ভাই। আমি যতটুকু পারি তোকে সাহায্য করব। কিন্তু তুই কিছুতেই না করবি না। এই নে এ টাকাটা রাখ, এই বলে শুভ্র বাসায় চলে গেল। শুভ্র বাসায় এসে একটু চিন্তিত। কী করা যায়। ওর বাবা একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। ওর বাবার আয়েই সংসার চলে। শিমু আপুর বিয়ে। তাই সবাই এখন এই বিয়ে নিয়েই ব্যস্ত। কাউকে কিছু বলাও যাচ্ছে না। মা তো বাবার কথার বাইরে কিছুই বলে না। বাবা যা বলেন তাই। তমালের সাথে আরও আগে পরিচয় হলে ভালো হত। তাহলে হয়ত টিফিনের টাকা ও ভাড়া বাচিয়ে কিছু একটা করা যেত। তমালের মা অনেকদিন থেকে হাসপাতালে। এই সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন করাতে হবে। ডাক্তার বলেছে টাকা জমা না দিলে ওর মায়ের অপারেশন হবে না। তমাল কিছু টাকা জমিয়েছে। কিন্তু ঐ টাকায় হবে না। আরও ৫ হাজার টাকা লাগবে। এখন তমাল হোটেলে কাজ নিয়েছে। কিন্তু তার টাকা তো পরে দিবে। শুভ্র তমালের সাথে কথা বলেই বাসায় আসল। বাসায় এসে বেশ চুপচাপ থেকে মনে মনে চিন্তা করল আপুর মোবাইলটা নিবে। কিন্তু সমস্যা হল মোবাইলটা নতুন দুলাভাই দিয়েছে, সারারাত নতুন দুলাভায়ের সাথে কথা বলে। তাইতো গত রাতে কথা বলতে বলতে কখন যে নিচে ঘুমাইয়া পড়েছে তার হুশ ছিল না। এজন্যই বুয়া বলেছিলো আমাগো আপারে কে যেন নিয়ে গেছে। তবে একটা কাজ করা যায় মার আলমারিতে মার একটা ছোট চেইন দেখেছি। অবশ্য একটা হারও আছে। শুনলাম সেটা আপুর বিয়েতে দেবে। তাই সেটা নেয়া যাবে না। তবে ছোট চেইনটা নেয়া যায়। যা ভাবা তাই করা ছোট চেইনটা নিয়ে স্বর্ণকারের  দোকানে গেল। চেইনটা মেপে বলল এখানে সাত আনা আছে চার হাজার টাকা পাবে। শুভ্র বলল আচ্ছা চেইন দিয়ে দেন আমি অন্য দোকানে যাব। তখন দোকানদার বলল আচ্ছা ৫ হাজার দিব্ শুভ্র বলল আচ্ছা দিন। শুভ্র টাকা নিয়ে তমালের কাছে গিয়ে বলল চল ডাক্তারের কাছে যাই। শুভ্র ও তমাল ডাক্তারের কাছে গিয়ে টাকা জমা দিল। ওর মায়ের অপারেশন কাল সন্ধ্যায় হবে। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। শুভ্র বলল বন্ধু আমি দোয়া করি তোর মা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুক। আমি এখন বাসায় যাই। কাল আসব। যদি না আসতে পারি তাহলে আমাকে এই ফোনে সব খবরাখবর জানাবি। এই বলে শুভ্র বিদায় নিল। শুভ্র ভিজে ভিজে বাসায় আসল। এসেই শুনতে পেল মা বুয়াকে বকাবকি করছে এমন কি বাসা থেকেও বের করে দিবে। শুভ্র বেহুশ হয়ে পড়ল। ওর গায়ে তুমুল জ্বর। ৩ দিনেও কোনো হুশ নেই। শুধু ঘুমের ঘোরে বলছেÑআল¬াহ্ তুমি ভালো করে দাও। মা আমি তোমার...। এদিকে মা বুয়াকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মা ভেবেছে বুয়াই তার চেইনটা নিয়েছে সামনে বিয়ে আরো কিছু যদি চুরি করে। এদিকে শিমুর ফোনে কে যেন ফোন করে বলে হ্যালো শুভ্র; শুভ্র আমি, দোয়া করিস। শিমু কিছুই বুঝতে পারছে না। শুভ্রের হুশ ফিরল। সে তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল মা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি খুব ভালোবাসি। ঠিক এমন সময়ই তমালের ফোন হ্যালো শুভ্র মা সুস্থ হয়ে গেছে। অপারেশন সাক্সেস, তাকে আজই বাসায় নিয়ে যাব। বাসার সবাই ব্যাপারটা শুনল। তমালের মা সুস্থ হয়েছে শুনে শুভ্র যে কত খুশি তা বলে বোঝানো যাবে না। মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে শুভ্র বলল-মিথ্যে নয় মা, সত্যি বলছি। এরকম আর হবে না।