ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ ৪:২৭:২৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা দুই মাস পেছাল শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় মঙ্গলবার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ, নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত নুসরাতের পরিবার সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-ফারজানা রুপার জামিন শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা ট্রাইব্যুনালে হাজির মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদে সময় বাড়ল

পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হলুদ অতিথি—ফটিকজল

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪১ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

কদমগাছের ঘন সবুজ পাতার আড়ালে হঠাৎ এক টুকরো হলুদ রং! প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, পাতার ফাঁকে বুঝি কোনো হলুদ ফুল ফুটেছে। একটু ভালো করে তাকালেই দেখা যায়—না, ফুল নয়; ছোট্ট এক পাখি। স্থির হয়ে বসে আছে ডালের ওপর। চোখে তার কৌতূহল, ঠোঁটে যেন অদৃশ্য কোনো গানের সুর।

এই ছোট্ট পাখিটির নাম ফটিকজল।

ছবিতে যে ফটিকজলটিকে দেখা যাচ্ছে, তার শরীরের উজ্জ্বল হলুদ রং আর কালচে ডানার ওপর সাদা দাগ সবুজ পাতার ভেতর তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এমন দৃশ্য খুব অচেনা নয়। অথচ ব্যস্ত শহুরে জীবনে আমরা কত সহজেই এমন সৌন্দর্য চোখ এড়িয়ে যাই!

ফটিকজলের ইংরেজি নাম কমন আইওরা। বৈজ্ঞানিক নাম Aegithina tiphia। আকারে চড়ুইয়ের চেয়েও ছোট—দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ সেন্টিমিটার, ওজন মাত্র ১৫ গ্রামের মতো। কিন্তু আকারে ছোট হলেও তার প্রাণচাঞ্চল্য আর গানের মাধুর্যে সে কোনো অংশে ছোট নয়।

হলুদের ভেতর লুকিয়ে থাকে সৌন্দর্য

প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ফটিকজলের রূপ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাথা ও পিঠের ওপরের অংশ কালচে, বুক ও পেট গাঢ় হলুদ এবং ডানায় স্পষ্ট সাদা দাগ—সব মিলিয়ে তাকে বেশ দৃষ্টিনন্দন দেখায়। স্ত্রী পাখি তুলনামূলকভাবে অনুজ্জ্বল; তার শরীরে সবুজাভ-হলুদ রঙের আধিক্য থাকে। প্রজনন মৌসুমের বাইরে পুরুষের রংও কিছুটা ম্লান হয়ে সবুজাভ-হলুদের দিকে যায়।

তবে ফটিকজলের আসল পরিচয় শুধু তার রঙে নয়—তার গানে।

‘ফটিকজল’ নামটি যেন তার গানেরই প্রতিধ্বনি

ফটিকজল অত্যন্ত সুরেলা পাখি। তার ডাকের মধ্যে শিস, টুকটুক শব্দ আর নানা ধরনের কণ্ঠস্বর মিশে থাকে। বহুল শোনা একটি ডাককে পাখিবিদেরা ‘টুই-ই টুই-ই’ ধরনের শিস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দীর্ঘ সুরেলা গান অনেকটা ‘হুইইই-টি’ ধরনের। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সেই সুরকে ‘ফটিক-জল’ বলে শোনার প্রচলন থেকেই সম্ভবত তার বাংলা নামের সঙ্গে এই ধ্বনির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

আরও বিস্ময়ের ব্যাপার—এই ছোট্ট পাখি কখনো কখনো অন্য পাখির ডাকও অনুকরণ করতে পারে। অর্থাৎ সবুজ পাতার আড়ালে বসে থাকা এই হলুদ পাখিটির গলার ভেতর যেন ছোট্ট একটি বাদ্যযন্ত্র লুকিয়ে আছে!

