ঢাকা, শুক্রবার ১১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:২৭:১২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রুশ ড্রোন হামলা, ইউক্রেনে নিহত ৫, শিশুসহ আহত ৬৭ ঢাকার বাতাসে কিছুটা স্বস্তি, দূষিত শহরের তালিকায় ২৩তম কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম রাজধানীতে বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা মাত্র ২২ বছরেই থামল ‘মিস অস্ট্রিয়া’র জীবন লঘুচাপে উত্তাল সাগর, ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত নারী এশিয়া কাপ টি-২০: বাংলাদেশের মিশন শেষ বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি, মাছ-তেল-সবজিতে অস্বস্তি শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আর নেই

আমীরুল ইসলাম চলে গেলেন, রেখে গেলেন শৈশবের আলো

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৩৬ এএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম

কিছু মানুষের চলে যাওয়ার খবর কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ হয়ে আসে না। খবরটি পড়ার পর বুকের ভেতর কোথাও যেন হঠাৎ একটি দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মনে হয়, জীবনের পরিচিত কোনো বারান্দা থেকে একজন মানুষ উঠে গেলেন—যাকে আমরা প্রতিদিন দেখতাম না, কিন্তু জানতাম, তিনি আছেন। তার সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে, কোনো বই নিয়ে আলোচনা হবে, কোনো লেখা নিয়ে তর্ক হবে, কোনো নতুন শিশুর বইয়ের পরিকল্পনা হবে। তারপর হঠাৎ জানতে হয়—সেই মানুষটি আর নেই।

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের চলে যাওয়ার খবরটি আমার কাছে তেমনই এক বেদনাবিধুর সংবাদ।

আমীরুল ইসলাম ছিলেন শিশুদের জন্য লিখতেন—এই পরিচয়টুকু দিয়ে তাকে সম্পূর্ণ চেনা যায় না। শিশুদের জন্য লেখা মানে শুধু ছোটদের উপযোগী গল্প, ছড়া কিংবা মজার কাহিনি লেখা নয়। শিশুর জন্য লিখতে হলে নিজের ভেতরে একটি নির্মল জানালা খোলা রাখতে হয়। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা, ব্যস্ততা, ক্লান্তি, অভিমান, হিসাব-নিকাশের ভিড়ের মধ্যেও সেই জানালার ওপাশে দেখতে হয় শিশুর চোখ দিয়ে।

আমীরুল ইসলাম সেই জানালাটি খোলা রেখেছিলেন দীর্ঘদিন।

শিশুসাহিত্যের পথ কখনো খুব সহজ পথ নয়। বড়দের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়, বিতর্ক হয়, পুরস্কার হয়, পাঠকের প্রশংসা-সমালোচনা হয়। কিন্তু একজন শিশুসাহিত্যিক যখন একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেন, তখন তার সামনে থাকে অন্যরকম এক দায়িত্ব। সেই বইয়ের ভেতর দিয়ে শিশুটি পৃথিবীকে চিনতে শেখে, মানুষকে চিনতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে, কখনো কখনো স্বপ্ন দেখতেও শেখে। একজন লেখকের শব্দ তখন নিছক শব্দ থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি বেড়ে ওঠা মনের অদৃশ্য সঙ্গী।

আমীরুল ইসলাম সেই সঙ্গী হয়ে ছিলেন বহু শিশুর।

আড়াই শতাধিক বইয়ের দীর্ঘ সৃষ্টিযাত্রা কোনো সামান্য অর্জন নয়। এর পেছনে আছে অসংখ্য রাত, একের পর এক কাগজ, অগণিত চরিত্র, গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়া অজস্র শিশু, তাদের হাসি-কান্না, বিস্ময় ও স্বপ্ন। একজন লেখকের এত দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হয়তো কোনো পুরস্কার নয়; হয়তো কোনো এক অচেনা পাঠকের বলা—‘আপনার বই পড়ে আমি বড় হয়েছি।’

আমীরুল ইসলাম এমন অসংখ্য অচেনা পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

তার সৃষ্টির স্বীকৃতি এসেছে নানা পুরস্কারে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ আরও সম্মাননা। কিন্তু আজ তার চলে যাওয়ার মুহূর্তে মনে হচ্ছে, এসব পুরস্কারের বাইরেও তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল শিশুর মুখের হাসি। যে শিশুটি তার লেখা পড়ে গল্পের চরিত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে, যে কিশোর কোনো এক দুপুরে তার বই হাতে নিয়ে নিজের পৃথিবীটাকে একটু বড় করে দেখেছে—সেই পাঠকের ভালোবাসার কোনো পদক নেই, কোনো সনদ নেই। অথচ সেটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।

আমীরুল ইসলাম শুধু বই লিখে থেমে থাকেননি। গণমাধ্যমেও তার দীর্ঘ পথচলা ছিল। সৃজনশীলতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব সামলেছেন। একটি মানুষের জীবন যে কত বিচিত্র দায়িত্ব, স্বপ্ন ও শ্রমের সমষ্টি—তার জীবন তারও একটি উদাহরণ।

