ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ ৪:২৯:৩০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা দুই মাস পেছাল শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় মঙ্গলবার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ, নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত নুসরাতের পরিবার সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-ফারজানা রুপার জামিন শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা ট্রাইব্যুনালে হাজির মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদে সময় বাড়ল

চারটি প্রাণ: রংপুরের হত্যাকাণ্ড কি শুধু ‘মাদকের প্রতিবাদ?

দীপালি হাসান | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৩৩ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের মৃত্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তের সক্ষমতা নিয়ে একগুচ্ছ কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশ—একটি পরিবারের চারটি প্রাণ একই সময়ে নিঃশেষ হয়ে গেল। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্নটি হলো—নিজের বাড়ির ভেতরেও কি মানুষ আর নিরাপদ নয়?

ঘটনার শুরুতে পুলিশ বলেছিল, ডাকাতির সম্ভাবনা রয়েছে। পরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার জানান, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ পরিকল্পিতভাবে চারজনকে হত্যা করে এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করে। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে; তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

কিন্তু এখানেই কি সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়?

না, যায় না।

কারণ নিহত পরিবারের স্বজনেরা পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য—এত অল্প বয়সী দুজন তরুণ কীভাবে একে একে চারজনকে হত্যা করল, সেটি তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। হত্যার কারণ নিয়েও তাঁদের সন্দেহ রয়েছে।

অন্যদিকে, সিআইডি জানিয়েছে, চারজনের মুখের কাছে তরল পদার্থ পাওয়া গেছে এবং সেটি কোনো রাসায়নিক কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই তথ্য তদন্তকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

তাহলে প্রকৃত সত্য কী?

মাদক সেবনে বাধা দেওয়াই কি হত্যার একমাত্র কারণ? নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই অনুমানের ভিত্তিতে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ চারজন মানুষকে হত্যা করার মতো ভয়াবহ অপরাধে পুলিশের বক্তব্য, আসামিদের স্বীকারোক্তি এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—এই তিনটির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

শুধু আসামির স্বীকারোক্তি দিয়ে একটি হত্যাকাণ্ডের সব রহস্যের সমাধান হয়ে যায় না। স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, অবস্থান-তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, হত্যার সময়রেখা, ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে দেখতে হবে।

কারণ প্রশ্নটি শুধু ‘কারা হত্যা করেছে’—এখানে থেমে নেই।

প্রশ্ন হলো, কেন চারজনকে হত্যা করা হলো? কীভাবে হত্যা করা হলো? কেন একই পরিবারের চারজনকে একে একে হত্যা করার প্রয়োজন হলো? হত্যার পর হত্যাকারীরা কী করল? কতক্ষণ ঘটনাস্থলে ছিল? বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র কে এবং কেন ছড়িয়ে রাখল? বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? এসব প্রশ্নের প্রত্যেকটির উত্তর প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় আরও গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার—মৃত পরিবারের বাড়িটি নির্মাণাধীন ছিল এবং স্বজনদের কেউ কেউ চাঁদা দাবির বিষয়েও সন্দেহের কথা বলেছেন। যদিও এটিকে এখনো প্রমাণিত হত্যার কারণ বলা যাবে না, তদন্তকারীদের উচিত সম্ভাব্য সব আর্থিক, সম্পত্তিগত, ব্যক্তিগত ও স্থানীয় বিরোধের দিক খতিয়ে দেখা।

ফেসবুকের ক্ষোভকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটিও সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। মানুষ শুধু চারটি হত্যার বিচার চাইছে না; মানুষ জানতে চাইছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

রংপুরে একই পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে একাধিক হত্যার খবরও এসেছে। একটি প্রতিবেদনে গত ১০ দিনে রংপুরে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশ্য কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছে বলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ভেঙে পড়েছে’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। কিন্তু ধারাবাহিক সহিংসতার অভিযোগ যখন জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

মানুষকে শুধু বলতে হবে না—‘পুলিশ তদন্ত করছে।’

মানুষকে দেখাতে হবে যে পুলিশ তদন্ত করছে।

সরকার কোথায়?

