ঢাকা, শনিবার ২৯, আগস্ট ২০২৬ ১১:২২:৪০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন আইরিন খান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫০ কিলোমিটার যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা নেপাল-চীনে বন্যায় নিহত বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ ২৫০০ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিতে ডুবে ৫ শিশুর মৃত্যু নেপালে বন্যা: মৃত্যু বেড়ে ৫৭৯, নিখোঁজ প্রায় ২ হাজার নেপালের বন্যা: হিমালয় যখন সতর্কবার্তা দেয় নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবন

নেপালের বন্যা: হিমালয় যখন সতর্কবার্তা দেয়

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:২৯ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

নেপাল আবারও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম মুখোমুখি। ২৬ আগস্ট হিমালয়ঘেরা দেশটির উত্তরাঞ্চলে যে ভয়াবহ হড়পা বান আঘাত হেনেছে, তা নিছক আরেকটি মৌসুমি বন্যা নয়। হিমবাহ ধস, পাহাড়ি ঢল, নদীর আকস্মিক পানি বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে ভঙ্গুর পাহাড়ি অবকাঠামো—সবকিছু মিলিয়ে এটি পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংস হয়েছে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিপর্যয়টি ঘটেছে অত্যন্ত দ্রুত। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও মাটি নদীপথে নেমে এসে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি করে। কিছু এলাকায় নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক মিটার বেড়ে যায়। ফলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়ও দেওয়া হয়নি।

এ ঘটনায় শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও বিপদের মুখে পড়েছেন। কৈলাস-মানস সরোবরগামী বহু মানুষ এই অঞ্চলে আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নেপালের এই দুর্যোগ এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিপর্যয় নয়; এর মানবিক অভিঘাত আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এমন বিপর্যয় কি কেবল প্রকৃতির খেয়াল?

উত্তরটি এত সরল নয়।

হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং হিমবাহ-গঠিত হ্রদের সংখ্যা ও ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের ক্ষেত্রেও হিমবাহ ধসকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের বরফ ও পর্বতব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থাৎ আজ নেপালে যে বিপর্যয় ঘটছে, তার ভেতরে ভবিষ্যৎ দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা রয়েছে।

হিমালয়ের বিপদ মানে শুধু নেপালের বিপদ নয়

হিমালয় কোনো দেশের একক সম্পদ নয়। এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন অসংখ্য নদী ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। হিমালয়ের তুষার, হিমবাহ ও নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে একটি বড় ধস বা হিমবাহ ভাঙনের ঘটনা তাই শুধু কয়েকটি গ্রাম বা একটি নদী অববাহিকার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, কৃষি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পর্যটন এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ভাটির দেশ। উজানে হিমালয় অঞ্চলের নদী ও জলপ্রবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের নদী ব্যবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে। অবশ্যই নেপালের এই নির্দিষ্ট দুর্যোগের পানি সরাসরি বাংলাদেশের বন্যা তৈরি করবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। কিন্তু হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার নদী ব্যবস্থাকে কীভাবে বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে এখনই আঞ্চলিকভাবে ভাবা জরুরি।

উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দরকার আগাম সতর্কতা

দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান শুরু করা জরুরি। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজ অনেক সময় অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হলে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যায় না। বিদ্যুৎ ও মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নিখোঁজ মানুষের সন্ধান আরও কঠিন হয়ে যায়।

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিও তার প্রমাণ। বিপুলসংখ্যক মানুষকে উদ্ধারে সেনাবাহিনী, হেলিকপ্টার ও বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। কিন্তু দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো অভিযানকে কঠিন করে তুলছে।

তাই ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হতে হবে দুর্ঘটনার আগেই।

হিমবাহ পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করা, নদীর পানি বৃদ্ধির স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দিয়ে পাহাড়ি বিপর্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়।

স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। কোন নদীর পানি কত দ্রুত বাড়লে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কোন রাস্তা নিরাপদ, কোন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ—এসব তথ্য মানুষের হাতে থাকতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কার?

আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই কেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে?

নেপাল বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বড় কোনো ভূমিকা রাখে না। অথচ হিমালয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বরফ গলার পরিবর্তিত প্রবণতার ঝুঁকি তাদের বহন করতে হচ্ছে। একই বাস্তবতা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা শুধু সম্মেলন, প্রতিশ্রুতি আর তহবিল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য দ্রুত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বাস্তব ব্যবস্থা প্রয়োজন।

নেপালের এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি পরীক্ষা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণ দেওয়া মানবিক দায়িত্ব; কিন্তু তার চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় যেন এত প্রাণ না কেড়ে নেয়, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা।

হিমালয়ের কান্না শুনতে হবে

প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণ বোঝার ক্ষমতা মানুষের আছে। বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

আজ নেপালের পাহাড়ে যে হাহাকার, তা কেবল নেপালের মানুষের কান্না নয়। এটি হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিবেশের একটি কঠিন বার্তা।

হিমবাহ ভাঙছে, পাহাড় ধসে পড়ছে, নদীর আচরণ বদলাচ্ছে। আর আমরা যদি প্রতিটি দুর্যোগকে শুধু ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে দায় শেষ করি, তাহলে ভবিষ্যতের বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হবে।

নেপালের বন্যা তাই আমাদের সামনে দুটি কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়—মানুষকে এখনই উদ্ধার করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ঠেকানোর প্রস্তুতি আজ থেকেই নিতে হবে।

হিমালয়ের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সময় আর নেই।