ঢাকা, শুক্রবার ০৪, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:২৩:৪১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সিনিয়াকোভাকে হারিয়ে ইউএস ওপেনে জয় শুরু ওসাকার ইন্দোনেশিয়ার স্কুলে বিনামূল্যের খাবার খেয়ে ১৭০০ অসুস্থ বেলুচিস্তানে প্রকাশ্যে লোকসংগীতশিল্পীকে গুলি করে হত্যা নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টেইনেমের মৃত্যু ১২ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়সহ বৃষ্টির আভাস বাজারে স্বস্তি নেই, চড়া মাছ-মুরগি-তেল

ডেঙ্গু ও হামের ছোবলে দিশাহারা বাংলাদেশ

মানিক নূর | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪২ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একদিকে ডেঙ্গুর দাপট বাড়ছে, অন্যদিকে হামও যেন আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এক রোগের সঙ্গে লড়াই শেষ হওয়ার আগেই আরেক রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গভীর মনোযোগ দাবি করে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দুটি রোগের চরিত্র ভিন্ন হলেও দুটির বিস্তারের পেছনেই রয়েছে আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থার নানা দুর্বলতা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যেমন জরুরি, তেমনি হাম ঠেকাতে প্রয়োজন ব্যাপক ও কার্যকর টিকাদান। অর্থাৎ দুটি রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র আলাদা, কিন্তু দায়িত্ব একই—সময়মতো প্রতিরোধ নিশ্চিত করা।

ডেঙ্গু এবার আর শুধু ঢাকার রোগ নয়

ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এই মশাবাহিত রোগটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—ডেঙ্গু ক্রমেই রাজধানীকেন্দ্রিকতা হারিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম তিন দিনেই ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজার ৫৮৬ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য এসেছে। ৩ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ২৫২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন চারজন।

এর আগের দিনই আরও ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছিল। এক দিনে ১ হাজার ৩২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এডিস মশা এখন রাজধানীর গণ্ডি ছাড়িয়ে জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রশ্ন হলো—এত বছর পরও কেন আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধান তৈরি করতে পারলাম না?

প্রতি বছর বর্ষা এলেই মশক নিধন অভিযান, ওষুধ ছিটানো, লার্ভা ধ্বংস, সচেতনতামূলক প্রচারণা—এসব শুরু হয়। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কাজ আসলে মৌসুমি হওয়ার কথা নয়। এডিস মশা ও তার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সারা বছরই ধারাবাহিক অভিযান চালাতে হবে।

শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন, জমে থাকা পানি—সব জায়গাতেই নজর দিতে হবে। নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়। কারণ এডিস মশার বড় অংশ জন্ম নেয় মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের ছোট ছোট পানির আধারে।

আর হামের ভয়াবহতা আরও গভীর

ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের পরিস্থিতিও ভয়াবহ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবের পর দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিতভাবে ৯৮৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়; এর মধ্যে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন—দুই ধরনের মৃত্যুই রয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, দুই মাস কিছুটা কমার পর আগস্টে হাম আবার বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে আগস্টে ৩২ হাজার ৯৩৪টি হামসংক্রান্ত ঘটনা, ২৭ হাজার ৪৫৮টি হাসপাতালে ভর্তি এবং ১৩৬টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। জুলাইয়ের তুলনায় তিনটি সূচকই বেড়েছে।

এখানে আমাদের নিজেদের কাছেই একটি কঠিন প্রশ্ন রাখতে হয়—যে রোগ প্রতিরোধে টিকা রয়েছে, সেই রোগে এত মানুষ, বিশেষ করে শিশু, কেন মারা যাবে?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক। কিন্তু কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফলে হামের বড় আকারের প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি আমাদের টিকাদান কর্মসূচি, নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতারও সতর্কবার্তা।

হাসপাতাল কি সব বোঝা বইতে পারবে?