পাতার আড়ালে তার ব্যস্ত সংসার

ফটিকজলকে দেখলে মনে হয় সে সারাক্ষণ খেলছে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে যায়, কখনো পাতার নিচে ঝুলে পড়ে, কখনো ডালের ডগায় বসে চারপাশে তাকায়। আসলে খেলাধুলা নয়—এ তার খাবার খোঁজার কৌশল।

ছোট ছোট পোকামাকড়, মাকড়সা, শুঁয়োপোকা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী তার খাবারের বড় অংশ। গাছের পাতার ফাঁক থেকে পোকা খুঁজে বের করতে সে অসাধারণ দক্ষ। ফলে প্রকৃতিতে ক্ষতিকর অনেক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও তার ভূমিকা রয়েছে।

শহরেও তার ঠিকানা

ফটিকজল শুধু গভীর বনেই থাকে না। ঝোপঝাড়, বাগান, গাছপালায় ভরা এলাকা, বনপ্রান্ত—এমনকি মানুষের বসতির কাছেও তাকে দেখা যায়। বাংলাদেশের বন অধিদপ্তরের প্রজাতি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের মানববসতি পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় এই পাখির উপস্থিতি রয়েছে।

এই কারণেই শহরের কোনো পুরোনো বাড়ির বাগানে, রাস্তার ধারের গাছপালায় কিংবা পার্কের সবুজে হঠাৎ তার দেখা মিলতে পারে।

আমরা হয়তো তাকে দেখেও দেখি না।

অথচ সে ঠিক আমাদের পাশেই থাকে—গাছের পাতার আড়ালে, মানুষের কোলাহলের মধ্যেও নিজের ছোট্ট পৃথিবী নিয়ে।

ছোট্ট বাসা, বড় মায়া

প্রজনন মৌসুমে ফটিকজল গাছের সরু ডালের গোড়ায় বা শাখার ফাঁকে ঘাস ও মাকড়সার জাল দিয়ে ছোট্ট কাপের মতো বাসা তৈরি করে। বাসাটি এমনভাবে বানানো হয় যে চারপাশের পাতার আড়ালে তা সহজে চোখে পড়ে না। সাধারণত দুই থেকে চারটি সবুজাভ-সাদা ডিম দেয়। ডিমে তা দেওয়ার কাজে পুরুষ ও স্ত্রী—দুজনেই অংশ নেয়।

ভাবলে অবাক লাগে—মাত্র কয়েক ইঞ্চির একটি বাসার ভেতরেই গড়ে ওঠে আরেকটি নতুন পৃথিবী।

হারিয়ে না যাক এই হলুদ গান

বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল। কিন্তু আমাদের প্রকৃতির সৌন্দর্য কেবল দোয়েল, শালিক, কোকিল কিংবা বুলবুলিতে সীমাবদ্ধ নয়। ফটিকজলের মতো অসংখ্য ছোট পাখি আমাদের পরিবেশকে জীবন্ত রাখে।

বাংলাদেশের প্রজাতি মূল্যায়নে ফটিকজলকে ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ বা Least Concern হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে এটি বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা পাখি নয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার আবাসস্থল ধ্বংস করা কিংবা নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা আমাদের জন্য কোনো বিষয় নয়।

কারণ একটি পাখির জীবন কেবল একটি পাখির জীবন নয়।

তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি গাছ, কয়েকটি পোকা, কিছু পাতা, একটি বাসা, কয়েকটি ডিম, একজোড়া পাখির সংসার—আর আমাদের চারপাশের পুরো জীববৈচিত্র্য।

তাই কদমপাতার আড়ালে বসে থাকা এই ছোট্ট হলুদ পাখিটিকে যখন দেখি, মনে হয়—প্রকৃতি আসলে খুব বড় কোনো আয়োজন করে সৌন্দর্য তৈরি করে না। কখনো কখনো একটি সবুজ পাতা, একটি সরু ডাল আর মাত্র ১৫ গ্রামের একটি পাখিই যথেষ্ট।

সেদিন কদমপাতার ভেতর থেকে ফটিকজলটি যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল—

সবুজের ভেতর একটু হলুদ থাকুক,
শহরের ভেতর একটু গান থাকুক,
আর মানুষের ভেতর বেঁচে থাকুক প্রকৃতিকে ভালোবাসার মন।

লেখক: আহবায়ক, বাংলাদেশ বার্ড ওয়াচার সোসাইটি।