কমছে না হাম, বাড়ছে ডেঙ্গু, প্রতিকারের উপায় কি
মানিক নূর | উইমেননিউজ২৪প্রকাশিত : ০১:২৩ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার
প্রতীকী ছবি।
একদিকে হাম। অন্যদিকে ডেঙ্গু। দুটি ভিন্ন রোগ, কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর তাদের চাপ যেন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক-নার্সের শ্রম, ওষুধ-স্যালাইন, রোগীর স্বজনের উদ্বেগ—সবকিছুর ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একটি রোগ প্রতিরোধযোগ্য টিকা দিয়ে ঠেকানো সম্ভব, আর অন্যটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হলো পরিচ্ছন্নতা ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। তারপরও আমরা দুই রোগের সঙ্গেই লড়াই করছি।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?
হামের ভয়াবহতার খবর গত কয়েক মাস ধরেই আসছে। মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২; এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে এবং ৯০২টি মৃত্যু সন্দেহজনক হিসেবে তালিকাভুক্ত। একই সময়ে হাম ও হামসদৃশ রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি শিশুর মুখ, একটি মায়ের কান্না, একজন বাবার অসহায় দৌড়ঝাঁপ। যে রোগের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে কার্যকর টিকা রয়েছে, সেই রোগে এত শিশুর মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি প্রশ্ন।
হামের প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমার পর আবার আগস্টে সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে—এমন তথ্যও উঠে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এমন স্বস্তির জায়গায় আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি।
আর ঠিক এই সময়েই ডেঙ্গু বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং মারা গেছেন ১৩৩ জন। শুধু ৯ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ৪৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন তিনজন।
পরদিন পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হওয়ার খবর এসেছে। ১০ সেপ্টেম্বরের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের পরিচিত একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়। এটি এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে হাসপাতালগুলোকে একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু—দুই ধরনের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গু রোগীর দ্রুত বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা আরও সামনে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ আমাদের হাতে সময় খুব বেশি নেই।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা বছরের পর বছর একই দৃশ্য দেখি। বর্ষা আসে, পানি জমে, এডিস মশা বাড়ে, ডেঙ্গু বাড়ে, হাসপাতাল ভরে যায়, তারপর শুরু হয় মশা মারার অভিযান। কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা আবার ভুলে যাই। পরের বছর একই চক্র নতুন করে শুরু হয়।
এই চক্র ভাঙতে হলে কেবল ফগিং দিয়ে হবে না।
এডিস মশা সাধারণত অল্প পরিমাণ জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বড় বড় সড়কে ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা মাঝেমধ্যে ফগিং করে ডেঙ্গুকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবন, ড্রেন, ডাবের খোসা, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র—যেখানেই পানি জমতে পারে, সেসব জায়গা নিয়মিত পরিদর্শন ও পরিষ্কার করা।
কিন্তু দায়িত্বটি শুধু নাগরিকের নয়, শুধু সিটি করপোরেশনেরও নয়। এটি সম্মিলিত দায়িত্ব।
একজন নাগরিক যদি নিজের বাড়ির ছাদ পরিষ্কার রাখেন, কিন্তু পাশের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে পানি জমে থাকে, তাহলে তাঁর সতর্কতা যথেষ্ট নয়। একটি বাড়ি পরিষ্কার থাকলেই হবে না, পুরো মহল্লাকে নিরাপদ রাখতে হবে। ডেঙ্গুর মশা কোনো বাড়ির সীমানা মানে না।
একইভাবে হাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও কেবল স্বাস্থ্যকর্মীর নয়। টিকা কর্মসূচি নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য রাখা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা, টিকার বিষয়ে ভুল তথ্য ও ভয় দূর করা—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
হামের এই সংকট আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে: একটি টিকা কর্মসূচি একবার দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি বহু বছর ধরে বহন করতে হতে পারে।
তাই জরুরি টিকা কার্যক্রম চালিয়ে কিছুটা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে হবে। কোন এলাকার কত শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, কেন রয়েছে—তার হিসাব থাকতে হবে। দুর্গম এলাকা, দরিদ্র পরিবার, ভাসমান জনগোষ্ঠী—কেউ যেন বাদ না পড়ে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি সাধারণত তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন একসঙ্গে একাধিক সংকট আসে। এখন সেটিই ঘটছে। হাম চলছে, ডেঙ্গু বাড়ছে। এর সঙ্গে যদি অন্যান্য মৌসুমি রোগের চাপ যুক্ত হয়, তাহলে হাসপাতালগুলো আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
