ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১০:৪৮:৩৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা ভারতে ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন বাড়ছে, আন্দোলনে সংসদ অচ জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ

শিশু গৃহকর্মী: আর নয় নির্যাতন

আপডেট: ০৬:৪০ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার

girl-child_cdn3C_26জিবলু রহমান, উইমেননিউজ২৪.কম ঢাকা : বর্তমানে দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন-নিপীড়নসহ বিভিন্নভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, থাকা-খাওয়ার বেলায়ও এদের ওপর অমানবিক আচরণ করা হয়। বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি শ্রমিক গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। যার ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। গৃহশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ ও অন্যান্য অধিকার সুরক্ষায় এখনও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাদের সুরক্ষার আইনি কোনো ব্যবস্থা নেই। বিপুলসংখ্যক এই শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শ্রমিক হিসেবেও কোনো স্বীকৃতি নেই। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল যৌথভাবে জরিপ করে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, সারাদেশে চার লাখ শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে। এদের মধ্যে এক লাখ ৩২ হাজার রয়েছে রাজধানী ঢাকায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সনদ (১৮২) অনুযায়ী, শিশুশ্রমের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো শিশুদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা। আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) ও সেভ দ্যা চিলড্রেন ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর ‘গৃহের অভ্যন্তরে, আইনি সুরক্ষার বাইরে’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে-শ্রম আইনে (২০০৬) শিশু গৃহকর্মীদের ব্যাপারে কিছু বলা নেই। ফলে শ্রম বিভাগের পরিদর্শকরা কারও বাড়িতে গিয়ে শিশু শ্রমিকদের অবস্থা জানতে পারে না। এর বাইরে দেশে শিশুদের নিয়ে আইন আছে ৩৫টি। কিন্তু গৃহশ্রমিকদের বিষয়ে বিস্তারিত আইন নেই। আইন বলতে ‘গৃহকর্মী নিবন্ধন অধ্যাদেশ ১৯৬১’ আছে। এতে গৃহকর্মীদের নিজ উদ্যোগে থানায় গিয়ে নাম নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। তার অধিকার বা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাতে কিছু বলা নেই। ২০০৪ সালে বিলস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় গৃহশ্রমিকদের জীবনযাপন প্রক্রিয়া ও প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা শীর্ষক এক গবেষণা চালায়। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ শিশু শ্রমিক রাতে ঘুমায় সংশি¬ষ্ট বাসার ড্রইং রুমের মেঝেতে এবং ৩৩ শতাংশ শিশু রাতে ঘুমায় বাড়ির রান্নাঘরের স্যাঁতসেতে মেঝেতে। শীতের সময় পর্যাপ্ত শীতের কাপড়, লেপ-তোষক এবং রাতে মশারি দেয়া হয় না শতকরা ৫০ ভাগ শিশু গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে। আসক ও সেভ দ্যা চিলড্রেনের জরিপমতে, ৯২ ভাগ শিশু গৃহশ্রমিক এই কাজ করে দারিদ্র্যের কারণে। ৩৭ শতাংশ শিশু বলেছে, বাবা-মা লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম এবং ২৬ শতাংশ শিশুর পরিবারে খাবারের অভাব রয়েছে। ১৭ শতাংশ শিশু পরিবারের সঙ্কট দেখে স্বেচ্ছায় গৃহকর্মী হিসেবে মা-বাবাকে ছেড়ে শহরে আসেছ। ৬৬ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা দৈনিক গড়ে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পায়। ৩৬ শতাংশ শিশু জানায়, তারা দিনে ৯-১২ ঘণ্টা, ৩০ শতাংশ শিশু ১৩-১৫ ঘণ্টা, ১৬ শতাংশ শিশু ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকালে ৪টার আগে ২০ শতাংশ শিশু দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ পায় না।  দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৩২ থেকে ৮০ শতাংশ গৃহকর্মী শিশু থালা বাসন ধোয়া, ঘর মোছা, বিছানা গোছানো, শাক সবজি ও মাছ কাটা-বাছা, কাপড় ধোয়া, দুপুরের খাবার রান্না, পানি আনা, নিয়োগকর্তার শিশুকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, নিয়োগকর্তার জন্য খাবার করা, চা বানানো ইত্যাদি কাজ করে। সন্ধ্যার পরও এই গৃহকর্মী শিশুদের সিংহভাগ লেখাপড়ার সময় পায় না। এসব শিশুর মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ পায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০৪-২০১০ পর্যন্ত ৭ বছরে কাগজে-কলমে গৃহ শ্রমিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৬৪০টি। এর মধ্যে নিহত হয়েছে ৩০৫ শিশু, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ২৩৫ জন, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৭ জন কিশোরী, অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৩ জন। এটা হলো কাগজে কলমের হিসাব। বাস্তবে এই সংখ্যা বহুগুণ বেশি। আইএলও এবং শৈশব বাংলাদেশ নামের একটি এনজিওর জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় বিভিন্ন বাসাবাড়িতে প্রায় ৩ লাখ শিশু গৃহপরিচারিকার কাজ করছে। তাদের অনেকেরই বয়স ১৪ বছরের নিচে। শৈশব বাংলাদেশের জরিপ অনুযায়ী মেয়েশিশুদের মধ্যে ৮০ ভাগেরই বয়স ৬ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। বিলস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ৩৩.৬ ভাগের বয়স ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের তথ্য মতে, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত সারাদেশে এভাবে নির্যাতনের কারণে ১০ জন গৃহশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলার আসামীদের সাজা হয় না। আদালতে মামলাগুলো অধিকাংশই চূড়ান্ত রায় পায় না। বেশিরভাগ ঘটনাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। দারিদ্রের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মামলার বাদীরা অভিযুক্তদের সঙ্গে রফা করে মামলা তুলে নিতে বাধ্য হন। গৃহকর্মীদের অভিভাকরা টাকার বিনিময়ে আপস করে ফেলেন। অনেক সময় তাদের আইনজীবীর কাছে মীমাংসা করে দিতে কান্নাকাটি করেন। মাত্র ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে হত্যা কিংবা অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো বেচাকেনা হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে এবং আদালতের নাগালের বাইরে চলে যায়। বাসাবাড়িতে শিশুকে গৃহকর্মে ভারি কাজ করানোর অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করার বিধান রয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশু দন্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর আওতায় বিচার চাইতে পারে। গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রায় প্রতিটি ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৪ (খ) ধারায় মামলা হয়। কিন্তু এ আইনটিতে আসামীদের সাজা দেয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। এ আইনে কেবল দাহ্য পদার্থ দ্বারা পুড়ে গেলে সাজার সুযোগ থাকে। কিন্তু বেত্রাঘাত, গরম খুনতি, লোহা, ইস্ত্রির ছ্যাকা, গরম পানি ঢেলে দেয়া এ আইনে কভার করে না। গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় দন্ডবিধির (২৩, ২৪, ২৫, ২৬) ধারায় মামলা করা উচিত। ২০০৯ সালের জাতীয় শিশু শ্রম নিরসন নীতিমালা গৃহকর্মকে অনানুষ্ঠানিক খাতের চাকরি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম কাতারে রয়েছে। কিন্তু শিশু গৃহকর্মীদের বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত কর্মসূচি নেই। শিশু গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন হচ্ছে অহরহ। এই অধিকার নিশ্চিত করতে নিবন্ধনের ব্যবস্থার পাশাপাশি নজরদারির জন্য জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা জরুরী।