ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৯:৪৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
এক বছরে ১৭ লাখ শিশুর জন্ম অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে হামলা-অপমানে ভাঙছে মাঠপুলিশের মনোবল কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন তারেক রহমান ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে প্রযুক্তির হাত ধরেই: প্রধান উপদেষ্টা ‘ডেইরি ফার্ম জাতীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত’

হামলা-অপমানে ভাঙছে মাঠপুলিশের মনোবল

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:৫২ এএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। এরই মধ্যে নির্বাচনি মাঠে দায়িত্ব পালনে প্রশিক্ষণসহ পুলিশের দাপ্তরিক সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। কিন্তু সারা দেশে জাতীয় নির্বাচনের মতো এই মহাযজ্ঞ সন্তোষজনকভাবে শেষ করার গুরুদায়িত্ব পালনে পুলিশের প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের ভেঙে যাওয়া মনোবলের ঘাটতি এখনো দৃশ্যমান। পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানেই এসব বিষয় উঠে এসেছে। পুলিশের ওই পরিসংখ্যানে গত বছর পুলিশের ওপর ৬০১টি হামলায় মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, গত বছর জানুয়ারিতে পুলিশের ওপর ৩৮টি হামলা হয়েছে, মে ও জুনে হয়েছে ১০৬টি। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মাস ডিসেম্বরেও পুলিশের ওপর ২৯টি হামলার মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। যেখানে পুলিশের হামলা ঠেকানোর কথা, সেখানে পুলিশ যদি নিজেই আক্রান্ত হয়, তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বকাঝকা করা হয় এবং সেগুলোর ভিডিও যদি ছড়িয়ে পড়ে; তাহলে পুলিশের মনোবলের ঘাটতি কোথায় গিয়ে ঠেকে? পুলিশ হেনস্তার বিচারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এ অবস্থায় নির্বাচনি বৈতরণি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, পুলিশের মনোবল দুর্বল হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। পুলিশ যদি টহল বা তল্লাশি চালাতে অনিচ্ছুক হয়, অপরাধীরা তখন আরও সুযোগ নেয়।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল-সবখানেই পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অশনিসংকেত। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন পুলিশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় ৬০১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২, মেতে ৬২, জুনে ৪৪, জুলাইয়ে ৩৯, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ এবং ডিসেম্বরে ২৯টি মামলা হয়। একই সময়ে ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলার মামলা হয়েছে ৮৯টি। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই ‘ছোটখাটো’ ঘটনা রিপোর্ট করা হয় না। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগে অপরাধীরা পুলিশ দেখলে পালানোর চেষ্টা করত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের মুখোমুখি হচ্ছে। কোথাও আসামি ধরতে গেলে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে বাধা দিচ্ছে, কোথাও মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে ‘মব’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করার ঘটনাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের কাছ থেকে শটগান ও ওয়াকিটকি ছিনিয়ে নেওয়া এবং গ্রেফতার করা আসামিকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু পুলিশের নিরাপত্তাকেই নয়, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।

শুক্রবার ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশ একটি নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলকে সিগন্যাল দেওয়ার জেরে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহত করা হয়। ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার ধুনটে মব সৃষ্টি করে দুই পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালানো হয়। একই দিন রাতে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান এক র‌্যাব সদস্য। এছাড়া ১৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানাধীন দিগারকান্দা ফিশারি মোড় এলাকায় মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আরিফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে আনার সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে ১৬ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দুয়ারাবাজার উপজেলার মৌলারপাড় এলাকায় পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে পুলিশ হামলার শিকার হয়। ৩১ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে আহত হন ছয় পুলিশ সদস্য। একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে হামলায় আহত হন বাহিনীর সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অনেক পুলিশ সদস্য এখন ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। ডিএমপির মিরপুর জোনের একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের পুলিশ সদস্যরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। প্রায়ই তাচ্ছিল্য, দুর্ব্যবহারে শিকার হতে হয়। একজন এসআই বলেন, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। কোথাও গেলে যদি স্থানীয় লোকজন ঘিরে ধরে, তখন নিজের নিরাপত্তার কথাই আগে ভাবতে হয়। অনেক ঘটনায় রিপোর্ট করলে উলটো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্যাট্রোল দায়িত্ব পালন, তল্লাশি চৌকি কিংবা নিয়মিত অভিযানের সময়ও হামলার শিকার হচ্ছেন সদস্যরা। কোথাও ডাকাতচক্র, কোথাও সন্ত্রাসীগোষ্ঠী, আবার কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিরা পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলার পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব কালচার’ বড় কারণ হয়ে উঠেছে। কোনো গুজব বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে লোকজন জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ ভিডিও বা রেকর্ড করা ক্লিপ পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়। এ অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। অনেক মামলায় তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে, আবার অভিযুক্তরা সহজেই জামিনে বের হয়ে আসে। এতে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। পুলিশবাহিনীর ভেতরেও এই ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, হামলাকারীরা শাস্তি না পাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এসব কারণে পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ বাড়ছে।

রাজারবাগ পুলিশে লাইন্সের একজন কনস্টেবল বলেন, আমরা মানুষ, আমাদেরও পরিবার আছে। ডিউটিতে বের হয়ে ফিরতে পারব কি না-এই চিন্তা মনের ভেতরে কুরে কুরে খায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নিয়মিত ঝুঁকি মোকাবিলা করেও যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত মনে না হয়, তাহলে পেশাগত মনোবল ক্ষয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তারা বলছেন, পুলিশকে কোণঠাসা করে রাখলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা-এই বাস্তবতাই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের যে সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন প্রয়োজন, বাস্তবে তা তারা পাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকে দোষারোপ করা হচ্ছে এবং চাপ সৃষ্টি করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চলছে। পুলিশ যখন বেআইনি আবদারে সাড়া দিচ্ছে না, তখনই তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর যে সুযোগ ছিল, সেখানে উলটো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। যারা পুলিশের ওপর হামলা করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা না নিলে দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।