তবু আজ তার কথা মনে পড়লে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে একজন শিশুসাহিত্যিকের মুখ।

মনে হয়, যিনি শিশুদের জন্য এত গল্প লিখলেন, তার নিজের চলে যাওয়াটাও যেন একটি গল্পের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে গেল। কিন্তু এই গল্পের শেষটা লেখক লিখে যেতে পারেননি। কারণ লেখকের জীবনের শেষ বাক্যটি কখনোই তাঁর নিজের হাতে লেখা থাকে না। সেটি লিখে যায় সময়।

সময় বড় নির্মম।

একদিন যে মানুষটি লিখেছেন, আজ তাকে নিয়ে আমরা লিখছি। যে মানুষটি অন্যদের গল্পের চরিত্র বানিয়েছেন, আজ তিনিই হয়ে গেলেন আমাদের স্মৃতির একটি চরিত্র। যে মানুষটি শিশুদের কল্পনার জগৎকে রঙে ভরিয়েছেন, তার চলে যাওয়ার খবরটিই আজ আমাদের চারপাশকে এতটা ধূসর করে দিয়েছে।

মৃত্যুর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক বোধ হয় এটাই—মানুষটি চলে যায়, কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের যে কথাগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যায়, সেগুলো আর শেষ করার সুযোগ থাকে না।

কিছু কথা বলা হয়নি।
কিছু দেখা হওয়ার কথা ছিল।
কিছু লেখা নিয়ে কথা হওয়ার কথা ছিল।
কিছু স্বপ্ন হয়তো একসঙ্গে দেখার কথা ছিল।

সবকিছু হঠাৎ থেমে যায়।

তবু একজন লেখকের মৃত্যু পুরোপুরি মৃত্যু নয়। কারণ তার শরীরের সঙ্গে তার শব্দগুলো মরে না। একটি বইয়ের মলাট খুললেই তিনি ফিরে আসতে পারেন। কোনো গল্পের চরিত্রের হাসিতে, কোনো ছড়ার ছন্দে, কোনো শিশুর বিস্মিত চোখে তিনি আবার আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারেন।

এটাই হয়তো লেখকের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।

মানুষের জীবন খুব ছোট। অথচ মানুষের লেখা কখনো কখনো মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়। আমরা চলে যাই, আমাদের ঘর বদলে যায়, চেয়ার খালি পড়ে থাকে, টেবিলের ওপরের চশমা আর কেউ পরে না, ফোন আর বেজে ওঠে না—কিন্তু একটি বইয়ের পাতায় হাত রাখলে লেখকের আঙুলের উষ্ণতা যেন কোথাও থেকে যায়।

আমীরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তাই হবে।

কোনো এক সকালে কোনো মা তার সন্তানের হাতে আমীরুল ইসলামের বই তুলে দেবেন। কোনো স্কুলের লাইব্রেরির তাক থেকে কোনো শিশু তার বই নামিয়ে নেবে। কোনো কিশোর গল্প পড়তে পড়তে হেসে উঠবে। হয়তো সেই শিশুটি জানবেও না, যে মানুষটি তাকে হাসালেন, তিনি পৃথিবীতে আর নেই।

কিন্তু লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় অমরত্ব আর কী হতে পারে?

যে শিশু তাকে চেনে না, তার শৈশবের অংশ হয়ে থাকা।

আজ আমীরুল ইসলাম নেই। কিন্তু বাংলা শিশুসাহিত্যের যে দীর্ঘ পথ তিনি হেঁটে গেছেন, সেই পথে তার পদচিহ্ন থাকবে। তার বই থাকবে। তার চরিত্রগুলো থাকবে। থাকবে তার শব্দের ভেতর দিয়ে তৈরি করা সেই ছোট্ট অথচ বিস্ময়কর পৃথিবী—যেখানে শিশুরা এখনও স্বপ্ন দেখতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, হাসতে পারে, আর পৃথিবীকে একটু বেশি সুন্দর বলে বিশ্বাস করতে পারে।

মানুষ চলে যায়।
স্মৃতি থেকে যায়।
আর সত্যিকারের লেখক হলে—শব্দ থেকে যায়।

আমীরুল ইসলাম, আপনার জন্য আজ আমাদের সকলের খুব মন খারাপ।

আপনার চলে যাওয়ার শূন্যতা হয়তো সময়ের সঙ্গে একটু একটু করে অভ্যাস হয়ে যাবে। কিন্তু শিশুসাহিত্যের পাতায়, কোনো শিশুর হাতে ধরা বইয়ের ভাঁজে, কোনো মায়ের কণ্ঠে গল্প পড়ে শোনানোর মুহূর্তে আপনি আবার ফিরে আসবে।

কারণ আপনি চলে গেছেন, কিন্তু আপনার গল্পগুলো-সৃষ্টিগুলো যায়নি।

আর একজন শিশুসাহিত্যিকের জন্য এর চেয়ে সুন্দর, এর চেয়ে গভীর বিদায় আর কী হতে পারে!