ডেঙ্গু ও হাম একই সময়ে বাড়তে থাকলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে হাসপাতালগুলোর ওপর।

একজন ডেঙ্গু রোগীর জন্য প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, তরল ব্যবস্থাপনা ও জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা। অন্যদিকে হামের রোগী—বিশেষ করে শিশুদের—নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি থাকে।

একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে এলে শুধু শয্যার সংকটই তৈরি হয় না; চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অক্সিজেন ও অন্যান্য চিকিৎসা উপকরণের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে।

তাই রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়াই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। রোগী যেন হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত না হন—প্রতিরোধের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।

দায় শুধু সরকারের নয়, কিন্তু নেতৃত্ব সরকারকেই দিতে হবে

জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি। কারণ জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মসূচি, অর্থ বরাদ্দ, নজরদারি, টিকাদান, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

তবে নাগরিকের দায়িত্বও রয়েছে।

বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, জ্বর হলে অবহেলা না করা, শিশুর টিকা সম্পূর্ণ করা—এসব কাজ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।

কিন্তু নাগরিক সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে আড়াল করা যাবে না। একটি শহরের অলিগলিতে দিনের পর দিন পানি জমে থাকবে, নির্মাণাধীন ভবনে মশার প্রজনন হবে, আর পরে নাগরিককে শুধু সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে—এভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়।

এবার দরকার সমন্বিত যুদ্ধ

ডেঙ্গু ও হামের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন সারাবছরের এডিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে নয়, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, নিয়মিত জরিপ এবং ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

হামের ক্ষেত্রে প্রয়োজন টিকাদানের ঘাটতি চিহ্নিত করে দ্রুত পূরণ করা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা এবং সংক্রমণের এলাকায় সক্রিয় নজরদারি বাড়ানো।

একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে রাজধানীমুখী চিকিৎসা-চাপ আরও বাড়বে।

প্রতিরোধে ব্যর্থতার মূল্য সবচেয়ে বেশি দেয় শিশুরা

এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—হামের শিকারদের বড় অংশ শিশু। একটি শিশু এমন একটি রোগে মারা যাচ্ছে, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক টিকা রয়েছে—এর চেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য ব্যর্থতার প্রশ্ন আর কী হতে পারে?

ডেঙ্গুতেও শিশুদের ঝুঁকি কম নয়। পরিবারের একজন সদস্য আক্রান্ত হলে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই বাড়ে না; কর্মক্ষম একজন অভিভাবককে হাসপাতালে থাকতে হয়, শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়, পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।

অর্থাৎ রোগের হিসাব শুধু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দিয়ে করা যায় না। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিশাল।

এখনই সিদ্ধান্তের সময়

বাংলাদেশ এর আগেও ভয়াবহ ডেঙ্গু দেখেছে। হাম নিয়েও আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের চাপ আমাদের সামনে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

প্রতিবার সংকটের সময় তৎপর হয়ে, পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে চলবে না। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে হতে হবে প্রতিরোধনির্ভর, তথ্যনির্ভর এবং সারা বছর সক্রিয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা মারলে হবে না—মশার জন্ম বন্ধ করতে হবে।

হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী চিকিৎসা করলেই হবে না—টিকা না পাওয়া শিশুকে খুঁজে টিকার আওতায় আনতে হবে।

আর সবচেয়ে জরুরি হলো, স্বাস্থ্যকে ব্যয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

আজ যদি প্রতিরোধে এক টাকা খরচ করতে অনীহা থাকে, কাল চিকিৎসায় তার চেয়ে বহু গুণ বেশি খরচ হবে। তার চেয়েও বড় কথা—কোনো অর্থ দিয়েই একটি শিশুর জীবন ফেরানো যায় না।

ডেঙ্গু ও হামের এই যুগপৎ ছোবল তাই কেবল একটি মৌসুমি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি প্রতি বছর রোগের পেছনে ছুটব, নাকি এবার সত্যিই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তুলব?

সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এবার প্রতিরোধেই জিততে হবে।