তাই এখন দরকার আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি।
দরকার তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। দরকার প্রতিদিনের রোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় সংক্রমণ বাড়ছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। দরকার হাসপাতালের শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর আগাম প্রস্তুতি। দরকার শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা।
আর সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।
কারণ ডেঙ্গু কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ খাত এবং নাগরিক সমাজ—সবার সমস্যা। একইভাবে হাম শুধু হাসপাতালের রোগী নয়; এটি একটি শিশুর টিকা পাওয়ার অধিকার, একটি পরিবারের স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন।
আমরা প্রায়ই রোগী বাড়ার পর হাসপাতাল বাড়ানোর কথা বলি। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত সাফল্য হলো—হাসপাতালে রোগীই যেন কম আসে।
একটি শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই যদি তার টিকা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই সাফল্য।
একজন মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার আগেই যদি তার বাড়ির পাশের জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা যায়, সেটিই সাফল্য।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাওয়ার পর মাপা উচিত নয়; বরং কতগুলো মৃত্যু আগেই প্রতিরোধ করা গেল, সেটিই হওয়া উচিত মূল মাপকাঠি।
আজ আমাদের সামনে তাই দুটি সংকেত স্পষ্ট। হাম আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রতিরোধের ব্যবস্থায় সামান্য ফাঁকও ভয়াবহ মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে। আর ডেঙ্গু মনে করিয়ে দিচ্ছে—নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন দিয়েই দিতে হয়।
এই দুই সংকেতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
হাম যেন আর একটি শিশুর জীবন না নেয়।
ডেঙ্গু যেন আর একটি পরিবারকে শোকের ঘরে না পাঠায়।
রোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের ভেতরে নয়—লড়াইটি শুরু করতে হবে তারও অনেক আগে, টিকার কেন্দ্রে, বাড়ির উঠানে, ছাদের কোণে, ড্রেনের পাশে এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের টেবিলে।
কারণ একটি সুস্থ সমাজ তৈরি হয় শুধু অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে নয়; মানুষকে অসুস্থ হওয়ার আগেই রক্ষা করার মধ্য দিয়ে।
- কমছে না হাম, বাড়ছে ডেঙ্গু, প্রতিকারের উপায় কি
- ফ্রি এআই প্রশিক্ষণ, প্রতিদিন মিলবে ২০০ টাকা ভাতা
- রুশ ড্রোন হামলা, ইউক্রেনে নিহত ৫, শিশুসহ আহত ৬৭
- হৃদরোগের অবনতিতে মার্কিন জেল থেকে মুক্তি চান মাদুরোর স্ত্রী
- ঢাকার বাতাসে কিছুটা স্বস্তি, দূষিত শহরের তালিকায় ২৩তম
- কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম
- রাজধানীতে বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা
- দেশের বাজারে ফের কমল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?
- ডিমের দামে হাঁসফাঁস, কমছে না বাজারের চাপ
- আমীরুল ইসলাম চলে গেলেন, রেখে গেলেন শৈশবের আলো
- মাত্র ২২ বছরেই থামল ‘মিস অস্ট্রিয়া’র জীবন
- লঘুচাপে উত্তাল সাগর, ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
- নারী এশিয়া কাপ টি-২০: বাংলাদেশের মিশন শেষ
- বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি, মাছ-তেল-সবজিতে অস্বস্তি
- শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আর নেই
- বিশ্বে এখন হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে!
- বিশ্বকাপের পর প্রথমবার দল ঘোষণা করল ব্রাজিল
- বিএনপিকে নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল, গালাগালি
- এসএসসির খাতা পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, জানা যাবে যেভাবে
- ছেলেকে দেখার তৃষ্ণা নিয়েই মারা গেলেন চিন্ময়ের মা
- ফের সাগরে লঘুচাপের শঙ্কা, হতে পারে ভারী বৃষ্টি
- যে কারণে সুস্মিতার কাছে ‘মিস ইন্ডিয়া’র মুকুট হারিয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া
- ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন পুতুল
- আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ উন্মোচন, ক্যামেরা-ব্যাটারিতে পরিবর্তন
- নারী এশিয়া কাপ টি-২০: বাংলাদেশের মিশন শেষ
- আমীরুল ইসলাম চলে গেলেন, রেখে গেলেন শৈশবের আলো
- দেশের বাজারে ফের কমল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?
- লঘুচাপে উত্তাল সাগর, ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
- কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম
- রাজধানীতে বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা



