ঢাকা, শুক্রবার ১১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:২৯:০২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রুশ ড্রোন হামলা, ইউক্রেনে নিহত ৫, শিশুসহ আহত ৬৭ ঢাকার বাতাসে কিছুটা স্বস্তি, দূষিত শহরের তালিকায় ২৩তম কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম রাজধানীতে বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা মাত্র ২২ বছরেই থামল ‘মিস অস্ট্রিয়া’র জীবন লঘুচাপে উত্তাল সাগর, ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত নারী এশিয়া কাপ টি-২০: বাংলাদেশের মিশন শেষ বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি, মাছ-তেল-সবজিতে অস্বস্তি শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আর নেই

বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি, মাছ-তেল-সবজিতে অস্বস্তি

জোসেফ সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৪৭ এএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে একদিকে কিছুটা স্বস্তির খবর, অন্যদিকে বেশ কিছু পণ্যে এখনো অস্বস্তি কাটেনি। চাল ও চিনির দাম কিছুটা কমেছে, আদার দামও আগের তুলনায় নেমেছে। কিন্তু আলু, বোতলজাত সয়াবিন তেল, মাছ এবং কয়েক ধরনের সবজির দাম এখনো ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়লেও সবজির দামে তার পুরোপুরি প্রভাব পড়ছে না।

আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ানবাজার, মহাখালীসহ কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সকালের দিকে বাজারগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সবজির দোকানে ক্রেতারা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে গিয়ে দাম তুলনা করছিলেন। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি নিচ্ছেন, কেউ আবার পছন্দের মাছ-মাংস বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনছেন।

এক ক্রেতা বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে এসে কয়েকটি পণ্য কিনেছি, এখন একই তালিকা করতে গেলে বাড়তি টাকা লাগছে। কিছু জিনিসের দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু সংসারের প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম কমেনি। ফলে মোট বাজার খরচ কমছে না।’

আরেক ক্রেতার ভাষ্য, ‘সবজির সরবরাহ বাড়ছে বলে শুনি, কিন্তু বাজারে এসে সেই স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না। দুই-তিন ধরনের সবজি কিনতেই অনেক টাকা চলে যাচ্ছে। মাছ কিনতে গেলে তো হিসাবই মেলানো কঠিন।’

চালের দামে কিছুটা স্বস্তি: দীর্ঘদিন চড়া থাকার পর চালের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। রাজধানীর বাজারে মোটা চালের দাম কেজিতে কয়েক টাকা কমেছে। সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৩ টাকা, বিআর-২৮ ও পাইজামজাতীয় চাল ৫৯ থেকে ৬২ টাকা এবং মিনিকেট বা চিকন চাল ৭০ থেকে ৭২ টাকার মধ্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ঢাকার বাজারদরের তথ্যে মোটা চালের খুচরা দাম ৫০ থেকে ৫২ টাকা এবং মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে দেখানো হয়েছে। সরু চালের ক্ষেত্রে জাত ও মানভেদে দাম আরও বেশি।

বিক্রেতারা বলছেন, নতুন চাল বাজারে আসতে শুরু করা এবং আমদানির উদ্যোগের কারণে চালের বাজারে কিছুটা চাপ কমেছে। তবে পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান এবং চালের মানভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে।

এক চাল বিক্রেতা বলেন, ‘আগের মতো চালের দাম নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বেশি নেই। কয়েক টাকা কমেছে। তবে সব ধরনের চালের দাম একসঙ্গে কমেনি।’

চিনিতে কমেছে প্রায় ১০ টাকা: চিনির বাজারেও কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজারে প্যাকেটজাত চিনি ১২৪ থেকে ১২৫ টাকা এবং খোলা চিনি প্রায় ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও দুই ধরনের চিনির দাম ছিল যথাক্রমে প্রায় ১৩০ ও ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

এক ক্রেতা বলেন, ‘চিনির দাম কমেছে, এটা ভালো খবর। কিন্তু শুধু চিনি বা চালের দাম কমলে তো হবে না। রান্নার তেল, মাছ, সবজি—সবকিছুর দাম যদি বেশি থাকে, তাহলে সংসারের খরচ কমে না।’

বোতলজাত সয়াবিন তেলে স্বস্তি নেই: ভোজ্যতেলের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতির কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও তা নির্ধারিত দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক।

সাম্প্রতিক বাজারে পাঁচ লিটারের বোতল সয়াবিন তেলের দাম ৮১৮ টাকা পর্যন্ত দেখা গেছে। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৫ থেকে ১৬৭ টাকা এবং পাম তেল প্রায় ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক বিক্রেতা বলেন, ‘বোতলজাত তেল সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ ঠিক থাকলে ক্রেতারাও স্বস্তি পাবেন।’

আলুতে উল্টো চা: চালের দাম কমলেও আলুর বাজারে সেই স্বস্তি নেই। নতুন আলু বাজারে আসতে শুরু করলেও দাম কমেনি। মানভেদে নতুন আলু ৯০ থেকে ১১০ টাকা এবং পুরোনো আলু ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বলে বাজার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

ক্রেতারা বলছেন, আলুর মতো তুলনামূলক সস্তা সবজি হিসেবেই তাঁরা সাধারণত বেশি পরিমাণে কিনে থাকেন। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটিও এখন সংসারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সবজিতে সরবরাহ বাড়লেও কমছে না দাম: বাজারে সবজির সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবু দাম আশানুরূপ কমেনি। বেগুন ৭০-৮০ টাকা, করলা প্রায় ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, লতি ৭০ টাকা, কচু ৬০ টাকা, ধুন্দুল ৫০ টাকা এবং পটোল ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