এই প্রশ্নটির উত্তরও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রংপুর মহানগর পুলিশ তদন্ত করছে, দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মামলা হয়েছে এবং সিআইডিও তদন্তে যুক্ত রয়েছে।

কিন্তু এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় পর্যায়ে সরকারের দৃশ্যমান অবস্থান কী—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়।

সরকারের দায়িত্ব শুধু আসামি গ্রেপ্তার করা নয়। সরকারের দায়িত্ব হলো এমন একটি তদন্ত নিশ্চিত করা, যাতে কোনো প্রশ্ন অমীমাংসিত না থাকে।

বিশেষ করে নিহতরা একটি সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য হওয়ায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তবে এ হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড বলে ঘোষণা করার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো অনুমান বা রাজনৈতিক বক্তব্যকে সত্য ধরে নেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনাকে পরীক্ষা না করাও ভুল। তদন্তে এই দিকটি প্রমাণসহ যাচাই করা উচিত।

রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা একটাই—কোনো সম্ভাবনাকেই আগেভাগে বাদ দেওয়া যাবে না।

পুলিশের বক্তব্যও স্বচ্ছ হতে হবে

তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়—এটি সত্য। কিন্তু তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের বক্তব্য যদি বদলে যায়, তাহলে মানুষের সন্দেহ তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক।

প্রথমে ডাকাতির সম্ভাবনা, পরে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার গল্প—এই পরিবর্তন কেন হলো, পুলিশকে সেটিও ব্যাখ্যা করতে হবে।

কারণ একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা নিজেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজ যদি মানুষ পুলিশের বক্তব্য বিশ্বাস না করে, আগামীকাল আরও কোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও জনআস্থা সংকটে পড়বে।

আমরা কি শুধু ‘চাঞ্চল্য’ চাই?

গণমাধ্যমেরও এখানে দায়িত্ব আছে।

চারজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, একজন মা, একজন তরুণী, একজন শিশু। তাঁদের জীবন ছিল, স্বপ্ন ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল।

কিন্তু ঘটনার পর আমরা যেন শুধু ‘রহস্য’, ‘চাঞ্চল্য’, ‘নৃশংসতা’ আর ‘ভয়াবহ’ শব্দের প্রতিযোগিতায় না নামি।

প্রশ্ন করতে হবে—

এই হত্যাকাণ্ডের আগে কী ঘটেছিল?

কোনো হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না?

স্থানীয় মাদকচক্রের সঙ্গে কারা যুক্ত?

এলাকায় মাদকের বিস্তার কতটা?

নির্মাণাধীন বাড়িটি নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি না?

পরিবারটির সঙ্গে কারও পুরোনো শত্রুতা ছিল কি না?

ঘটনার রাতে কারা কোথায় ছিল?

মোবাইল ফোনের তথ্য কী বলছে?

ফরেনসিক রিপোর্ট কী বলছে?

আসামিদের বক্তব্যের সঙ্গে আলামত কতটা মেলে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘মূল কারণ’ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়।

সরকারের এখন যা করা উচিত

প্রথমত, তদন্তকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদারভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ফরেনসিক তদন্তের ফলাফল দ্রুত সামনে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, হত্যার সম্ভাব্য সব মোটিভ—মাদক, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সম্পত্তি বা ব্যক্তিগত বিরোধ, এমনকি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য—প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।

চতুর্থত, নিহত পরিবারের স্বজনদের সন্দেহ ও প্রশ্নগুলোকে তদন্তের অংশ করতে হবে। তাঁদের ‘ভুল’ প্রমাণ করার চেষ্টা নয়, তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই হবে তদন্তের সাফল্য।

পঞ্চমত, বিচারপ্রক্রিয়া যেন বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।

সবশেষে, এই হত্যাকাণ্ডকে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে মাদক, স্থানীয় অপরাধচক্র, সামাজিক নিরাপত্তা, পুলিশি নজরদারি এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা—সবকিছুর যোগসূত্র থাকতে পারে।

রংপুরের সেই বাড়িতে চারটি জীবন নিভে গেছে। এখন রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সত্যটিকে বের করে আনা।

কারণ মানুষ শুধু আসামির গ্রেপ্তার দেখতে চায় না।

মানুষ জানতে চায়—কেন তাদের হত্যা করা হলো।

আর তার চেয়েও বড় কথা—

আগামীকাল আরেকটি পরিবার যেন একই প্রশ্ন নিয়ে না বসে—‘নিজের বাড়িতেও কি আমরা নিরাপদ নই?’