পেঁপে তুলনামূলক কম দামে, প্রায় ৪০ টাকা কেজি। কিন্তু গাজর ১৩০, কচুরমুখী ১০০, টমেটো ১২০ এবং শিম প্রায় ৮০ টাকা কেজি। শসা ৪০-৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০-৫০ টাকা এবং লাউ ৫০-৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

শাকের মধ্যে লালশাক, মুলাশাক ও কলমিশাক তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও পুঁইশাক, পালংশাকসহ কয়েক ধরনের শাকের দাম বেশি।

এক সবজি বিক্রেতা বলেন, ‘বাজারে সবজি আসছে। কিন্তু পরিবহন, শ্রমিকের খরচ, পাইকারি দাম—সব মিলিয়ে আমাদের কেনা দামই বেশি পড়ে। তাই খুব কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।’

কাঁচামরিচে কিছুটা স্বস্তি: কাঁচামরিচের দাম সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্রায় ১০০ টাকা এবং পাইকারিতে ৭০-৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে কাঁচামরিচের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে।

তবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক ঢাকার বাজারদর তালিকায় কাঁচামরিচের খুচরা দাম আরও বেশি, ৭০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বাজার ও মানভেদে দামের পার্থক্য থাকায় ক্রেতাদের একাধিক দোকানে দর যাচাই করে কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিক্রেতারাও।

পেঁয়াজ-রসুনে বড় পরিবর্তন নেই: পেঁয়াজের বাজার মোটামুটি স্থির। ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ ১১৮-১২০ টাকা, দেশি হাইব্রিড ১১০-১১৫ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ৯৮-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

রসুনের দামও খুব একটা কমেনি। দেশি রসুন ২৩০-২৫০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে আদার বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। দেশি আদা ১৪০-১৫০ টাকা এবং চীনা আদা ১৭০-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েক দিনে আদার দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

মুরগি ও ডিমে মোটামুটি স্থিতিশীলতা: মাংসের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। সোনালি মুরগি ২৯০-৩০০ টাকা এবং ব্রয়লার ১৭৫-১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম ৫৫০-৬০০ টাকা পর্যন্ত।

গরুর মাংস ৭৫০-৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

ডিমের দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল। লাল ও সাদা ফার্মের ডিম প্রতি ডজন প্রায় ১৪৪-১৪৫ টাকা। হাঁসের ডিম ২৪০-২৫০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিমের ডজন প্রায় ২৪০ টাকা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যেও ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে।

মাছের বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ: মাছের বাজারে ক্রেতাদের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। ইলিশের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায়। দেড় কেজি ইলিশ ৩ হাজার টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ৫০০-৬০০ গ্রাম ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অন্যান্য মাছের দামও বেড়েছে। রুই ৩৮০-৪৫০ টাকা, কাতল ৪০০-৪৮০ টাকা, চাষের শিং ৫৫০ টাকা, মাগুর ৫০০ টাকা, কৈ ২৪০-২৮০ টাকা এবং কোরাল ৭৫০-৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ ১৮০-২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ১৮০-২২০ টাকা কেজি।

এক মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘মাছের দাম আমাদেরও বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারে কম দামে বিক্রি করার সুযোগ থাকে না।’

এক ক্রেতার মন্তব্য, ‘আগে সপ্তাহে অন্তত এক-দুই দিন মাছ কিনতাম। এখন দাম দেখে ছোট মাছ বা কম দামের মাছ নিতে হচ্ছে। ইলিশ তো অনেক পরিবারের নিয়মিত খাবারের তালিকা থেকেই বাদ পড়েছে।’

বাজারে ক্রেতার হিসাব মিলছে না: বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্রেতাই এখন প্রয়োজনের তালিকা ছোট করছেন। এক কেজির জায়গায় আধা কেজি, ভালো মানের পণ্যের বদলে মাঝারি মানের পণ্য এবং মাছ-মাংসের ক্ষেত্রে কম পরিমাণ কেনার প্রবণতা বাড়ছে।

এক নিম্নমধ্যবিত্ত ক্রেতা বলেন, ‘বাজারে এসে মনে হয় প্রতিদিনই নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনের বাজারও শেষ হয় না।’

তবে বিক্রেতাদের বক্তব্য, শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপালে সমস্যার সমাধান হবে না। পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিসহ নানা খরচ তাঁদের বহন করতে হয়।

নিয়মিত নজরদারির দাবি: বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুই পক্ষই নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো কোনো পণ্যের দাম কমলেও সব দোকানে একই দামে বিক্রি হয় না। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে পুরো খুচরা ব্যবসায়ী শ্রেণিকে দায়ী করা ঠিক নয়।

সাম্প্রতিক বাজার পর্যবেক্ষণেও ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষ নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যেও পণ্যভেদে খুচরা ও পাইকারি দামের পার্থক্য স্পষ্ট। যেমন ঢাকায় মোটা চালের পাইকারি দাম ৪২-৪৪ টাকা এবং খুচরা দাম ৫০-৫২ টাকা; দেশি পেঁয়াজের পাইকারি দাম ২৫-৪৩ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে ৪৫-৫৫ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে এখন ‘কিছুটা কমেছে, কিন্তু স্বস্তি ফেরেনি’—এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। চাল, চিনি ও আদার দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও তেল, আলু, মাছ এবং বেশ কিছু সবজির চড়া দাম সেই স্বস্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কমানো এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা না গেলে সাধারণ মানুষের বাজারের চাপ দ্রুত কমবে না।